একটা পুরো জাতিকে বোকা বানানোর কী নিখুঁত ছকটা না কষেছিল একটা কিশোর আর তার বাপ। এই যে বাপ বেটার ফন্দি, আর তাকেই জুলাই দাঙ্গার নায়ক সাজিয়ে পুরো জাতির চেতনার লাশটা আবারো গুম করার আয়োজন, এটাই তো সেই সুদী মহাজনের ডিজাইন করা বাংলাদেশ বিনির্মাণের আসল চেহারা।
পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনটা পড়লে যেকোনো বিবেকবান মানুষের কপালে হাত চলে আসবে। বাবার দেনার দায়ে জমি জিম্মা দিয়ে পালানো, মায়ের সঙ্গে ডিভোর্সের পর বাপের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনকে শায়েস্তা করার খেলা, আর সেই ব্যর্থতার জ্বালা মিটাতে ২০২৪ সালের জুলাই দাঙ্গাকে পুঁজি করে পুরো একটা মামলা দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। আসামির তালিকায় শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে বাদীর নিজের নানা, মামা, খালা, খালু সবাই। যেন কার্নিভাল, যেখানে পুরো দেশের শাসক আর আপন রক্তের লোকগুলো এক কাতারে দাঁড় করানো।
নাদিম সাহেব দিব্যি এজাহারে বলেছেন, তার মাথায় গুলি লেগেছে, তাকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে, অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখেছে। অথচ পিবিআই যখন যাত্রাবাড়ী কদমতলীর সিসিটিভি ফুটেজ, হাসপাতালের রেকর্ড, সংবাদমাধ্যমের ভিডিও খুঁজেছে, তখন কোথাও এই ঘটনার ছায়াটুকুও খুঁজে পাওয়া যায়নি। গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতো বড় একটা ঘটনার কোনো প্রেসক্রিপশন পর্যন্ত নেই। এটা কোনো ফাঁক-ফোঁকরের গল্প না, এটা পুরোপুরি একটা নির্মম ম্যানুফ্যাকচার্ড কেস।
এবার আসল খেলাটা বোঝার পালা। যে লোকটা পুরো নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখেছে সে আর কেউ নয়, স্বয়ং বাদীর বাবা এস এম ইকরাম উদ্দিন শিহাব। লোকটা ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা করে এক ভুক্তভোগী তারিক মামুনের কাছ থেকে আমেরিকা পাঠানোর নামে ৫৫ লাখ টাকা নিয়েছে। টাকা মারার পর আত্মগোপন, তারপর সালিশ-বিচার, সব ফাঁকি। পাওনাদার যখন পিছু ছাড়েনি, তখন শিহাব সাহেব ছেলেকে নায়ক সাজিয়ে পুরো দায়টা আওয়ামী লীগ আর শেখ হাসিনার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার সিনেমা বানিয়ে ফেললেন। এই লোকটা আসলে সেই চক্রেরই সন্তান, যারা জানে কীভাবে গুজব, মিথ্যা মামলা আর ভিকটিম কার্ড খেলে ক্ষমতার মসনদ পর্যন্ত ওঠা যায়।
আর এই পুরো ধ্যাষ্টামোটাকে সম্ভব করেছিল সেই ২০২৪ সালের ডিপ স্টেটের ম্যানুফ্যাকচার্ড ষড়যন্ত্র, যার নাম ‘জুলাই দাঙ্গা’। কোটা আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম দখল করে বিদেশি অর্থায়নে গড়ে ওঠা জঙ্গি চক্র, তাদের সঙ্গে দালালিতে নামা বিপথগামী প্রশাসনের অংশ আর ছায়া মিডিয়া একযোগে যে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ আর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, সেই ন্যারেটিভকে বৈধতা দিতে এই মিথ্যা মামলাগুলোই ছিল মলম। নাদিমের মামলাটা তারই এক চুল পরিমাণ নমুনা, যেখানে দোষী আর নির্দোষের কোনো সংজ্ঞা থাকে না, শুধু পলিটিক্যাল টুল হিসেবে মানুষকে ব্যবহার করা হয়।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের ভাষায় লেখা হয়েছে, অভিযোগটি ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিশেষ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে দায়েরকৃত’। আরো বলা হয়েছে, বাদী তার নিজের ইমিডিয়েট ফ্যামিলি মেম্বারদের পর্যন্ত আসামি করেছে, যাদের সন্তানেরা এই আন্দোলনে গিয়েছিল বলেও দাবি আছে। তাতে বোঝা যায়, ক্ষমতার পালাবদলের ধোঁয়ায় প্রতিহিংসার রাজনীতি কীভাবে একটা জাতিকে নাস্তানাবুদ করছে। যেখানে সত্যের কোনো দাম নেই, সেখানে শিহাবদের বংশধরেরা নায়ক, আর একটা রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে নির্মূলের টার্গেট বানানো হয়।
২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সেই সুদী মহাজনের সরাসরি ক্ষমতা না থাকলেও, তার সৃষ্টি করা এই ভয়ংকর দৃষ্টান্ত থেকে পুরো জাতির শিক্ষা নেওয়া উচিত। কী করে একটা ষোলো বছরের কিশোরকে অস্ত্র বানিয়ে আবেগী জনতার ভিড়ে সত্যকে মুছে ফেলার রাজনীতি চলে। কী করে একটা অর্থলোভী প্রতারক বাপ তার ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে গণআন্দোলনের নামে ভুয়া মামলা দেয়। আর কী করে একটা তদন্ত সংস্থা দীর্ঘ তদন্ত করে সেই অপকর্ম ধরে ফেলে।
এটাই সেই আসল চেহারা। বাস্তবতা হচ্ছে, এই জুলাই দাঙ্গা নামের ফাত্রামিটা ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক ন্যারেটিভ দখলের যুদ্ধ। দেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর বৈধতা পেতে এইসব মিথ্যা কেস, জোর করে ভিকটিম বানানো, ডকুমেন্ট জালিয়াতি তখনকার শাসকগোষ্ঠীর নিত্যদিনের অস্ত্র ছিল। তাদের পোষা মিডিয়া সেগুলো নিয়ে রোজ শিরোনাম বানিয়েছে, আর সত্যিটা পিবিআইয়ের ফাইলে চাপা পড়ে থেকেছে। নাদিমের কেসটা শুধু একটা উদাহরণ নয়, এটা হলো পুরো সিস্টেমেটিক ষড়যন্ত্রের জীবন্ত স্বীকারোক্তি।

