আসাদুজ্জামান সাহেব বিএনপির স্বঘোষিত আইনমন্ত্রী। মানে রাষ্ট্রের যে মানুষটার কাজ আইনের শাসন নিশ্চিত করা, বিচারহীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, সেই মানুষটা সাংবাদিকের সামনে বললেন মব হচ্ছে জনগণের প্রতিক্রিয়া। এই একটা বাক্যে তিনি যা করলেন সেটা হলো, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মবকে একটা দার্শনিক ভিত্তি দিয়ে দিলেন। পিটিয়ে মারাটা এখন আর অপরাধ না, এটা এখন “রিঅ্যাকশন”। প্রশ্ন হলো কার রিঅ্যাকশন, কীসের রিঅ্যাকশন, আর সেই রিঅ্যাকশনের সীমা কে ঠিক করবে? মন্ত্রী নিজে? না যে লাঠি হাতে দৌড়াচ্ছে সে?
‘২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে এই দেশে সংখ্যালঘুদের উপর যা হয়েছে, হিন্দু পরিবারের বাড়িঘরে আগুন, মন্দির ভাঙচুর, জমি দখল, মানুষ খুন, এগুলো কি সেই “জনগণের প্রতিক্রিয়া”? তাহলে সেই জনগণ কারা? আর যাদের বাড়ি পুড়েছে তারা কি এই দেশের জনগণ না? তাদের প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ কোথায়?
মন্ত্রী বললেন এটা “সিস্টেমেটিক না, ওয়াইডস্প্রেড না।” আশ্চর্য কথা। সারাদেশে একযোগে হওয়া সংখ্যালঘু নির্যাতন সিস্টেমেটিক না হলে সিস্টেমেটিক জিনিসটা দেখতে কেমন হওয়া উচিত সেটা মন্ত্রীর কাছ থেকে একটু বুঝে নেওয়া দরকার। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো রিপোর্ট করেছে, সংখ্যা দিয়েছে, ঘটনার বিবরণ দিয়েছে। মন্ত্রী সেসব দেখেননি, নাকি দেখেও না দেখার ভান করছেন?
এবার আসি বিএনপির গল্পে। এই দলটার জন্ম হয়েছিল ১৯৭৮ সালে, জিয়াউর রহমানের হাতে, ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে। গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয় অথচ প্রতিষ্ঠাতা নিজেই ক্ষমতায় এসেছিলেন সামরিক অভ্যুত্থানের সিঁড়ি বেয়ে। হ্যাঁ ওয়ান ইলেভেনের পর আবারও সেই একই চেনা পথ। আর দলের ইতিহাস ঘাঁটলে যা পাওয়া যায় সেটা হলো হাওয়া ভবনের দুর্নীতি, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণিত দুর্নীতির মামলা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দলীয় পরিচয়। এই দলের মন্ত্রী যখন মব জাস্টিফাই করেন তখন সেটা আসলে খুব একটা অবাক করার কথা না।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে যে নির্বাচন হয়েছে সেটা নিয়ে ক্লিয়ারকাট কথা বলা দরকার। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রেখে, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিকে মাঠের বাইরে রেখে, আর বাকি যারা ছিল তাদের একটা বড় অংশও বয়কট করেছে সেই ভোট। মানুষ ভোট দিতে যায়নি। কেন্দ্রের ছবি দেখলেই বোঝা যায় ভোটারশূন্য বুথে কর্মকর্তারা বসে আছেন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার বৈধতা দাবি করছে তারা আসলে কোন জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে সেটা পরিষ্কার না।
আর এখানেই মন্ত্রীর “মব ইজ রিঅ্যাকশন অব দ্য পিপল” কথাটার ভয়াবহতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। কারণ যে তথাকথিত সরকার নিজেই জনগণের রায়ের মুখোমুখি হয়নি, সেই সরকারের মন্ত্রী যখন মবকে জনগণের রায় বলেন, তখন বুঝতে হবে এই যুক্তিটা আসলে একটা নির্দিষ্ট মবের জন্য, সবার জন্য না।
নিউটনের তৃতীয় সূত্র রাজনীতিতেও কাজ করে। প্রতিটা ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। আজ যে যুক্তি দিয়ে একটা মবকে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে, সেই একই যুক্তি কাল অন্য কারো হাতে অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসে যারা পেশীশক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, শেষমেশ সেই পেশীশক্তিই তাদের গ্রাস করেছে। এই স্বঘোষিত মন্ত্রী আইন পড়েছেন (বোধহয়), ইতিহাসটাও একটু পড়া দরকার তার এখন জরুরী ভিত্তিতে।

