সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি অনস্বীকার্য সত্যকে সামনে এনেছে। পুলিশ সদরদপ্তরের গোপনীয় চিঠি, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও ড্রোনসহ চারজন ‘আকসা’ সদস্যের গ্রেপ্তার, এবং সর্বোপরি বিমানবাহিনীর এক সদস্যের নিখোঁজ হয়ে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) ডেরায় যোগ দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, জঙ্গি শক্তি আজও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও সংগঠিত।
তবে এই ইস্যুতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের আচরণে যে বুমেরাং পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা রীতিমত বিপজ্জনক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এই সরকারের নৈতিক ও নীতিগত দেউলিয়াত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ।
একদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘জঙ্গি’ শব্দটি স্বীকারই করতে রাজি নন। তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলেছেন, “আমি ওই শব্দকে রিকগনাইজ করি না… বর্তমানে বাংলাদেশে সেগুলোর অস্তিত্ব নেই।” অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা প্রায় বিপরীত সুরে স্বীকার করছেন, “এটা ফ্যাক্ট, বাংলাদেশে জঙ্গি আছে… সেটাকে আমরা কমব্যাট করতে চাই।”
একই সরকারের দুই শীর্ষ মুখের এহেন সাংঘর্ষিক বক্তব্য জনগণের কাছে কী বার্তা দেবে? রাষ্ট্র যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, তখন উগ্রবাদীরা যে সুসংগঠিতভাবে বোমা বানাবে, ড্রোন উড়াবে এবং টিটিপির মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, সেটাই স্বাভাবিক। এটি আসলে গণতন্ত্রের অপহরণকারী এই অসাংবিধানিক শক্তির চিরচেনা কৌশল। তারা জঙ্গিবাদ আছে বললে ভোটের রাজনীতিতে ক্ষতি, আবার নেই বললে আন্তর্জাতিক মহলে চাপে পড়তে হয়। এই কূটকৌশলের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এই সরকারের জন্মই হয়েছে অংশগ্রহণহীন এক প্রহসনের মাধ্যমে। গত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বয়কট করে জিয়াউর রহমানের সেনানিবাসে লালিত এই দলটি ক্ষমতায় বসেছে। তাদের ভেতরে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমনপীড়নের যে সংস্কৃতি, তা এখন জঙ্গি দমনের নামে প্রয়োগের চেষ্টা হলেও, আদতে তারা আজও সেই একই রাজাকারী মানসিকতার ধারক। রাজাকার এখন আর নিছক ‘স্বেচ্ছাসেবক’ বোঝায় না; এটি বিশ্বাসঘাতকতা ও দেশের শত্রুদের সঙ্গে আঁতাতের প্রতীক। বিএনপি অতীতে জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যে রাজনীতি করেছে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে জঙ্গিবাদের অঙ্কুরোদগম ঘটেছে, আর আজ তারা নিজেরাই সেই আগাছায় জর্জরিত।
এখন প্রশ্ন হল, জঙ্গি কারা?
অনেকে সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদকে গুলিয়ে ফেলেন। এটি পরিষ্কার করা জরুরি। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। হিজবুত তাহরীর কোনো ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করল। ছাত্রদলও কাউকে কুপিয়ে হত্যা করল। বাহ্যিকভাবে দুটোই সহিংসতা। কিন্তু প্রেরণা আলাদা। ছাত্রদলের সন্ত্রাসী ইহকালীন স্বার্থে হত্যা করে, যেমন টাকা, প্রভাব অথবা গাঁজা খাওয়ার পয়সা। এটি ঘৃণ্য অপরাধ, সন্ত্রাস। কিন্তু হিজবুত তাহরীরের সদস্য হত্যা করে পরকালীন স্বার্থে। যে পরকালের অস্তিত্বের প্রমাণ কারও কাছে নেই, সেই জিনিসের জন্য মানুষ মারা, কুফরি লাগানো এবং বেহেশতের আশায় আত্মঘাতী হওয়াই জঙ্গিবাদ। আর এ কারণেই জঙ্গিবাদ যে কোনো সন্ত্রাসের চেয়ে বেশি ভয়ংকর। এখানে কোনো দর-কষাকষি বা মানবিক আবেদন কাজ করে না।
বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদের এই সংজ্ঞাকে অস্বীকার করে এবং ছাত্রদলের সন্ত্রাসকে ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি’ হিসেবে ঢাকার যে চেষ্টা করছে, তা অত্যন্ত সুবিধাবাদী। তারা বাস্তবতাকে অস্বীকার করছে অথচ তাদের এঁটো পাত্রে টিটিপি’র মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক আজ সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরেও শিকড় গেড়েছে। বিমানবাহিনীর সদস্যের নিখোঁজ হওয়া, অভ্যন্তরীণ তদন্তের সূত্রপাত এবং পাকিস্তানের মাটিতে বাংলাদেশি জঙ্গিদের উপস্থিতি এই অস্বীকৃতির বিপক্ষে জ্বলন্ত প্রমাণ।
জঙ্গিরা পিছু হঠেনি বরং তারা জামিনে বেরিয়ে আরও সংগঠিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিজস্ব তথ্য বলছে, গত তিন বছরে এক হাজার ২৩১ জন জঙ্গি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে। ১১৪ জন জামিন পেয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। ৩৭০ জন অভিযুক্ত এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে। ২০২৪ সালের আগস্টে কারাগার ভেঙে পালানো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ জঙ্গি এখনো পলাতক। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেন, “আমাদের দেশের বর্তমান কালচারে সেটা এখন আর নেই।”
এটাই বাস্তবতা। সরকারের দায়িত্বশীলদের কথায় আর মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডে বিস্তর ফারাক। যেদিন এই সরকার স্বীকার করবে যে, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় পরাবাস্তব অস্বীকৃতি আর সুবিধাবাদী বিভক্তি কাজে আসে না, সেদিনই প্রকৃতপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে উঠবে।
এপ্রিল ২০২৬ চলছে। প্রতিটি দিনই এই স্বৈরাচারী শক্তির মেয়াদ আরও এক ধাপ কমিয়ে আনছে। কিন্তু নিশ্চুপ থেকে লাভ নেই। প্রতিবাদ করতে হবে। হোক তা কলমের মাধ্যমে, হোক তা অবস্থানের মাধ্যমে। প্রতিবাদ করতে হবে এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে। কারণ জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা যেখানে মাথাচাড়া দেয়, সেখানে গণতন্ত্রের প্রদীপ নিভু নিভু হয়ে আসে। প্রশ্ন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের, প্রশ্ন জনগণের নিরাপত্তার। এই সরকারের কূটনৈতিক ফিকির-ফিকিরে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রাখা যাবে না। প্রতিরোধ এখন সময়ের দাবি।

