চার দিনে একটানা ৩১ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট। ৩৪ ঘণ্টারও বেশি সময় অন্ধকারে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মানুষ এখন চাহিদার মাত্র এক ভাগ বিদ্যুৎ পাচ্ছে। সাব-স্টেশনে চাহিদা ৯ মেগাওয়াট, মিলছে ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট। বাকিটা? সেটা শুধু কাগজে আছে, লাইনে নেই।
জেরিনা খাতুন যন্ত্রে লুঙ্গি বানান। আগে দিনে ১৫টা হতো, এখন ৭-৮টাও কষ্ট করে হয়। দর্জি মিলন মাহবুব গত বুধবার সারাদিনে একটা শার্ট বানাতে পেরেছেন। আয় ৩০০ টাকা। দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল বাদ দিলে সেই ৩০০ টাকায় সাত জনের সংসার কীভাবে চলে, সেটা হিসাব করার সাধ্য তার নেই। কৃষক আব্দুল হান্নান ১০ কাঠা জমিতে সেচ দিতে গিয়ে একদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ৬-৭ বার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা দেখেছেন। এই অবস্থায় চাষাবাদ হয় না, সংসার চলে না, ব্যবসা টেকে না।
এই যে কষ্ট, এই যে হাহাকার, এর দায় কার? বিএনপি এখন বলবে এটা আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া সমস্যা। কিন্তু ক্ষমতায় তো তারা এসেছে। ক্ষমতায় আসা মানেই দায়িত্ব নেওয়া। সেই দায়িত্ব এখন কোথায়?
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের কথা মনে আছে? দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সেই ভোটে ছিল না। মানুষ ভোট কেন্দ্রে যায়নি। যে নির্বাচনে জনগণ নেই, সেটাকে নির্বাচন বলা যায় কিনা সেই তর্কে না গেলেও এটুকু বলা যায় যে, যে সরকার জনগণের ভোটে আসেনি, সে সরকার জনগণের কষ্টের কথা বুঝবে কী করে। কুমারখালীর জেরিনা বা মিলন মাহবুব তো ভোট দিয়ে এই সরকার বানাননি। তাহলে এই সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা রাখার কোনো ভিত্তি আছে?
বিএনপি জন্মলগ্ন থেকেই সেনানিবাসের ছায়ায় বড় হওয়া একটি দল। জিয়াউর রহমান নিজে যেভাবে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই ধারাটা দলটির ডিএনএতে গেঁথে গেছে। নিজেরা একটা মঞ্চ সাজাও, নিজেরাই অভিনয় করো, তারপর বলো জনগণ চেয়েছে। এই ফর্মুলা বাংলাদেশে নতুন না। কিন্তু এপ্রিল মাসের এই দাবদাহে, যখন মানুষের ঘরে ফ্যানটুকুও চলছে না, তখন সেই পুরোনো ফর্মুলার মুখোশটা আরও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
নামসর্বস্ব মন্ত্রীরা বিবৃতি দেন, আশ্বাস দেন, পরিকল্পনার কথা বলেন। কিন্তু কুমারখালীর সাব-স্টেশনে ৯ মেগাওয়াটের জায়গায় ৩ মেগাওয়াট আসে। স্কাডা যন্ত্রের গণ্ডগোলে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও বেশিবার লোডশেডিং হয়। এটা শুধু বিদ্যুতের সংকট না, এটা একটা ব্যর্থতার সংকট, একটা অবৈধ ক্ষমতার সংকট, একটা জবাবদিহিহীন শাসনের সংকট।
যে সরকার মানুষের ভোটে আসেনি, সে সরকার মানুষের কাছে জবাব দেওয়ার কোনো তাগিদ অনুভব করে না। এটাই আসল সমস্যা। বিদ্যুৎ আসবে যাবে, সংকট উঠবে নামবে, কিন্তু যে শাসন মানুষের মুখের দিকে তাকায় না, সে শাসন কোনো সমস্যারই সমাধান করতে পারে না।

