রাজধানী ঢাকা এখন যেন এক উন্মুক্ত রণক্ষেত্র। যে শহরকে আমরা নিজেদের আত্মার শহর ভাবি, সেই শহরের অলিগলি থেকে রাজপথ আজ লাল হয়ে উঠছে খুনের রক্তে। ২১ মাসে প্রকাশ্য দিবালোকে ২৩টি আলোচিত সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটল। এর মধ্যে সাতটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। খুনের শিকারদের অধিকাংশই খুন হয়েছেন পেশাদার শুটারদের গুলিতে, যেন সিনেমার কোনো দৃশ্য নয়, এ যেন আমাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
অথচ এই যে মৃত্যুর মিছিল, এই যে টিটন থেকে শুরু করে টেলি সুমন, আরিফ সিকদার কিংবা কামরুল আহসান সাধনের মতো মানুষদের প্রকাশ্যে হত্যা, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি গভীর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার স্পষ্ট ছাপ। যে দলটি নিজেদের গায়ে রাষ্ট্র মেরামতের দায়ভার নিয়েছে, সেই দলটির শাসনামলে পুরোনো সন্ত্রাসীরা যেন জেলের তালা ভেঙে রাস্তায় নেমে এসেছে। প্রশ্ন জাগে, জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাস্ট থেকে ক্রসফায়ারের ভুয়া নাটক মঞ্চায়ন করা এই দলটি কি আবারও অন্ধকার জগতের কারিগর হয়ে উঠল?
খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনের রক্ত রাজপথ শুষে নেওয়ার আগেই নিয়তি যেন বার্তা দিয়েছিল। গুলশানের সুমন মিয়া, বাড্ডার সাধন – পরস্পর প্রতিশোধের এই চক্র থামেনি একদিনও। ভুক্তভোগী মো. রাজন বলছেন, তাঁর মাথা থেঁতলে দিয়ে মৃত ভেবে ফেলে রাখা হয়েছিল। অথচ আজ পর্যন্ত তিনি বিচার পাননি। এর চেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে? অথচ আমরা দেখছি, এই সন্ত্রাসীরা জামিন পাচ্ছে, বিদেশে পালাচ্ছে, আবার বসে বসে ভাড়াটে শুটার দিয়ে খুন করাচ্ছে। কিশোর ছেলেদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র।
আপনারা কি কখনও ভেবে দেখেছেন, এই যে মিরপুরে এক কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলি করার সাহস, এই যে রায়েরবাজারে ইমন হোসেনকে কুপিয়ে খুন, এর নেপথ্যে কারা? বিশ্লেষণ বলছে, পোশাকের ঝুট, বাসাবাড়ির ময়লা, কোরবানির হাট আর ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই এই রক্তারক্তি। আর এই পুরো চক্রটা চলছে বিদেশি নম্বর থেকে কল করে। প্রশ্ন হল, দেশে বসে যখন সরকারের অত্যুৎসাহী মন্ত্রীরা ‘বাংলাদেশ ট্যুরিজম’ নিয়ে মহাপরিকল্পনা করছেন, তখন বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এই সন্ত্রাসীরা কীভাবে অনায়াসে দেশে খুনের নির্দেশ দিচ্ছে? কে তাদের সেই অভয় দিচ্ছে? উত্তরটা স্পষ্ট, যে দলের জন্ম সেনানিবাসের অন্ধকারে, সেই দলের কাছ থেকে আলো আশা করা বোকামি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল হক বলেছেন, ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসীরা জামিনে এসে আবার অপরাধে জড়াচ্ছে, কিন্তু নজরদারি করার কেউ নেই। এটা তো ভয়ংকর এক স্বেচ্ছাচারিতা। মানুষ জননিরাপত্তা নিয়ে বুক কাঁপা ভয় নিয়ে রাস্তায় বের হচ্ছে। উদ্যোক্তারা চাঁদা দেওয়ার ভয়ে ব্যবসা বন্ধ রাখছেন, ভুক্তভোগীরা মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। এর চেয়ে লজ্জার, এর চেয়ে ব্যর্থতার ছবি আর কী হতে পারে?
২০০১ সালে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীর’ তালিকা করে বিশ্বকে দেখানোর নাটক করেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। আজ সেই একই দলের শাসনামলে সেই তালিকার ইমন, টিটন, হেলালরা রীতিমতো আন্ডারওয়ার্ল্ডের নয়া নেতা। পুরোনো সন্ত্রাসীরা এখন নতুন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া পেয়ে রাজধানীকে ভাগবাঁটোয়ারা করে ফেলেছে। ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, মিরপুর থেকে গুলশান, বাড্ডা – কোনো থানাই বাদ নেই। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যে দল সৃষ্টি করেছে, তারা আজ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেবে, এটা কেমন কথা?
দুঃখজনক সত্য হলো, এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধে সরকারের কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই। বরং মনে হয় কেমন যেন সমঝোতার রাজনীতি। ঢাকা শহর আজ আতঙ্কের শহর। অথচ নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় এসব ঘটছে। এটা আমাদের অগ্রগতি নয়, এটা রাষ্ট্রের মূল কাঠামোয় ধস নামার পূর্বাভাস। বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ, আপনারা মানুষের মনে ভয়, ব্যবসায়ীদের মনে অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা নরক উপহার দিচ্ছেন। যে দলের অন্দরমহল দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর, সেই দল দেশ চালাবে, এটাই ছিল বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ।

