বাংলাদেশের ১২ জন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে পাকিস্তানের লাহোরে পাঠানো হচ্ছে ‘দক্ষতা বাড়ানোর’ প্রশিক্ষণের জন্য। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশে এটা নিশ্চিত করা হয়েছে। ৪ থেকে ২১ মে পর্যন্ত লাহোরের সিভিল সার্ভিসেস একাডেমিতে এই প্রশিক্ষণ হবে, এবং সমস্ত খরচ বহন করবে পাকিস্তান সরকার। বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ, বিনামূল্যে থাকাখাওয়া। শুনতে চমৎকার। কিন্তু যে দেশে পাঠানো হচ্ছে, সেই দেশটার পরিচয়টা একটু মনে করিয়ে দেওয়া দরকার।
পাকিস্তান এমন একটি দেশ যেখানে মসজিদে বোমা পড়ে, বাজারে বোমা পড়ে, স্কুলে হামলা হয়। তেহরিক ই তালেবান পাকিস্তান, লস্কর ই তাইয়েবা, জইশ ই মুহাম্মদ, এই নামগুলো পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকে উৎপন্ন জঙ্গি সংগঠন, গোটা দুনিয়া যা জানে। ভারত, আফগানিস্তান, এমনকি পাকিস্তানের নিজের মানুষও এই সংগঠনগুলোর হাতে মরেছে বছরের পর বছর ধরে। সুশাসনের আন্তর্জাতিক সূচকে পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে ছয় ধাপ পেছনে, জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে পেছনে আরও বেশি দূরে। যে দেশ নিজেই এত পেছনে আছে, সেই দেশ বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের কী শেখাবে? কীভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে কারাগারে রেখে সেনাবাহিনীর ছায়ায় দেশ চালাতে হয়? সেটা অবশ্য পাকিস্তান ভালোই জানে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে এবং কেন।
ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে নির্বাচন হয়েছে, সেটাকে নির্বাচন বলা একটু কঠিন। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণের বয়কটের মুখে, একটা সাজানো আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। এই সরকারের গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে দেশের বিস্তর মানুষের মনে প্রশ্ন আছে, সেটা এখন আর কোনো গোপন বিষয় না। সেই সরকারই এখন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করছে দ্রুতগতিতে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানি জাহাজ চট্টগ্রামে এল, জানুয়ারিতে ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট শুরু হলো, আর এখন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পাকিস্তানে যাচ্ছেন প্রশিক্ষণ নিতে। ধারাবাহিকতাটা লক্ষ্য করার মতো।
বিএনপির জন্মের ইতিহাস অনেকেরই জানা। জিয়াউর রহমান সেনানিবাসের ভেতরে বসে একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন, যে দলের শিকড় কখনো গণমানুষের মাটিতে গেঁথে যায়নি। তার আমল থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল, একাত্তরের গণহত্যার হিসাবনিকাশ এড়িয়ে গিয়ে। সেই দলই এখন ক্ষমতায়, এবং তারা সরকারি কর্মকর্তাদের পাকিস্তানে পাঠাচ্ছেন পাকিস্তানি অর্থে প্রশিক্ষণের জন্য। ‘নিউজ পাকিস্তান’ গর্ব করে বলছে, সত্তরের দশকের পর এই প্রথম দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক পেশাগত আদান-প্রদান হতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের এই উৎসাহের কারণটা বোঝা কঠিন না।
পাকিস্তান এই প্রশিক্ষণের সম্পূর্ণ খরচ দিচ্ছে। বিনামূল্যে কিছু হয় না, এটা রাজনীতির সবচেয়ে পুরনো সত্যি। পাকিস্তান এই বিনিয়োগ করছে কারণ তারা চায় বাংলাদেশের সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হোক যা তাদের কাজে আসবে। আর বিএনপি সরকার সেই সুযোগ দিচ্ছে দুহাত তুলে। এর মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কোথায় আছে, তা বিএনপির নেতারা সম্ভবত ব্যাখ্যা করতে পারবেন না, কারণ ব্যাখ্যা করার মতো কিছু নেই।
যে সরকার জনগণের ভোটে আসেনি, যে সরকারের কাছে জনগণের কাছে জবাবদিহির কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, সেই সরকারের পক্ষেই এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। নির্বাচিত সরকার হলে সংসদে প্রশ্ন উঠত, বিরোধী দল জবাব চাইত, গণমাধ্যম তদন্ত করত। কিন্তু এখন? বিএনপির এই মন্ত্রিসভা কার কাছে জবাব দেবে? একটা পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা একটি সরকার স্বভাবতই যা খুশি তাই করতে পারে, কারণ জনগণের ম্যান্ডেটের কোনো বালাই নেই।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা পাকিস্তান থেকে কী শিখে আসবেন সেটা জানা নেই। কিন্তু এটুকু জানা আছে যে যে দেশ বাংলাদেশের মানুষের ওপর ১৯৭১ সালে গণহত্যা চালিয়েছিল, সেই দেশের কাছ থেকে ‘সুশাসনের পাঠ’ নেওয়া কেবল হাস্যকর না, এটা একটা ঐতিহাসিক সম্মানহানিও বটে। এই বেইজ্জতি করার সাহস বিএনপির আছে, কারণ তাদের ক্ষমতার ভিত্তি তো আর জনগণের সমর্থন না!

