সাড়ে সাত কোটি ডলার। এক প্রান্তিকে বাংলাদেশে আসা মোট নতুন বিদেশি পুঁজির পুরো হিসাব এটাই। গত বছর এই সময়ে ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। মাঝখান থেকে উবে গেছে ৭০ শতাংশের বেশি, ঠিক এক নির্বাচনী বছরে।
সংখ্যাটা একা কিছু বলে না, ধারাবাহিকতা বলে। জুন প্রান্তিকে ৮ কোটি, সেপ্টেম্বরে ১০ কোটি, ডিসেম্বরে প্রায় ১১ কোটি, তারপর মার্চে গিয়ে সাড়ে সাত কোটিতে নামা। এটা কোনো এক মাসের দুর্ঘটনা না, টানা চার প্রান্তিকের প্রবণতা। আর এই পুরো সময়টায় ক্ষমতায় বিএনপি-জামাত জোট।
এই সময়ে যা যা ঘটেছে তার প্রতিটাই বিনিয়োগকারীর ভয় পাওয়ার কারণ। সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং একের পর এক নামানো হয়েছে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় গেছে যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান টাকা ঢালার আগে দুইবার ভাবছে, আর ওয়ান স্টপ সার্ভিস নামের যে প্রতিশ্রুতি শোনানো হচ্ছে সেটা এখনো পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়নি। সমস্যাগুলো নতুন না, কিন্তু সমাধানের নামে যা হচ্ছে তা কাগজে আছে, বিনিয়োগকারীর টেবিলে পৌঁছায় না।
তুলনাটাই সবচেয়ে বেশি লজ্জার। ঘানা এক বছরে মুদ্রাস্ফীতি একুশ শতাংশ থেকে নামিয়ে সাড়ে তিন শতাংশে এনেছে, রিজার্ভ চৌদ্দ বিলিয়ন ডলারে তুলেছে, বিদেশি কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক ন্যূনতম মূলধনের শর্ত তুলে দিয়ে আইন পাস করেছে। উগান্ডা পুরো অনুমোদন প্রক্রিয়াকে একটা জানালায় নামিয়ে এনেছে। কঙ্গো জ্বালানি খাত খুলে দিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল বাড়িয়েছে। এই তিন দেশের অর্থনীতি একসাথে করলেও বাংলাদেশের ধারেকাছে আসে না, তবু তারা বিনিয়োগ টানার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে গেছে। প্রশ্নটা তাই সহজ, সমস্যা সামর্থ্যের অভাব নাকি সদিচ্ছার।
দেড় শতাংশ নগদ প্রণোদনার ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আর প্রাতিষ্ঠানিক জঞ্জাল ঢাকা যায় না। বে টার্মিনালের মতো প্রকল্প আন্তর্জাতিক পুঁজির যোগ্য হতে আরও পাঁচ থেকে সাত বছর লাগবে বলে খোদ সাবেক গভর্নরই বলছেন। এই মধ্যবর্তী সময়টা কীভাবে সামলানো হবে তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনো নেই।
সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা অন্য জায়গায়। দেশি উদ্যোক্তারাও এখন একই ভয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারী সন্দিহান হলে সেটা এক রকম সংকেত, কিন্তু নিজের দেশের ব্যবসায়ীরাই যখন পিছিয়ে যায়, বুঝতে হবে সমস্যাটা প্রচারণার না, আস্থার। আর আস্থা তৈরি হয় স্থিতিশীল নীতি আর নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান দিয়ে, ঘোষণা দিয়ে না।
২০০১-০৬ সালের অভিজ্ঞতা মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। তখনও অর্থনীতির সূচক আর মাটির বাস্তবতার মধ্যে ফারাক তৈরি হয়েছিল, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছিল, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দূরে সরে গিয়েছিল। এখনকার সংখ্যাগুলো সেই পুরনো প্যাটার্নের দিকেই ইঙ্গিত করছে।

