পল্টন থানার একটি মামলা। বাদী নিজেই জানেন না যে তিনি বাদী। এজাহারে উল্লেখিত ঘটনাস্থল সম্পূর্ণ ভুল। দুইজন তদন্ত কর্মকর্তা প্রায় এক বছর ধরে ছুটেছেন অস্তিত্বহীন এক গলির পেছনে। তৃতীয়জন এসে রহস্য উন্মোচন করলেন, ঘটনাস্থল মোহাম্মদপুর, পল্টন নয়। যে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা, সেই ভুক্তভোগী বলছেন, সহায়তার আশ্বাসে ডেকে নিয়ে এক আইনজীবী তাঁর অজান্তেই কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে মামলা করে দিয়েছেন।
এই একটি মামলা পুরো জুলাই ষড়যন্ত্রের আসল চরিত্র ফাঁস করে দেয়। বিদেশী রাষ্ট্রের মোটা অঙ্কের টাকা, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের মাঠ পর্যায়ের সক্রিয়তা আর সামরিক বাহিনীর প্রকাশ্য সমর্থনে ২০২৪ সালে দেশব্যাপী যে সহিংসতা ছড়ানো হয়েছিল, তার পুরোটাই ছিল একটি সুপরিকল্পিত ক্যু। নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল সুদী মহাজন ইউনুসের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র। সেই চক্রের রাজনৈতিক বাহু হিসেবে কাজ করেছে বিএনপি, আর সুযোগসন্ধানী শকুনের মতো সংসদে ক্ষমতার ভাগ বসিয়েছে জামাতে ইসলাম। এখন ২০২৬ সালের জুলাই। ইউনুস আর ক্ষমতায় নেই বটে, কিন্তু তার দোসর বিএনপি ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে বসে আছে। জামাত এখনো সংসদে তাদের হিস্যা নিয়ে হাসিল করে চলেছে।
ফিরে আসা যাক পল্টন থানার সেই মামলায়। চিন্তা করুন, একটি হত্যাচেষ্টার মামলা, যেখানে ৩৪৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় নেতা, সবাইকে ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। অথচ যে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে মামলা, সেই শাকিল মোল্লা বলছেন, আমি কিছুই জানতাম না। এক নিকট আত্মীয় সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে আইনজীবী রুবেল ভূঁইয়ার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি কিছু কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছেন, তারপর চলে যেতে বলেছেন। মামলা যে হয়ে গেছে, সেটা পরে জেনে অবাক হয়েছেন শাকিল। প্রশ্ন উঠছে, এই মামলাগুলো কারা করিয়েছে, কার স্বার্থে করিয়েছে, আর কীসের বিনিময়ে করিয়েছে?
ঘটনাস্থল পল্টনের আজাদ প্রোডাক্টসের গলি। তদন্ত কর্মকর্তা গিয়ে দেখলেন, সেখানে এমন কোনো ঘটনার সত্যতা নেই। ফল বিক্রেতা থেকে ভবঘুরে, কাউকে জিজ্ঞাসা করে কিছু জানা গেল না। অথচ মামলা চলছে, আসামিরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তদন্তের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আর সময় নষ্ট হচ্ছে। পরে জানা গেল, আসল ঘটনা ঘটেছে মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে। অর্থাৎ থানা এক, ঘটনাস্থল আরেক। ইচ্ছাকৃতভাবেই ঘটনাস্থল পরিবর্তন করে মামলাটি পল্টন থানায় দেওয়া হয়েছে, যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা যায়।
এই একটিমাত্র মামলা নয়। ডিএমপির তথ্য বলছে, জুলাই আন্দোলনের নামে রাজধানীর ৫০ থানায় ৭০৭টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে অন্তত ১৪টি মামলার ঘটনাস্থল ভুল, যে স্থানের কথা বলা হয়েছে সেখানে কোনো ঘটনাই ঘটেনি। আরও ৩৭টি মামলায় প্রকৃত ঘটনাস্থলের কোনো উল্লেখ নেই। দেশজুড়ে দায়ের করা ১ হাজার ৮২৬টি মামলার মধ্যে মাত্র ২৫৪টির তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে। বাকিগুলো কোথায় আটকে আছে, কেন আটকে আছে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ মামলাগুলোর সিংহভাগই মিথ্যা, বানোয়াট এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে দায়ের করা।
এসব মামলায় ঢালাও আসামি করা আর অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে বারবার। ভুক্তভোগীর স্বজনরা জানাচ্ছেন, কোনো কোনো সংস্থার নাম করে টাকা নিয়ে তাদের কাগজপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তারাই মামলা করেছে। বাদী বা ভুক্তভোগী কেউই তদন্তে সহায়তা করছেন না। তদন্ত কর্মকর্তারা ডেকে পাঠিয়েও সাড়া পাচ্ছেন না। বিষয়টি কেন ঘটছে, তা স্পষ্ট। যারা মামলা করিয়েছে, তারা চাচ্ছে মামলাগুলো কেবল হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে টিকে থাকুক, কখনো বিচারের মুখ দেখুক না। কারণ বিচার হলে সত্য বেরিয়ে আসবে, আর সত্য বেরিয়ে এলে বোঝা যাবে, জুলাই দাঙ্গা নামক পুরো প্রকল্পটিই একটি সাজানো নাটক ছিল।
এই সাজানো নাটকের পেছনে বিদেশী রাষ্ট্রের অর্থায়নের প্রমাণ এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা আর সুশীল সমাজের মুখোশধারী কিছু চক্রের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ঢালাওভাবে ঢুকেছে এই দেশে। সেই টাকায় কেনা হয়েছে মিছিল, কেনা হয়েছে স্লোগান, কেনা হয়েছে সংবাদ শিরোনাম, আর কেনা হয়েছে এইসব বানোয়াট মামলা। ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনগুলো মাঠে নেমে সহিংসতা ছড়িয়েছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, মানুষ হত্যা করেছে। আর সামরিক বাহিনীর একটি অংশ সেই সহিংসতার মধ্যেই নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছে, সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্যু ঘটিয়েছে।
এরপর সুদী মহাজন ইউনুসকে বসিয়ে দেওয়া হয় রাষ্ট্রের মাথায়। অথচ এই ব্যক্তির গণতন্ত্রের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, জনগণের ভোটের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক কেবল বিদেশী দাতা সংস্থার সঙ্গে, ঋণের ফাঁদে জর্জরিত এক অর্থনীতির স্বপ্নদ্রষ্টাদের সঙ্গে। সেই সময়টায় বিএনপি ছিল প্রকাশ্যে রাজপথে, আর গোপনে চক্রান্তের কেন্দ্রে। তারা ভেবেছিল, সেনাবাহিনী আর জঙ্গিদের কাঁধে ভর দিয়ে আবার ক্ষমতায় ফেরা যাবে, সেই ২০০১ সালের মতো ফর্মুলায় ফেরা যাবে। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে জামাত, যাদের অতীত রক্তাক্ত, অগ্নিঝরা, মানবতাবিরোধী অপরাধে কলুষিত।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় এলো বটে, কিন্তু তাদের সেই ক্ষমতায় আসার পথটুকুও তৈরি হয়ে ছিল ২০২৪ সালের সেই ক্যু আর জুলাই দাঙ্গার মিথ্যা অজুহাতে। যেই মামলাগুলো এখন আদালতে পড়ে আছে, সেসবের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, বিচারব্যবস্থাকে কী নগ্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। ঘটনাস্থল পর্যন্ত গোপন রাখার এই সংস্কৃতি প্রমাণ করে, অপরাধের শেকড় কত গভীরে, আর সত্যকে চাপা দেওয়ার ষড়যন্ত্র কত সুনিপুণ।
পল্টনের সেই গলিতে কোনো গুলির শব্দ শোনেনি কেউ। শুনেছিল মোহাম্মদপুরের ফুটব্রিজের নিচে। কিন্তু মামলা করতে হবে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে, যেন শিরোনামে জায়গা হয়, যেন রাজনৈতিক ফায়দা তোলা যায়। এই যে ভূগোল বদলের রাজনীতি, এ শুধু একটি মামলার ঘটনা নয়, এ গোটা একটি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করার নীলনকশারই অংশ। যেখানে সত্যের কোনো মূল্য নেই, বিচার নামক পবিত্র শব্দটিকে ফাঁসির দড়ির মতো ব্যবহার করা হয়েছে নিরীহ মানুষের গলায় পরানোর জন্য।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যারা এই মামলাগুলো বানিয়েছেন, যারা মিথ্যা এজাহার দিয়ে, ঘটনাস্থল গোপন রেখে, ভুক্তভোগীর অজান্তে মামলা করে বিচার প্রক্রিয়াকে উপহাস করেছেন, তারা কি কখনো আইনের আওতায় আসবেন? নাকি তাঁরা নিজেরাই এখন রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ, সুতরাং বিচারের উর্ধ্বে? আইনজীবী রুবেল ভূঁইয়া যখন বলেন, এই বিষয়ে আমি কিছু জানি না, তখন তার সেই অস্বীকারোক্তির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে পুরো সিন্ডিকেটের চেহারা। জানেন সবাই, কিন্তু বলবেন না কেউ। কারণ বললেই তাসের ঘর ভেঙে পড়বে।
জুলাই দাঙ্গা ছিল একটি গভীর ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ। সেই ষড়যন্ত্র এখনো চলমান। মামলার পর মামলা, মিথ্যার পর মিথ্যা, সাজানো অভিযোগের পর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, এভাবেই এগিয়ে চলেছে একটি অবৈধ ক্ষমতার যাত্রা। যেখানে ক্যুকে বৈধতা দিতে বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে নিরপরাধ মানুষের আবেগকে, শহীদের স্মৃতিকে, আহতদের কাতরতাকে। অথচ প্রকৃত শহীদ আর আহতরা কেউ জানে না, তাদের নামে কেমন আঁধার নামিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর।
রাষ্ট্র এখন এক অদ্ভুত সংকটে। বিএনপি ক্ষমতায়, জামাত ভাগ বসিয়েছে, অথচ জনগণের আস্থা তলানিতে। অর্থনীতি ধুঁকছে, আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, প্রশাসন মেরুদণ্ডহীন। ঠিক এমন এক সময়ে দরকার ছিল সত্য প্রকাশের, জবাবদিহির, অপরাধীদের বিচারের। কিন্তু তার বদলে যা হচ্ছে, তা হলো ইতিহাসকে জবরদখল করে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। যে মামলার ঘটনাস্থলই ঠিক নয়, সে মামলা দিয়ে কি কখনো বিচার সম্ভব? যে বিচার মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে, তা কখনো ন্যায়বিচার হতে পারে না, হতে পারে কেবল প্রতিশোধের হাতিয়ার।

