নাটোরের লন্ড্রি দোকানি আজগর আলী প্রতিদিন সকাল ৯টায় দোকান খোলেন। রাত ১২টা পর্যন্ত কাপড় ইস্ত্রি করেন। একসময় প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০টি জামাকাপড় ইস্ত্রি করে ১ হাজার টাকার মতো আয় হতো। মাসে বিদ্যুৎ বিল আসতো আড়াই হাজার টাকা। এখন দিনে ৫০টি কাপড়ও ইস্ত্রি করতে পারেন না। আয় নেমে এসেছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। অথচ বিদ্যুৎ বিল বেড়ে হয়েছে তিন হাজারের ওপরে। দিনের ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। তিনি বলেন, “কাপড় ইস্ত্রি করে বর্তমানে যা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে মাসের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
এটা আজগর আলীর একার কাহিনী নয়। নাটোরের স’মিল শ্রমিক ইউসুফ আলী, ফরিদ খা, শমসের বাহাদুরেরাও একই অবস্থায় আছেন। মিলে কাঠের স্তূপ জমে গেলেও বিদ্যুতের অভাবে চেরানো যাচ্ছে না। ফলে কমেছে মজুরি। চালকলের শ্রমিকেরা ভোরে এসেও ধান সেদ্ধ শুরু করতে পারছেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুতের জন্য বসে থাকতে হচ্ছে। নাটোর জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রউফ চৌধুরী বলছেন, “ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে গত বছরের তুলনায় চাল উৎপাদন কমেছে। এ বছর চালকলগুলো সরকারি চাহিদার ১৬ হাজার ৬৭৫ মেট্রিক টন চাল দিতে সক্ষম হলেও বর্তমানে চাল উৎপাদন প্রায় বন্ধ রয়েছে।”
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার টিএম মেসবাহ উদ্দিন নিজেই স্বীকার করছেন, “এখন লোডশেডিং জাতীয় সমস্যা হয়ে গেছে।” তাদের আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৪৫ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট। অথচ নাটোর ও কাটাখালি গ্রিড থেকে সর্বোচ্চ ১১০ থেকে ১১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, কেন ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের মানুষ আবার ২০০১-০৬ সালের সেই অন্ধকার দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছে? কেন আবার ঘন ঘন লোডশেডিং, কেন আবার বিদ্যুৎ বিলের আকাশচুম্বী বৃদ্ধি, কেন আবার শ্রমিক-ব্যবসায়ীদের রোজগার কমে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে?
২০০১ সালে বিএনপি-জামাতের চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসেছিল। তখনও একই চিত্র ছিল। লোডশেডিং ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। আয় কমেছিল, বিল বেড়েছিল, সংসার চালানো কঠিন হয়েছিল। ২০০৬ সালে যখন বিএনপি-জামাতের অপশাসনের অবসান ঘটে, তখন মানুষ ভেবেছিল আর কখনো সেই দিন ফিরবে না। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, ইতিহাস যেন চক্রাকারে ফিরে এসেছে।
বিএনপি আর জামাতে ইসলাম আজ আবার ক্ষমতার ভাগ বসিয়ে বসে আছে। ২০০১-০৬ সালের মতোই তারা আবার প্রমাণ করছে, তারা ক্ষমতায় থাকলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যে জোটে শুধু অন্ধকার, শুধু দুর্ভোগ, শুধু অনিশ্চয়তা। আজগর আলীর মতো লন্ড্রি দোকানি, ইউসুফ আলীর মতো স’মিল শ্রমিক, চালকলের দিনমজুর, কুমকুম আক্তারের মতো গৃহিণী, সালাহ উদ্দীনের মতো গ্রামের মানুষ, ফজলে রাব্বীর মতো তরুণ সবাই আজ একই কষ্টের ভাগীদার।
নাটোর সদর উপজেলার দিঘাপতিয়া এলাকার বাসিন্দা কুমকুম আক্তার বলছেন, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে দিন-রাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রচণ্ড গরমে রাতে ঘুমাতে পারছি না আমরা।” লালপুর উপজেলার বিলমারিয়া গ্রামের সালাহ উদ্দীন, নলডাঙ্গা উপজেলার মাধনগর এলাকার ফজলে রাব্বী জানাচ্ছেন, স্বল্প সময় বিদ্যুৎ পেলেও দ্বিগুণের বেশি বিল আসছে। অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না।
২০০১-০৬ সালে বিএনপি-জামাতের শাসনামলে বাংলাদেশের মানুষ ঠিক এই অভিজ্ঞতাই পেয়েছিল। বিদ্যুৎ সংকট, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধস, শ্রমিকদের মজুরি কমা, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। ২০২৬ সালে এসে আবার সেই চিত্র। আবার সেই লোডশেডিং। আবার সেই বিল বৃদ্ধি। আবার সেই আয় কমা।
পল্লী বিদ্যুতের তথ্য বলছে, নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও ২-এর মাধ্যমে নাটোর এবং রাজশাহী অঞ্চলের ৯ লাখ গ্রাহক বৈদ্যুতিক সুবিধার আওতায় রয়েছেন। এই বিস্তৃত এলাকার লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করা হয় সিংড়া জোনাল অফিস, হাটগাংগোপাড়া সাব জোনাল অফিস, পুঠিয়া জোনাল অফিস, জামতলী সাব-জেনাল অফিস, বাগমারা জেনাল অফিস, নলডাঙ্গা সাব জোনাল অফিস, বাগাতিপাড়া সাব জোনাল অফিসের মাধ্যমে। গ্রাহকদের অভিযোগ, গত তিন মাস হলো চরম লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছেন তারা। আগের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও বিদ্যুৎ বিল আসছে দ্বিগুণ।
বিএনপি-জামাতের অপশাসনের চিত্র এবার আরও স্পষ্ট। ২০০১-০৬ সালে তারা ক্ষমতায় ছিল। ২০২৬ সালে তারা আবার ক্ষমতার ভাগ বসিয়ে বসে আছে। আর সাধারণ মানুষকে দিয়ে যাচ্ছে চরম দুর্ভোগের মধ্যে। আজগর আলীর মতো মানুষদের আয় কমে সংসারে টান পড়ছে। স’মিলের কাঠ চেরাই বন্ধ। চালকলের উৎপাদন বন্ধ। শ্রমিকরা ছাঁটাই হচ্ছেন। বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে। অথচ সমাধানের কোনো পথ নেই।
বিএনপি আর জামাতে ইসলাম ২০০১-০৬ সালে বাংলাদেশকে যে অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছিল, ২০২৬ সালে এসে তারা আবার সেই অন্ধকারে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আজ নাটোরের মানুষের ভোগান্তি, আগামীকাল সারা বাংলাদেশের। ২০০১-০৬ সালের সেই ভয়াবহ অপশাসনের স্মৃতি এখনো বাংলাদেশের মানুষের মনে গেঁথে আছে। ২০২৬ সালে এসে বিএনপি-জামাত আবার প্রমাণ করছে, তারা ক্ষমতায় থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনিবার্য।

