যেখানে ভোরের আলোয় চিৎকারের শব্দ হারিয়ে যায়, সেখানে গভীর রাতে চাপা পড়ে থাকে রাষ্ট্রের অপরাধ

রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের চার হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা কিন্তু খুনি কে, সেটা নয়। প্রশ্নটা তার চেয়েও অনেক গভীরে গিয়ে ঠেকেছে। প্রশ্নটা হলো, চারজনকে আসলে কখন হত্যা করা হয়েছিল? ভোরের প্রস্ফুটিত আলোয় নাকি রাতের অন্ধকারেই নিভে গিয়েছিল সপরিবারে গণপতি চক্রবর্তীর প্রাণ?

পুলিশ প্রশাসনের সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের আলো ফুটে যাওয়ার পর গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস এবং মুগ্ধ দাসকে দেখতে পান। তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী শব্দ শুনে একে একে ছাদে আসেন। তাঁরাও সেখানে নৃশংসভাবে খুন হন। এরপর ঘরের ভেতর ঘুম থেকে ওঠা ১২ বছরের প্রিয়মকেও হত্যা করা হয়।

একবার দৃশ্যটা চোখের সামনে কল্পনা করুন। একটি ঘনবসতিপূর্ণ মহল্লা। ভোরের আলো ফুটে গেছে। একটি ছাদে একের পর এক তিনজন মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। কেউ দেখল না? কেউ শুনল না? কেউ সামান্য আওয়াজ বা চিৎকার শুনল না? কেউ ছাদে মানুষের দৌড়াদৌড়ি দেখল না? টের পেল না? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, গণপতির সঙ্গে ধস্তাধস্তির যে শব্দ শুনে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে উঠে এলেন, সেই একই শব্দ কি আশেপাশের বাড়ির কোন একজন মানুষের কানে গেল না? যদি স্ত্রী-মেয়ে কোনপ্রকার চিৎকার চেঁচামেচি করে থাকেন, সেই চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ গেল কোথায়? ভোরের আলোয় এতগুলো মানুষকে হত্যা করা হলো, অথচ কয়েকশ পরিবারের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একজন প্রত্যক্ষ বা শ্রুতিসাক্ষীও পাওয়া গেল না, এই দৃশ্যটি কি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে? নাকি হত্যার সময়টাই আমাদের সামনে থাকা বর্ণনার চেয়ে অন্যরকম?

এবার আসুন ময়নাতদন্তের টেবিলে। চারটি মরদেহ। চারটি নীরব শরীর। কিন্তু সেই শরীরগুলোর ভেতরে পাওয়া গেল একেবারে ভরপেট খাবার। হ্যাঁ। ময়নাতদন্তের তথ্য অনুযায়ী, চারজনেরই পাকস্থলীতে ভরপেট খাবার ছিল। মূত্রথলিও ছিল খালি। শুধু এই তথ্য দিয়ে মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় বলা যায় না, এটা ঠিক। কিন্তু যদি পরিবার রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন তো উঠবেই, ময়নাতদন্তে পাওয়া খাবার কতটা হজম হয়েছিল? সেটি কি রাত ১টা থেকে ২টার মৃত্যুর সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি ভোরের আলোয় মৃত্যুর সঙ্গে? চারজনের শরীরে পাওয়া পোস্ট-মর্টেম পরিবর্তনগুলো কী বলছে? ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সম্ভাব্য মৃত্যুর সময় নিয়ে কী বলেছেন এবং এর সত্যতা কি যাচাই করা সম্ভব হয়েছে?

যখন পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক রিপোর্ট আসবে আর যদি সেইসব ফরেনসিক তথ্য একসঙ্গে বসিয়ে দেখা যায় যে মৃত্যুর সময় গভীর রাতের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, তাহলে ভোরের আলোয় ছাদে হত্যার গল্পটি কোথায় দাঁড়ায়? কী ব্যাখ্যা দেবে প্রশাসন? কারণ চারটি হত্যার ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার পার্থক্য কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। রাত আর ভোরের মধ্যে পার্থক্য মানে পুরো হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যপট একদম বদলে যাওয়া। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন, রাত আর ভোরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার পার্থক্য, এতে কীভাবে দৃশ্যপট বদলাতে পারে? হ্যাঁ, বদলাতে পারে। অনেকগুলো ফ্যাক্টর সামনে আসতে পারে, আমি শুধু গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় তুলে ধরব। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের সকলের পেটভরা খাবার, আবার মূত্রনালি খালি। ধরে নিলাম, রাত সাড়ে বারোটায় তারা রাতের খাবার খেয়েছিল। আর সর্বোচ্চ ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে তারা খুন হয়ে গেল, আবারো বলছি ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী এটার সম্ভাবনা জোরালো। তাহলে এই সময় দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস এবং মুগ্ধ দাস সীমান্তের বাড়ি থেকে অনেক আগেই বেরিয়ে সিদ্ধার্থ তার নিজের মোবাইল বন্ধক দিয়ে সাড়ে ৩ হাজার টাকা সংগ্রহ করে আরেক মাদক কারবারি শান্ত দাসের কাছ থেকে ৫টি ইয়াবা কেনার সময় পর্যন্ত ঠিক কতক্ষণ সময় লেগেছে, কখন তারা কথিত দেবুদের বিল্ডিংয়ে গেল, আবার সেই বিল্ডিং থেকে পাশের গণপতি চক্রবর্তীর বিল্ডিংয়ের ছাদে গেল, সেই টাইমিং মিলবে কীভাবে? অর্থাৎ, হত্যাকাণ্ড রাতে হলে এই দুই অভিযুক্ত কীভাবে কোন সময়ে কতক্ষণে সপরিবারে গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত হয়ে গেল, তার টাইমফ্রেম কীভাবে মেলানো হবে? প্রশাসন তো তাদের আগেই প্রস্ফুটিত আলোয় ঘটানো খুনি হিসেবে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে ফেলেছে, তাই না? তাহলে ময়নাতদন্তকে মান্যতা দিতে গেলে গভীর রাতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে, এর ব্যাখ্যা কী হবে?

আর তাই প্রশ্নটা এখন আরও ধারালো, চারজন মানুষকে যদি সত্যিই ভোরের আলোয় ছাদে একের পর এক হত্যা করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই হত্যাকাণ্ডের কোনো শব্দ, কোনো প্রত্যক্ষদর্শী, কোনো আশপাশের প্রতিক্রিয়া, কোনো স্বাধীন ডিজিটাল চিহ্ন কেন এখনো পর্যন্ত সামনে আসছে না? আর যদি হত্যাকাণ্ড গভীর রাতেই ঘটে থাকে, তাহলে ভোরের আলোয় হত্যার ঘটনাপ্রবাহটি তৈরি হলো কীভাবে? সত্যটা কোনটা? চারটি মরদেহ একদম নিশ্চুপ। ঘর নিশ্চুপ। ছাদ নিশ্চুপ। কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ফোনের সময়, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ডিজিটাল তথ্য এবং ঘটনাস্থলের প্রতিটি আলামত, সব একসঙ্গে বসালে কি সেই গভীর রাতের বীভৎসতার গল্পটিই বেরিয়ে আসবে না?

এই মামলার সবচেয়ে বড় রহস্য হয়তো শুধু খুনি কে, তা নয়। তারও আগে জানতে হবে, চারটি প্রাণ আসলে ঠিক কখন নিভে গিয়েছিল, গভীর রাতের অন্ধকারে, নাকি সত্যিই ভোরের আলো ফুটে যাওয়ার পর? এই একটি প্রশ্নের উত্তরই হয়তো পুরো হত্যাকাণ্ডের অন্ধকার ঘরে সর্বপ্রথম আলো জ্বালাতে পারে।

কিন্তু এই আলো জ্বালানোর আগেই তো প্রশাসন অন্ধকারকে আরও ঘন করেছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় থাকার সময় বাংলাদেশের মানুষ কী দেখেছে, তা কারও মনে থাকার কথা। জামাত-শিবিরের ক্যাডাররা রাস্তায় নামত, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হতো, সংখ্যালঘুদের ওপর চালানো হতো পৈশাচিক নির্যাতন। সেই সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। প্রশাসন ছিল দলীয়করণের শিকার। পুলিশের একটি বড় অংশ ছিল ক্ষমতাসীনদের হাতের পুতুল। এখন ২০২৬ সালে এসে আবারও সেই একই বিএনপি-জামাতের ছায়া বাংলাদেশের ওপর নেমে এসেছে। মাছুয়াপাড়ার গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ড তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

একটি পরিবারের চারজন মানুষ খুন হলো। প্রশাসন হত্যার সময় হিসেবে ভোরের আলোকে সামনে নিয়ে এলো। অথচ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, পাকস্থলীর খাবার, মূত্রথলির অবস্থা, ফরেনসিক পরিবর্তন, ফোনের টাইমলাইন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়, সবকিছু মিলিয়ে যে গভীর রাতের দিকেই ইঙ্গিত করছে, সেটা প্রশাসন কীভাবে এড়িয়ে যাবে? আর যদি সত্যিই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট গভীর রাতের হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, তাহলে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি, সংবাদ সম্মেলনের ভাষ্য, সবই মিথ্যা প্রমাণিত হবে। তখন প্রশ্ন উঠবে, প্রশাসন কেন মিথ্যা কাহিনি তৈরি করেছে? কাকে রক্ষা করতে চাইছে? কোন রাজনৈতিক স্বার্থে একটি পরিবারের চারটি প্রাণের সত্যতা লুকানো হচ্ছে?

বিএনপি-জামাত ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল। সেই সময়ে বাংলাদেশে যে ধরনের হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, দলীয়করণ হয়েছে, তার নজির সারা বিশ্বে বিরল। এখন ২০২৬ সালে এসে সেই একই পরিস্থিতি ফিরে এসেছে। রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের চারটি মৃত্যু কেবল একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। বার্তাটা হলো, বিএনপি-জামাতের শাসনামলে সংখ্যালঘু পরিবারগুলো কতটা অসহায়, কতটা অরক্ষিত, কতটা প্রাণঘাতী অবস্থার মধ্যে বসবাস করে।

যখন একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভোরের আলোয় চারজনকে হত্যা করা হয়, অথচ কেউ কিছু দেখে না, শোনে না, প্রশাসন তখন বলে, এটা ভোরের হত্যাকাণ্ড। কিন্তু ময়নাতদন্ত বলে, না, এটা গভীর রাতের হত্যাকাণ্ড। প্রশাসন তখন বলে, অভিযুক্তরা স্বীকার করেছে। কিন্তু ফরেনসিক টাইমলাইন বলে, অভিযুক্তদের সেই সময়ে সেখানে থাকার কোনো সুযোগই নেই। প্রশাসন তখন বলে, আমরা ন্যায়বিচার দেব। কিন্তু ইতিহাস বলে, বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলে ন্যায়বিচার শুধুই একটি মায়া।

মাছুয়াপাড়ার এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে যে প্রশ্নগুলো তুলে ধরছে, সেগুলোর উত্তর যদি প্রশাসন দিতে না পারে, তাহলে বুঝতে হবে, সত্য লুকানোর একটি বড় রাজনৈতিক খেলা চলছে। আর সেই খেলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বিএনপি-জামাত। কারণ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের অপশাসনের মতো ২০২৬ সালে এসে আবারও একই ধরনের অপশাসন ফিরে এসেছে। সংখ্যালঘু পরিবারগুলো আবারও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের বিচার আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রশাসন আবারও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার হচ্ছে।

আর তাই প্রশ্নটা এখন আরও স্পষ্ট, চারজনকে হত্যা করা হয়েছিল গভীর রাতে, নাকি ভোরের আলোয়? এই প্রশ্নের উত্তর যদি প্রশাসন সঠিকভাবে না দেয়, তাহলে সন্দেহ আরও গভীর হবে। কারণ একটি পরিবারের চারটি প্রাণ একসঙ্গে নিভে যাওয়া মানে শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর একটি সুপরিকল্পিত চিত্র। এই চিত্রের সঙ্গে বিএনপি-জামাতের ২০০১-০৬ সালের অপশাসনের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। আর ২০২৬ সালে সেই যোগসূত্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের চার হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা কিন্তু খুনি কে, সেটা নয়। প্রশ্নটা তার চেয়েও অনেক গভীরে গিয়ে ঠেকেছে। প্রশ্নটা হলো, চারজনকে আসলে কখন হত্যা করা হয়েছিল? ভোরের প্রস্ফুটিত আলোয় নাকি রাতের অন্ধকারেই নিভে গিয়েছিল সপরিবারে গণপতি চক্রবর্তীর প্রাণ?

পুলিশ প্রশাসনের সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের আলো ফুটে যাওয়ার পর গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস এবং মুগ্ধ দাসকে দেখতে পান। তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী শব্দ শুনে একে একে ছাদে আসেন। তাঁরাও সেখানে নৃশংসভাবে খুন হন। এরপর ঘরের ভেতর ঘুম থেকে ওঠা ১২ বছরের প্রিয়মকেও হত্যা করা হয়।

একবার দৃশ্যটা চোখের সামনে কল্পনা করুন। একটি ঘনবসতিপূর্ণ মহল্লা। ভোরের আলো ফুটে গেছে। একটি ছাদে একের পর এক তিনজন মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। কেউ দেখল না? কেউ শুনল না? কেউ সামান্য আওয়াজ বা চিৎকার শুনল না? কেউ ছাদে মানুষের দৌড়াদৌড়ি দেখল না? টের পেল না? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, গণপতির সঙ্গে ধস্তাধস্তির যে শব্দ শুনে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে উঠে এলেন, সেই একই শব্দ কি আশেপাশের বাড়ির কোন একজন মানুষের কানে গেল না? যদি স্ত্রী-মেয়ে কোনপ্রকার চিৎকার চেঁচামেচি করে থাকেন, সেই চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ গেল কোথায়? ভোরের আলোয় এতগুলো মানুষকে হত্যা করা হলো, অথচ কয়েকশ পরিবারের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একজন প্রত্যক্ষ বা শ্রুতিসাক্ষীও পাওয়া গেল না, এই দৃশ্যটি কি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে? নাকি হত্যার সময়টাই আমাদের সামনে থাকা বর্ণনার চেয়ে অন্যরকম?

এবার আসুন ময়নাতদন্তের টেবিলে। চারটি মরদেহ। চারটি নীরব শরীর। কিন্তু সেই শরীরগুলোর ভেতরে পাওয়া গেল একেবারে ভরপেট খাবার। হ্যাঁ। ময়নাতদন্তের তথ্য অনুযায়ী, চারজনেরই পাকস্থলীতে ভরপেট খাবার ছিল। মূত্রথলিও ছিল খালি। শুধু এই তথ্য দিয়ে মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় বলা যায় না, এটা ঠিক। কিন্তু যদি পরিবার রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন তো উঠবেই, ময়নাতদন্তে পাওয়া খাবার কতটা হজম হয়েছিল? সেটি কি রাত ১টা থেকে ২টার মৃত্যুর সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি ভোরের আলোয় মৃত্যুর সঙ্গে? চারজনের শরীরে পাওয়া পোস্ট-মর্টেম পরিবর্তনগুলো কী বলছে? ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সম্ভাব্য মৃত্যুর সময় নিয়ে কী বলেছেন এবং এর সত্যতা কি যাচাই করা সম্ভব হয়েছে?

যখন পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক রিপোর্ট আসবে আর যদি সেইসব ফরেনসিক তথ্য একসঙ্গে বসিয়ে দেখা যায় যে মৃত্যুর সময় গভীর রাতের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, তাহলে ভোরের আলোয় ছাদে হত্যার গল্পটি কোথায় দাঁড়ায়? কী ব্যাখ্যা দেবে প্রশাসন? কারণ চারটি হত্যার ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার পার্থক্য কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। রাত আর ভোরের মধ্যে পার্থক্য মানে পুরো হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যপট একদম বদলে যাওয়া। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন, রাত আর ভোরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার পার্থক্য, এতে কীভাবে দৃশ্যপট বদলাতে পারে? হ্যাঁ, বদলাতে পারে। অনেকগুলো ফ্যাক্টর সামনে আসতে পারে, আমি শুধু গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় তুলে ধরব। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের সকলের পেটভরা খাবার, আবার মূত্রনালি খালি। ধরে নিলাম, রাত সাড়ে বারোটায় তারা রাতের খাবার খেয়েছিল। আর সর্বোচ্চ ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে তারা খুন হয়ে গেল, আবারো বলছি ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী এটার সম্ভাবনা জোরালো। তাহলে এই সময় দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস এবং মুগ্ধ দাস সীমান্তের বাড়ি থেকে অনেক আগেই বেরিয়ে সিদ্ধার্থ তার নিজের মোবাইল বন্ধক দিয়ে সাড়ে ৩ হাজার টাকা সংগ্রহ করে আরেক মাদক কারবারি শান্ত দাসের কাছ থেকে ৫টি ইয়াবা কেনার সময় পর্যন্ত ঠিক কতক্ষণ সময় লেগেছে, কখন তারা কথিত দেবুদের বিল্ডিংয়ে গেল, আবার সেই বিল্ডিং থেকে পাশের গণপতি চক্রবর্তীর বিল্ডিংয়ের ছাদে গেল, সেই টাইমিং মিলবে কীভাবে? অর্থাৎ, হত্যাকাণ্ড রাতে হলে এই দুই অভিযুক্ত কীভাবে কোন সময়ে কতক্ষণে সপরিবারে গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত হয়ে গেল, তার টাইমফ্রেম কীভাবে মেলানো হবে? প্রশাসন তো তাদের আগেই প্রস্ফুটিত আলোয় ঘটানো খুনি হিসেবে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে ফেলেছে, তাই না? তাহলে ময়নাতদন্তকে মান্যতা দিতে গেলে গভীর রাতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে, এর ব্যাখ্যা কী হবে?

আর তাই প্রশ্নটা এখন আরও ধারালো, চারজন মানুষকে যদি সত্যিই ভোরের আলোয় ছাদে একের পর এক হত্যা করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই হত্যাকাণ্ডের কোনো শব্দ, কোনো প্রত্যক্ষদর্শী, কোনো আশপাশের প্রতিক্রিয়া, কোনো স্বাধীন ডিজিটাল চিহ্ন কেন এখনো পর্যন্ত সামনে আসছে না? আর যদি হত্যাকাণ্ড গভীর রাতেই ঘটে থাকে, তাহলে ভোরের আলোয় হত্যার ঘটনাপ্রবাহটি তৈরি হলো কীভাবে? সত্যটা কোনটা? চারটি মরদেহ একদম নিশ্চুপ। ঘর নিশ্চুপ। ছাদ নিশ্চুপ। কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ফোনের সময়, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ডিজিটাল তথ্য এবং ঘটনাস্থলের প্রতিটি আলামত, সব একসঙ্গে বসালে কি সেই গভীর রাতের বীভৎসতার গল্পটিই বেরিয়ে আসবে না?

এই মামলার সবচেয়ে বড় রহস্য হয়তো শুধু খুনি কে, তা নয়। তারও আগে জানতে হবে, চারটি প্রাণ আসলে ঠিক কখন নিভে গিয়েছিল, গভীর রাতের অন্ধকারে, নাকি সত্যিই ভোরের আলো ফুটে যাওয়ার পর? এই একটি প্রশ্নের উত্তরই হয়তো পুরো হত্যাকাণ্ডের অন্ধকার ঘরে সর্বপ্রথম আলো জ্বালাতে পারে।

কিন্তু এই আলো জ্বালানোর আগেই তো প্রশাসন অন্ধকারকে আরও ঘন করেছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় থাকার সময় বাংলাদেশের মানুষ কী দেখেছে, তা কারও মনে থাকার কথা। জামাত-শিবিরের ক্যাডাররা রাস্তায় নামত, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হতো, সংখ্যালঘুদের ওপর চালানো হতো পৈশাচিক নির্যাতন। সেই সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। প্রশাসন ছিল দলীয়করণের শিকার। পুলিশের একটি বড় অংশ ছিল ক্ষমতাসীনদের হাতের পুতুল। এখন ২০২৬ সালে এসে আবারও সেই একই বিএনপি-জামাতের ছায়া বাংলাদেশের ওপর নেমে এসেছে। মাছুয়াপাড়ার গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ড তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

একটি পরিবারের চারজন মানুষ খুন হলো। প্রশাসন হত্যার সময় হিসেবে ভোরের আলোকে সামনে নিয়ে এলো। অথচ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, পাকস্থলীর খাবার, মূত্রথলির অবস্থা, ফরেনসিক পরিবর্তন, ফোনের টাইমলাইন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়, সবকিছু মিলিয়ে যে গভীর রাতের দিকেই ইঙ্গিত করছে, সেটা প্রশাসন কীভাবে এড়িয়ে যাবে? আর যদি সত্যিই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট গভীর রাতের হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, তাহলে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি, সংবাদ সম্মেলনের ভাষ্য, সবই মিথ্যা প্রমাণিত হবে। তখন প্রশ্ন উঠবে, প্রশাসন কেন মিথ্যা কাহিনি তৈরি করেছে? কাকে রক্ষা করতে চাইছে? কোন রাজনৈতিক স্বার্থে একটি পরিবারের চারটি প্রাণের সত্যতা লুকানো হচ্ছে?

বিএনপি-জামাত ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল। সেই সময়ে বাংলাদেশে যে ধরনের হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, দলীয়করণ হয়েছে, তার নজির সারা বিশ্বে বিরল। এখন ২০২৬ সালে এসে সেই একই পরিস্থিতি ফিরে এসেছে। রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের চারটি মৃত্যু কেবল একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। বার্তাটা হলো, বিএনপি-জামাতের শাসনামলে সংখ্যালঘু পরিবারগুলো কতটা অসহায়, কতটা অরক্ষিত, কতটা প্রাণঘাতী অবস্থার মধ্যে বসবাস করে।

যখন একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভোরের আলোয় চারজনকে হত্যা করা হয়, অথচ কেউ কিছু দেখে না, শোনে না, প্রশাসন তখন বলে, এটা ভোরের হত্যাকাণ্ড। কিন্তু ময়নাতদন্ত বলে, না, এটা গভীর রাতের হত্যাকাণ্ড। প্রশাসন তখন বলে, অভিযুক্তরা স্বীকার করেছে। কিন্তু ফরেনসিক টাইমলাইন বলে, অভিযুক্তদের সেই সময়ে সেখানে থাকার কোনো সুযোগই নেই। প্রশাসন তখন বলে, আমরা ন্যায়বিচার দেব। কিন্তু ইতিহাস বলে, বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলে ন্যায়বিচার শুধুই একটি মায়া।

মাছুয়াপাড়ার এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে যে প্রশ্নগুলো তুলে ধরছে, সেগুলোর উত্তর যদি প্রশাসন দিতে না পারে, তাহলে বুঝতে হবে, সত্য লুকানোর একটি বড় রাজনৈতিক খেলা চলছে। আর সেই খেলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বিএনপি-জামাত। কারণ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের অপশাসনের মতো ২০২৬ সালে এসে আবারও একই ধরনের অপশাসন ফিরে এসেছে। সংখ্যালঘু পরিবারগুলো আবারও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের বিচার আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রশাসন আবারও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার হচ্ছে।

আর তাই প্রশ্নটা এখন আরও স্পষ্ট, চারজনকে হত্যা করা হয়েছিল গভীর রাতে, নাকি ভোরের আলোয়? এই প্রশ্নের উত্তর যদি প্রশাসন সঠিকভাবে না দেয়, তাহলে সন্দেহ আরও গভীর হবে। কারণ একটি পরিবারের চারটি প্রাণ একসঙ্গে নিভে যাওয়া মানে শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর একটি সুপরিকল্পিত চিত্র। এই চিত্রের সঙ্গে বিএনপি-জামাতের ২০০১-০৬ সালের অপশাসনের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। আর ২০২৬ সালে সেই যোগসূত্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ