৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও এক ধাপ ওপরে উঠল। সম্প্রতি ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সামনে জুমা নামাজ শেষে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দমদম উত্তর আসনের বিজেপি বিধায়ক সৌরভ শিকদারের ফাঁসির দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে কট্টরপন্থী দল ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ’ এবং সমমনা কয়েকটি ইসলামপন্থী প্ল্যাটফর্ম। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা ব্যানার ও মুখে উচ্চারিত স্লোগানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ ও চরম উসকানির চিত্র।
বিশেষ করে, সমাবেশ থেকে গর্জে ওঠা “দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা! স্লোগানটি দুই দেশের বর্তমান নাজুক সম্পর্ককে নতুন করে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। কলকাতা বিমানবন্দরের রানওয়ে সংলগ্ন ১৩৬ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক বাকড়া মসজিদ অপসারণের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এই উগ্র কর্মসূচি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে এক অভূতপূর্ব শীতলতা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।ইসলামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দলগুলোর একাংশ এখন “দিল্লি না ঢাকা” স্লোগানের মাধ্যমে বোঝাতে চাইছে যে, বাংলাদেশ আর দিল্লির কোনো প্রভাব বা আধিপত্য মেনে নেবে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই রাজনৈতিক আবেগকে পুঁজি করে ভারতের একটি সাধারণ অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর উন্নয়ন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যা ভারতের সার্বভৌমত্বে সরাসরি আঘাতের শামিল। কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের মাত্র ১৬৫ মিটার দূরত্বে অবস্থিত এই বাকড়া মসজিদের কারণে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং রানওয়ের আধুনিকীকরণ থমকে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নীতি বা ‘আইসিএও’ (ICAO) মানদণ্ড অনুযায়ী, রানওয়ের এত কাছাকাছি কোনো ধর্মীয় বা বেসামরিক স্থাপনা থাকা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। ঘন কুয়াশায় বা জরুরি পরিস্থিতিতে বিমান অবতরণ ও উড্ডয়নের সময় এটি বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাছাড়া, মসজিদটি বিমানবন্দরের ‘লেভেল-৩’ উচ্চ-নিরাপত্তা জোনের ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ কোনো স্থায়ী বৈধ পাস ছাড়াই সেখানে যাতায়াত করত, যা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুরক্ষায় বড় ফাটল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, এই জমির মালিকানা সম্পূর্ণভাবে ভারতের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের। মসজিদ কমিটির অনড় অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিনের এই সংকট মেটাতে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নেন।
ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার বায়তুল মোকাররমের বিক্ষোভটি কেবল সাধারণ প্রতিবাদ নয়, বরং ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি এবং অযাচিত হস্তক্ষেপ। ভারতের একজন নির্বাচিত বিধায়কের ফাঁসি দাবি করে বাংলাদেশে কুশপুত্তলিকা দাহ বা ফাঁসির দড়িসমেত ব্যানার প্রদর্শন করা আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার শঙ্কা তৈরি করছে।
নয়াদিল্লির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. অনিমেষ রায় এ প্রসঙ্গে বলেন, “৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী এজেন্ডা খুব সহজেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কিন্তু কলকাতা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্পূর্ণ ভারতের নিজস্ব সার্বভৌম অধিকার। যেভাবে ঢাকার বায়তুল মোকাররমে ভারতের একজন বিধায়ককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ফাটলকে আরও চওড়া করবে।”
একই সুরে কলকাতার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা সেনগুপ্ত জানান যে, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আবেগকে যখন ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি ও নিরাপত্তা বিষয়ের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা আর সাধারণ রাজনৈতিক অধিকার থাকে না; বরং উসকানিতে রূপ নেয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা যে তারা কীভাবে এই চরমপন্থী কণ্ঠস্বরগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে।
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিমানবন্দরের সুরক্ষাকে অন্য সবকিছুর চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে বাংলাদেশে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা চলছে, তা দুই দেশের বর্তমান নাজুক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলবে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এড়াতে বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের উচিত এ ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করা।

