ধর্ষণ, ধর্ম আর রাজনীতির এই ত্রিভুজে বাংলাদেশ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে?

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সিরিজ ধর্ষণ ইস্যুতে খালেদ মহিউদ্দিন যখন শায়েখ আব্বাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, প্র্যাকটিক্যালি চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে ধর্ষণ সম্ভব কিনা, শায়েখ আব্বাসী বললেন, “জানালা খোলা ছিলো, চারজন তাঁকায় দেখলো।”

এটুকু শুনেই বোঝা যায় আমরা কোথায় আছি।

একটু কল্পনা করে দেখুন তো। চারজন সুস্থ মানুষ খোলা জানালা দিয়ে একটা ধর্ষণ হতে দেখছে। কেউ ৯৯৯ এ কল করছে না। কেউ দরজা ভাঙছে না। তারা মনোযোগ দিয়ে পুরো ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ পরে কোর্টে সাক্ষ্য দিতে হবে। এই চারজন আসলে সাক্ষী না, এরা হয় সাইকোপ্যাথ, নয়তো লাইভ পর্নোগ্রাফি উপভোগ করছে। আর এই দৃশ্যকল্পকে একজন ইসলামিক বক্তা বৈধতা দিচ্ছেন জাতীয় টেলিভিশনে, নির্দ্বিধায়।

তারপর খালেদ বললেন, ধর্ষিতাকে তো মেরেই ফেলা হয়েছে। শায়েখ বললেন, তখন সন্দেহভাজনকে শরীয়া আদালতে ডেকে জেরা করা হবে।

মানে কি দাঁড়াল? ভিকটিম কবরে। চার সাক্ষী নেই। আসামিকে কোর্টে ডাকা হলো। বিচারক জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি করেছ? আসামি বলল, না হুজুর। ব্যস, গেম ওভার।

যে লোক একটা মানুষকে ধর্ষণের প্রমাণ মুছতে খুন করে ফেলতে পারে, সে কোর্টে এসে হঠাৎ সত্যি কথা বলবে, এই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে পুরো যুক্তিটা। এটা বিচারব্যবস্থার আলোচনা না, এটা রূপকথা।

এখন প্রশ্ন হলো, এই রূপকথা এত জোরে জোরে বলা হচ্ছে কেন, এবং কাদের আমলে বলা হচ্ছে।

২০০১ সালের অক্টোবরের পর কী হয়েছিল এই দেশে, সেটা যারা ভুলে গেছেন তাদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর যে নৃশংসতা নেমে এসেছিল, তার একটা বড় অংশ ছিল নারীর উপর যৌন সহিংসতা। হিন্দু পরিবারের মেয়েরা ধর্ষিত হয়েছিল, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, থানায় মামলা নেওয়া হয়নি। কারণ অভিযুক্তরা ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় ছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর রিপোর্ট, সংসদে বিরোধী দলের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, সব মিলিয়ে সেই সময়ের দলিল এখনো আছে। সেই পাঁচ বছরে ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো মামলা খেয়েছেন এমন নারীর সংখ্যাও কম না।

জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গে আলাদা করে বিস্তর বলার দরকার নেই, কারণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরে নারীর উপর সংঘটিত নৃশংসতায় এই সংগঠনের সরাসরি ভূমিকা আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। যে সংগঠনের নেতারা একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে মিলে ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, সেই সংগঠন যখন ২০২৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়, তখন ধর্ষণের মামলায় “প্রমাণ নেই” বলে আসামি ছেড়ে দেওয়ার হার বাড়বে কিনা, এটা কি আদৌ অনুমান করা কঠিন?

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অনুপস্থিত ছিল। ভোটার উপস্থিতির যে সংখ্যা দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দেশে-বিদেশে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার এসেছে, তার বৈধতার প্রশ্ন একপাশে রাখলেও একটা বিষয় স্পষ্ট। যে সরকারের জনসমর্থনের ভিত্তি দুর্বল, সে সরকার টিকে থাকে ধর্মীয় রাজনীতি আর পেশিশক্তির উপর ভর করে। আর এই দুটো জিনিস যখন একসাথে কাজ করে, সবচেয়ে আগে বলি হয় নারী।

এই মুহূর্তে যে ইসলামিক বক্তারা টেলিভিশনে চার সাক্ষীর তত্ত্ব দিচ্ছেন, তারা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন বলে যুক্তি দেওয়া যায়। ওআইসির ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমি সহ আধুনিক ইসলামি আইনবিদরা স্পষ্টভাবে বলেছেন যে ধর্ষণের ক্ষেত্রে ডিএনএ, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণই যথেষ্ট, চার সাক্ষীর বাধ্যবাধকতা এখানে প্রযোজ্য না। কিন্তু মাঠের বক্তারা সেই ব্যাখ্যা দেন না। তারা সেই ব্যাখ্যাটাই জনপ্রিয় করেন যেটা ধর্ষকের পথ সহজ করে এবং ভিকটিমের পথ কঠিন করে। এটা কাকতালীয় না।

আমরা এমন একটা দেশে বাস করি যেখানে সিসিটিভি ফুটেজ, ডিএনএ রিপোর্ট, মেডিকেল পরীক্ষা, এই সব থাকার পরেও ধর্ষণের সাজার হার হতাশাজনকভাবে কম। তার উপর যদি রাজনৈতিক ছাদ থাকে আর ধর্মীয় আবরণ থাকে, তাহলে বিচার পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে যায়।

২০০১ থেকে ২০০৬ এর ইতিহাস এবং ২০২৬ এর বর্তমান পাশাপাশি রাখলে একটাই প্যাটার্ন দেখা যায়। একই মুখ, একই রাজনীতি, একই ফলাফল। শুধু বছরটা বদলেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সিরিজ ধর্ষণ ইস্যুতে খালেদ মহিউদ্দিন যখন শায়েখ আব্বাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, প্র্যাকটিক্যালি চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে ধর্ষণ সম্ভব কিনা, শায়েখ আব্বাসী বললেন, “জানালা খোলা ছিলো, চারজন তাঁকায় দেখলো।”

এটুকু শুনেই বোঝা যায় আমরা কোথায় আছি।

একটু কল্পনা করে দেখুন তো। চারজন সুস্থ মানুষ খোলা জানালা দিয়ে একটা ধর্ষণ হতে দেখছে। কেউ ৯৯৯ এ কল করছে না। কেউ দরজা ভাঙছে না। তারা মনোযোগ দিয়ে পুরো ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ পরে কোর্টে সাক্ষ্য দিতে হবে। এই চারজন আসলে সাক্ষী না, এরা হয় সাইকোপ্যাথ, নয়তো লাইভ পর্নোগ্রাফি উপভোগ করছে। আর এই দৃশ্যকল্পকে একজন ইসলামিক বক্তা বৈধতা দিচ্ছেন জাতীয় টেলিভিশনে, নির্দ্বিধায়।

তারপর খালেদ বললেন, ধর্ষিতাকে তো মেরেই ফেলা হয়েছে। শায়েখ বললেন, তখন সন্দেহভাজনকে শরীয়া আদালতে ডেকে জেরা করা হবে।

মানে কি দাঁড়াল? ভিকটিম কবরে। চার সাক্ষী নেই। আসামিকে কোর্টে ডাকা হলো। বিচারক জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি করেছ? আসামি বলল, না হুজুর। ব্যস, গেম ওভার।

যে লোক একটা মানুষকে ধর্ষণের প্রমাণ মুছতে খুন করে ফেলতে পারে, সে কোর্টে এসে হঠাৎ সত্যি কথা বলবে, এই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে পুরো যুক্তিটা। এটা বিচারব্যবস্থার আলোচনা না, এটা রূপকথা।

এখন প্রশ্ন হলো, এই রূপকথা এত জোরে জোরে বলা হচ্ছে কেন, এবং কাদের আমলে বলা হচ্ছে।

২০০১ সালের অক্টোবরের পর কী হয়েছিল এই দেশে, সেটা যারা ভুলে গেছেন তাদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর যে নৃশংসতা নেমে এসেছিল, তার একটা বড় অংশ ছিল নারীর উপর যৌন সহিংসতা। হিন্দু পরিবারের মেয়েরা ধর্ষিত হয়েছিল, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, থানায় মামলা নেওয়া হয়নি। কারণ অভিযুক্তরা ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় ছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর রিপোর্ট, সংসদে বিরোধী দলের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, সব মিলিয়ে সেই সময়ের দলিল এখনো আছে। সেই পাঁচ বছরে ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো মামলা খেয়েছেন এমন নারীর সংখ্যাও কম না।

জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গে আলাদা করে বিস্তর বলার দরকার নেই, কারণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরে নারীর উপর সংঘটিত নৃশংসতায় এই সংগঠনের সরাসরি ভূমিকা আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। যে সংগঠনের নেতারা একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে মিলে ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, সেই সংগঠন যখন ২০২৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়, তখন ধর্ষণের মামলায় “প্রমাণ নেই” বলে আসামি ছেড়ে দেওয়ার হার বাড়বে কিনা, এটা কি আদৌ অনুমান করা কঠিন?

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অনুপস্থিত ছিল। ভোটার উপস্থিতির যে সংখ্যা দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দেশে-বিদেশে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার এসেছে, তার বৈধতার প্রশ্ন একপাশে রাখলেও একটা বিষয় স্পষ্ট। যে সরকারের জনসমর্থনের ভিত্তি দুর্বল, সে সরকার টিকে থাকে ধর্মীয় রাজনীতি আর পেশিশক্তির উপর ভর করে। আর এই দুটো জিনিস যখন একসাথে কাজ করে, সবচেয়ে আগে বলি হয় নারী।

এই মুহূর্তে যে ইসলামিক বক্তারা টেলিভিশনে চার সাক্ষীর তত্ত্ব দিচ্ছেন, তারা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন বলে যুক্তি দেওয়া যায়। ওআইসির ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমি সহ আধুনিক ইসলামি আইনবিদরা স্পষ্টভাবে বলেছেন যে ধর্ষণের ক্ষেত্রে ডিএনএ, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণই যথেষ্ট, চার সাক্ষীর বাধ্যবাধকতা এখানে প্রযোজ্য না। কিন্তু মাঠের বক্তারা সেই ব্যাখ্যা দেন না। তারা সেই ব্যাখ্যাটাই জনপ্রিয় করেন যেটা ধর্ষকের পথ সহজ করে এবং ভিকটিমের পথ কঠিন করে। এটা কাকতালীয় না।

আমরা এমন একটা দেশে বাস করি যেখানে সিসিটিভি ফুটেজ, ডিএনএ রিপোর্ট, মেডিকেল পরীক্ষা, এই সব থাকার পরেও ধর্ষণের সাজার হার হতাশাজনকভাবে কম। তার উপর যদি রাজনৈতিক ছাদ থাকে আর ধর্মীয় আবরণ থাকে, তাহলে বিচার পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে যায়।

২০০১ থেকে ২০০৬ এর ইতিহাস এবং ২০২৬ এর বর্তমান পাশাপাশি রাখলে একটাই প্যাটার্ন দেখা যায়। একই মুখ, একই রাজনীতি, একই ফলাফল। শুধু বছরটা বদলেছে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ