মাছুয়াপাড়ার রক্তাক্ত রাত, পুলিশের রঙ্গিন ব্যাখ্যা এবং রংপুরে জজ মিয়ার প্রত্যাবর্তন

রংপুরের মাছুয়াপাড়ার বাসাটিতে এখনও রক্তের দাগ শুকায়নি, অথচ পুলিশের গল্প লেখা শেষ। যে চারটি মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে দখিগঞ্জ শ্মশানে, তাঁদের ছাই এখনও উড়ছে বাতাসে, কিন্তু তদন্তকারীদের কাছে অপরাধের ব্যাখ্যা জমা হয়ে গেছে গোছানো ফাইলের মতো। এই আত্মবিশ্বাস দেখে কার না সন্দেহ হয় যে এখানে সত্য খোঁজার চেয়ে আখ্যান রচনার তাগিদই বেশি ছিল?

পুলিশ কমিশনার যে সংবাদ সম্মেলনে হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন, তা পাঠ করলে মনে হয় কোনো সিনেমার স্ক্রিপ্ট পড়া হচ্ছে। ইয়াবা সেবন করতে এসেছিল দুই তরুণ, দেখে ফেলায় পরিবারের সবাইকে খুন করল। খুনের পর খেজুর, শসা খেল, সোনা পরীক্ষা করল, বিদ্যুৎ কেটে অন্ধকারে কাজ সারল, জুমার নামাজের কথা মনে রেখে সময়ক্ষেপণ করল। এই বর্ণনার প্রতিটি শব্দ যেন দর্শক মনোরঞ্জনের জন্য সাজানো। বাস্তব অপরাধ তদন্তে এমন ঝরঝরে গল্প মেলে কদাচিৎ, আর যখন মেলে তখন সেটি হয় খুব সরল সত্য নয়তো সুবিধাজনক মিথ্যা।

ময়নাতদন্তে যে তথ্য এসেছে, তা পুলিশের গল্পের ভিতই ধ্বসিয়ে দিয়েছে। পুলিশ বলেছিল, মেয়েটির চোয়াল ভেঙে চোখ বেরিয়ে গিয়েছিল রশির টানে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ জানালেন, চোয়াল ভাঙার কোনো চিহ্ন নেই। মুখমণ্ডলের যে ক্ষত, তা মরদেহ পঁচনের স্বাভাবিক ফল। পুলিশ বলেছিল, আসামিরা ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে। কিন্তু যে পরিবারের সদস্যরা একে একে নিজেদের হত্যা করিয়ে নিয়েছেন চুপচাপ, সেই দৃশ্য কল্পনা করলে বরং মনে হয়, ভুক্তভোগীরা আত্মহত্যা করেছেন খুনিদের সাহায্যে! এতটা আজ্ঞাবহ ভিকটিম অপরাধ জগতে বিরল বৈকি!

প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক, বিদ্যুতের লাইন কাটা ছিল কেন? পুলিশের গল্প অনুযায়ী, সবকিছু হঠাৎ ঘটে গেছে। তাহলে আগে থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ কোথায়? স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মন নিশ্চিত করেছেন, সংযোগটি স্বাভাবিক ত্রুটির মতো কাটা ছিল না, ইচ্ছা করে খোলা হয়েছিল। হঠাৎ খুনের গল্পের সঙ্গে আগে থেকে বিদ্যুৎ কেটে রাখার এই তথ্য মেলে না। তাহলে কি পুলিশের বলা সময়সূচির আগেই কিছু ঘটেছিল? নাকি ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা আগে থেকেই বাসার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার মতো স্থানীয় জ্ঞান রাখত?

শার্টের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। সিদ্ধার্থর বাবা বলেছেন, পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় ছেলের গায়ে ছিল ঘিয়া রঙের গেঞ্জি। গ্রেপ্তারের পর ছেলের গায়ে দেখা গেল আড়ংয়ের শার্ট, যে শার্টের হুবহু জোড়া পরেছিলেন ডিবির এক কর্মকর্তা। পুলিশের ব্যাখ্যা, আড়ংয়ের এই শার্ট রংপুরে দুই শো জনের আছে। যে শহরে আড়ংয়ের শোরুমের ক্রেতা সংখ্যাই সীমিত, সেখানে একই সময়ে একই ডিজাইনের শার্ট দুটি ভিন্ন মানুষের গায়ে, যাদের একজন পুলিশ অপরাধী ধরতে গেছে, আরেকজন অপরাধী হিসেবে ধরা পড়েছে, এই কাকতালীয়তা ঔপন্যাসিকেরও সাহসে কুলায় না। আড়ং একই ডিজাইনের পোশাক ব্যাপক সংখ্যায় তৈরি করে না, এটা ফ্যাশন জগতের সাধারণ জ্ঞান। দুই শো জনের কথা বলে পুলিশ আসলে নিজেরাই নিজেদের গল্পের ফুটোটা চওড়া করে দিয়েছে।

এই প্রসঙ্গে, ২০১৬ সালের ঝিনাইদহের ঘটনাগুলো এখানে অনিবার্যভাবে এসেই পড়ে। গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার আগে ঝিনাইদহে হিন্দু পুরোহিত, খ্রিস্টান, শিয়া মতাদর্শী মানুষদের পরপর হত্যা করা হয়েছিল। তখনও পুলিশ বলেছিল, বিচ্ছিন্ন ঘটনা, সাধারণ অপরাধ। পরে দেখা গেল, সেগুলো ছিল বড় হামলার আগে জঙ্গিদের দক্ষতা যাচাইয়ের ট্রায়াল। রংপুরে এর আগে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি খুন হয়েছিলেন জেএমবির হাতে। সেই রংপুরেই আবার সংখ্যালঘু পরিবারের চারজনকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো। পুলিশের দায়সারা গল্প মেনে নিলে ঘুম আসবে না কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষেরই।

গণপতি চক্রবর্তীর কাছে চাঁদা দাবির তথ্যটি পুলিশ আমলে নেয়নি। তার স্বজনরা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী কারা চাঁদা চাইছিল, পরে বিষয়টির মীমাংসাও হয়েছিল। কারা চাঁদা চাইত? কী মীমাংসা হয়েছিল? এই সূত্র ধরে তদন্ত করলে হয়তো এমন কিছু বেরিয়ে আসত, যা পুলিশের ইয়াবা গল্পের চেয়ে অনেক বেশি অস্বস্তিকর। পুলিশ সেদিকে যায়নি। বরং গল্প সাজিয়েছে মাদক সেবনের মতো সুবিধাজনক মোটিভ দিয়ে। বাংলাদেশে এখন যে কোনো অপরাধের দায় চাপানো হয় মাদকের ওপর। মাদকসেবী মানেই নির্দয় খুনি, এই ফর্মুলা মেনে চললে তদন্তের দরকারই পড়ে না।

মেয়েদের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন, শিশুটির শরীরে ধারালো অস্ত্রের ক্ষত, মুখমণ্ডল পুড়িয়ে দেওয়ার মতো অবস্থা, এই সব তথ্য পুলিশের গল্পে অনুপস্থিত। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক প্রকাশ্যে বলেছেন, মুখমণ্ডলের অবস্থা পঁচনের ফল। কিন্তু লিক হওয়া ছবি দেখে মনে হয়, মরদেহগুলো এমনভাবে ফেলে রাখা হয়েছিল যেন শনাক্ত করা কঠিন হয়। মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়িতে, ছেলের মরদেহ খাটের নিচে, বাবার মরদেহ ছাদে। এই ছড়িয়ে থাকা মরদেহগুলোর অবস্থান পুলিশের বলা ঘটনাক্রমের সঙ্গে মেলে না। একে একে সবাই খুনিদের সামনে এসে নিজেদের হত্যা করিয়েছেন, এই গল্প বিশ্বাস করতে হলে অপরাধবিজ্ঞানের প্রাথমিক জ্ঞানও ভুলে যেতে হয়।

যে দুই তরুণকে আসামি করা হয়েছে, তারা সমাজের নিচুতলার মানুষ। একজনের নামের পদবি দাস, অন্যজনের জীবনকাহিনি মাছের আড়ত আর স্বর্ণের দোকানের কর্মচারী। তাদের পরিবারের বক্তব্য, তাদের দৈনন্দিন রুটিন, প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য, কোনো কিছুই মাদকসেবী বা খুনি হিসেবে তাদের চিহ্নিত করে না। পুলিশ চাইলে সহজেই ডোপ টেস্ট করে দেখাতে পারত। তা করা হয়নি। বরং সংবাদ সম্মেলনে তাদের অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়েছে। আদালতে জবানবন্দির খবর এসেছে, অথচ সেই জবানবন্দির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশে আদালতে জবানবন্দির ইতিহাস কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা জজ মিয়ার ঘটনা মনে করলেই বোঝা যায়।

২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলার পর নোয়াখালীর এক নিঃস্ব মানুষকে ধরে আনা হয়েছিল, তার নাম দিয়ে সব দায় চাপানো হয়েছিল। পরে প্রমাণিত হয়, তিনি নির্দোষ, আসল খুনিরা তখন ক্ষমতার আড়ালে। সেই একই রেসিপি কি আবার প্রয়োগ করা হচ্ছে রংপুরে? সমাজের দুর্বল শ্রেণির দুই তরুণকে ধরে এনে সব দায় চাপিয়ে আসল অপরাধীদের বাঁচিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে কি না, এই প্রশ্ন এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত।

বাংলাদেশে গত দুই বছরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে হলোকাস্ট চলছে, তার প্রেক্ষাপটে রংপুরের এই হত্যাকাণ্ডকে দেখা জরুরি। ২০২৪ সালের অগাস্টে দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে, মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়েছে, নারীদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুট হয়েছে। রংপুরেও দুই হিন্দু ভায়রা ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ময়মনসিংহে দীপু দাসকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। গাইবান্ধায় রামমন্দির নির্মাণের উদ্যোক্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় গণপতি পরিবারের হত্যাকাণ্ড কি শুধুই মাদকসেবীদের কাণ্ড? নাকি এর পেছনে আছে পরিকল্পিত আগ্রাসন?

এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত। পুলিশের গল্পে জুমার নামাজের প্রসঙ্গ আনা হয়েছে এমনভাবে যেন খুনিরা মুসল্লিদের চোখ এড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশ কি জানে না, ওই এলাকায় মসজিদের চেয়ে মন্দির বেশি? যে এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু, সেখানে জুমার নামাজের ভয় দেখিয়ে হত্যার সময় নির্ধারণের গল্প কতটা যুক্তিসঙ্গত? এই একটি তথ্যই প্রমাণ করে, পুলিশের পুরো আখ্যান তৈরি করা গল্প, বাস্তব তদন্তের ফল নয়।

গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ভেতরে যে অবস্থা দেখা গেছে, তা থেকে বোঝা যায়, সেখানে এক ভয়াবহ রাত কেটেছে। চেয়ারে লাল ওড়না, মেঝেতে ধারালো ছুরি, ফ্রিজের সামনে উল্টে যাওয়া আসবাব, বিছানার নিচে শিশুর মরদেহ, সিঁড়িতে নগ্ন মরদেহ। এই দৃশ্য কোনো হঠাৎ খুনের নয়, এটা পরিকল্পিত এথনিক ক্লিনজিং। যারা এই কাজ করেছে, তারা জানে কীভাবে মানুষকে ভয় দেখাতে হয়, কীভাবে দেহ লুকাতে হয়, কীভাবে আলামত মুছতে হয়। নেশায় বুঁদ দুই তরুণের পক্ষে এত নিখুঁতভাবে কাজ করা অসম্ভব। পুলিশের গল্পে সেই প্রশিক্ষিত খুনিদের কোনো উল্লেখ নেই।

রংপুরের মানুষ এখন বিভ্রান্ত। একদিকে পুলিশের গল্প, অন্যদিকে বাস্তবের অসঙ্গতি। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে পুলিশের কাছে একটাই জবাব, তদন্ত চলছে, বিস্তারিত পরে জানানো হবে। কিন্তু যে সংবাদ সম্মেলনে হত্যার মোটিভ থেকে শুরু করে খুনিদের খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত সব বলা হয়ে গেছে, সেখানে আর কী গোপন থাকতে পারে? যদি গল্পই সত্য হয়, তাহলে এত অসঙ্গতি কেন? যদি সত্য না হয়, তাহলে এই গল্প শোনানো হচ্ছে কাকে বাঁচাতে?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে জানি, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার ইতিহাস দীর্ঘ। জজ মিয়া থেকে শুরু করে অনেক নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানো হয়েছে ক্ষমতার খেলায়। রংপুরের গণপতি পরিবারের হত্যাকাণ্ড যেন সেই তালিকায় আরেকটি অধ্যায় না হয়, সেজন্য দরকার নিরপেক্ষ তদন্ত। দরকার আন্তর্জাতিক মানের ফরেনসিক পরীক্ষা। দরকার সেইসব প্রশ্নের উত্তর, যেগুলো পুলিশ এখনও এড়িয়ে যাচ্ছে।

চারটি মরদেহের এখন পঞ্চভূতে মিলে গেছে। কিন্তু তাঁদের হত্যার সত্যিটা মিথ্যার আড়ালে চাপা পড়ে থাকুক, এটা মেনে নেওয়া যায় না। পুলিশ যদি সত্যিই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তাদের আগে স্বীকার করতে হবে, তারা যে গল্প বলেছে, তাতে ফুটো আছে। সেই ছিদ্রগুলো বন্ধ করতে হবে প্রমাণ দিয়ে, আরেকটি গাল-গল্প দিয়ে নয়। নাহলে সারাদেশের মানুষ বিশ্বাস হারাবে, আর বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা বুঝে যাবে, তাঁদের জীবনের মূল্য এদেশে আসলে কতটুকু!

রংপুরের মাছুয়াপাড়ার বাসাটিতে এখনও রক্তের দাগ শুকায়নি, অথচ পুলিশের গল্প লেখা শেষ। যে চারটি মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে দখিগঞ্জ শ্মশানে, তাঁদের ছাই এখনও উড়ছে বাতাসে, কিন্তু তদন্তকারীদের কাছে অপরাধের ব্যাখ্যা জমা হয়ে গেছে গোছানো ফাইলের মতো। এই আত্মবিশ্বাস দেখে কার না সন্দেহ হয় যে এখানে সত্য খোঁজার চেয়ে আখ্যান রচনার তাগিদই বেশি ছিল?

পুলিশ কমিশনার যে সংবাদ সম্মেলনে হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন, তা পাঠ করলে মনে হয় কোনো সিনেমার স্ক্রিপ্ট পড়া হচ্ছে। ইয়াবা সেবন করতে এসেছিল দুই তরুণ, দেখে ফেলায় পরিবারের সবাইকে খুন করল। খুনের পর খেজুর, শসা খেল, সোনা পরীক্ষা করল, বিদ্যুৎ কেটে অন্ধকারে কাজ সারল, জুমার নামাজের কথা মনে রেখে সময়ক্ষেপণ করল। এই বর্ণনার প্রতিটি শব্দ যেন দর্শক মনোরঞ্জনের জন্য সাজানো। বাস্তব অপরাধ তদন্তে এমন ঝরঝরে গল্প মেলে কদাচিৎ, আর যখন মেলে তখন সেটি হয় খুব সরল সত্য নয়তো সুবিধাজনক মিথ্যা।

ময়নাতদন্তে যে তথ্য এসেছে, তা পুলিশের গল্পের ভিতই ধ্বসিয়ে দিয়েছে। পুলিশ বলেছিল, মেয়েটির চোয়াল ভেঙে চোখ বেরিয়ে গিয়েছিল রশির টানে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ জানালেন, চোয়াল ভাঙার কোনো চিহ্ন নেই। মুখমণ্ডলের যে ক্ষত, তা মরদেহ পঁচনের স্বাভাবিক ফল। পুলিশ বলেছিল, আসামিরা ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে। কিন্তু যে পরিবারের সদস্যরা একে একে নিজেদের হত্যা করিয়ে নিয়েছেন চুপচাপ, সেই দৃশ্য কল্পনা করলে বরং মনে হয়, ভুক্তভোগীরা আত্মহত্যা করেছেন খুনিদের সাহায্যে! এতটা আজ্ঞাবহ ভিকটিম অপরাধ জগতে বিরল বৈকি!

প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক, বিদ্যুতের লাইন কাটা ছিল কেন? পুলিশের গল্প অনুযায়ী, সবকিছু হঠাৎ ঘটে গেছে। তাহলে আগে থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ কোথায়? স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মন নিশ্চিত করেছেন, সংযোগটি স্বাভাবিক ত্রুটির মতো কাটা ছিল না, ইচ্ছা করে খোলা হয়েছিল। হঠাৎ খুনের গল্পের সঙ্গে আগে থেকে বিদ্যুৎ কেটে রাখার এই তথ্য মেলে না। তাহলে কি পুলিশের বলা সময়সূচির আগেই কিছু ঘটেছিল? নাকি ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা আগে থেকেই বাসার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার মতো স্থানীয় জ্ঞান রাখত?

শার্টের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। সিদ্ধার্থর বাবা বলেছেন, পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় ছেলের গায়ে ছিল ঘিয়া রঙের গেঞ্জি। গ্রেপ্তারের পর ছেলের গায়ে দেখা গেল আড়ংয়ের শার্ট, যে শার্টের হুবহু জোড়া পরেছিলেন ডিবির এক কর্মকর্তা। পুলিশের ব্যাখ্যা, আড়ংয়ের এই শার্ট রংপুরে দুই শো জনের আছে। যে শহরে আড়ংয়ের শোরুমের ক্রেতা সংখ্যাই সীমিত, সেখানে একই সময়ে একই ডিজাইনের শার্ট দুটি ভিন্ন মানুষের গায়ে, যাদের একজন পুলিশ অপরাধী ধরতে গেছে, আরেকজন অপরাধী হিসেবে ধরা পড়েছে, এই কাকতালীয়তা ঔপন্যাসিকেরও সাহসে কুলায় না। আড়ং একই ডিজাইনের পোশাক ব্যাপক সংখ্যায় তৈরি করে না, এটা ফ্যাশন জগতের সাধারণ জ্ঞান। দুই শো জনের কথা বলে পুলিশ আসলে নিজেরাই নিজেদের গল্পের ফুটোটা চওড়া করে দিয়েছে।

এই প্রসঙ্গে, ২০১৬ সালের ঝিনাইদহের ঘটনাগুলো এখানে অনিবার্যভাবে এসেই পড়ে। গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার আগে ঝিনাইদহে হিন্দু পুরোহিত, খ্রিস্টান, শিয়া মতাদর্শী মানুষদের পরপর হত্যা করা হয়েছিল। তখনও পুলিশ বলেছিল, বিচ্ছিন্ন ঘটনা, সাধারণ অপরাধ। পরে দেখা গেল, সেগুলো ছিল বড় হামলার আগে জঙ্গিদের দক্ষতা যাচাইয়ের ট্রায়াল। রংপুরে এর আগে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি খুন হয়েছিলেন জেএমবির হাতে। সেই রংপুরেই আবার সংখ্যালঘু পরিবারের চারজনকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো। পুলিশের দায়সারা গল্প মেনে নিলে ঘুম আসবে না কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষেরই।

গণপতি চক্রবর্তীর কাছে চাঁদা দাবির তথ্যটি পুলিশ আমলে নেয়নি। তার স্বজনরা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী কারা চাঁদা চাইছিল, পরে বিষয়টির মীমাংসাও হয়েছিল। কারা চাঁদা চাইত? কী মীমাংসা হয়েছিল? এই সূত্র ধরে তদন্ত করলে হয়তো এমন কিছু বেরিয়ে আসত, যা পুলিশের ইয়াবা গল্পের চেয়ে অনেক বেশি অস্বস্তিকর। পুলিশ সেদিকে যায়নি। বরং গল্প সাজিয়েছে মাদক সেবনের মতো সুবিধাজনক মোটিভ দিয়ে। বাংলাদেশে এখন যে কোনো অপরাধের দায় চাপানো হয় মাদকের ওপর। মাদকসেবী মানেই নির্দয় খুনি, এই ফর্মুলা মেনে চললে তদন্তের দরকারই পড়ে না।

মেয়েদের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন, শিশুটির শরীরে ধারালো অস্ত্রের ক্ষত, মুখমণ্ডল পুড়িয়ে দেওয়ার মতো অবস্থা, এই সব তথ্য পুলিশের গল্পে অনুপস্থিত। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক প্রকাশ্যে বলেছেন, মুখমণ্ডলের অবস্থা পঁচনের ফল। কিন্তু লিক হওয়া ছবি দেখে মনে হয়, মরদেহগুলো এমনভাবে ফেলে রাখা হয়েছিল যেন শনাক্ত করা কঠিন হয়। মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়িতে, ছেলের মরদেহ খাটের নিচে, বাবার মরদেহ ছাদে। এই ছড়িয়ে থাকা মরদেহগুলোর অবস্থান পুলিশের বলা ঘটনাক্রমের সঙ্গে মেলে না। একে একে সবাই খুনিদের সামনে এসে নিজেদের হত্যা করিয়েছেন, এই গল্প বিশ্বাস করতে হলে অপরাধবিজ্ঞানের প্রাথমিক জ্ঞানও ভুলে যেতে হয়।

যে দুই তরুণকে আসামি করা হয়েছে, তারা সমাজের নিচুতলার মানুষ। একজনের নামের পদবি দাস, অন্যজনের জীবনকাহিনি মাছের আড়ত আর স্বর্ণের দোকানের কর্মচারী। তাদের পরিবারের বক্তব্য, তাদের দৈনন্দিন রুটিন, প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য, কোনো কিছুই মাদকসেবী বা খুনি হিসেবে তাদের চিহ্নিত করে না। পুলিশ চাইলে সহজেই ডোপ টেস্ট করে দেখাতে পারত। তা করা হয়নি। বরং সংবাদ সম্মেলনে তাদের অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়েছে। আদালতে জবানবন্দির খবর এসেছে, অথচ সেই জবানবন্দির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশে আদালতে জবানবন্দির ইতিহাস কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা জজ মিয়ার ঘটনা মনে করলেই বোঝা যায়।

২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলার পর নোয়াখালীর এক নিঃস্ব মানুষকে ধরে আনা হয়েছিল, তার নাম দিয়ে সব দায় চাপানো হয়েছিল। পরে প্রমাণিত হয়, তিনি নির্দোষ, আসল খুনিরা তখন ক্ষমতার আড়ালে। সেই একই রেসিপি কি আবার প্রয়োগ করা হচ্ছে রংপুরে? সমাজের দুর্বল শ্রেণির দুই তরুণকে ধরে এনে সব দায় চাপিয়ে আসল অপরাধীদের বাঁচিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে কি না, এই প্রশ্ন এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত।

বাংলাদেশে গত দুই বছরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে হলোকাস্ট চলছে, তার প্রেক্ষাপটে রংপুরের এই হত্যাকাণ্ডকে দেখা জরুরি। ২০২৪ সালের অগাস্টে দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে, মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়েছে, নারীদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুট হয়েছে। রংপুরেও দুই হিন্দু ভায়রা ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ময়মনসিংহে দীপু দাসকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। গাইবান্ধায় রামমন্দির নির্মাণের উদ্যোক্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় গণপতি পরিবারের হত্যাকাণ্ড কি শুধুই মাদকসেবীদের কাণ্ড? নাকি এর পেছনে আছে পরিকল্পিত আগ্রাসন?

এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত। পুলিশের গল্পে জুমার নামাজের প্রসঙ্গ আনা হয়েছে এমনভাবে যেন খুনিরা মুসল্লিদের চোখ এড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশ কি জানে না, ওই এলাকায় মসজিদের চেয়ে মন্দির বেশি? যে এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু, সেখানে জুমার নামাজের ভয় দেখিয়ে হত্যার সময় নির্ধারণের গল্প কতটা যুক্তিসঙ্গত? এই একটি তথ্যই প্রমাণ করে, পুলিশের পুরো আখ্যান তৈরি করা গল্প, বাস্তব তদন্তের ফল নয়।

গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ভেতরে যে অবস্থা দেখা গেছে, তা থেকে বোঝা যায়, সেখানে এক ভয়াবহ রাত কেটেছে। চেয়ারে লাল ওড়না, মেঝেতে ধারালো ছুরি, ফ্রিজের সামনে উল্টে যাওয়া আসবাব, বিছানার নিচে শিশুর মরদেহ, সিঁড়িতে নগ্ন মরদেহ। এই দৃশ্য কোনো হঠাৎ খুনের নয়, এটা পরিকল্পিত এথনিক ক্লিনজিং। যারা এই কাজ করেছে, তারা জানে কীভাবে মানুষকে ভয় দেখাতে হয়, কীভাবে দেহ লুকাতে হয়, কীভাবে আলামত মুছতে হয়। নেশায় বুঁদ দুই তরুণের পক্ষে এত নিখুঁতভাবে কাজ করা অসম্ভব। পুলিশের গল্পে সেই প্রশিক্ষিত খুনিদের কোনো উল্লেখ নেই।

রংপুরের মানুষ এখন বিভ্রান্ত। একদিকে পুলিশের গল্প, অন্যদিকে বাস্তবের অসঙ্গতি। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে পুলিশের কাছে একটাই জবাব, তদন্ত চলছে, বিস্তারিত পরে জানানো হবে। কিন্তু যে সংবাদ সম্মেলনে হত্যার মোটিভ থেকে শুরু করে খুনিদের খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত সব বলা হয়ে গেছে, সেখানে আর কী গোপন থাকতে পারে? যদি গল্পই সত্য হয়, তাহলে এত অসঙ্গতি কেন? যদি সত্য না হয়, তাহলে এই গল্প শোনানো হচ্ছে কাকে বাঁচাতে?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে জানি, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার ইতিহাস দীর্ঘ। জজ মিয়া থেকে শুরু করে অনেক নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানো হয়েছে ক্ষমতার খেলায়। রংপুরের গণপতি পরিবারের হত্যাকাণ্ড যেন সেই তালিকায় আরেকটি অধ্যায় না হয়, সেজন্য দরকার নিরপেক্ষ তদন্ত। দরকার আন্তর্জাতিক মানের ফরেনসিক পরীক্ষা। দরকার সেইসব প্রশ্নের উত্তর, যেগুলো পুলিশ এখনও এড়িয়ে যাচ্ছে।

চারটি মরদেহের এখন পঞ্চভূতে মিলে গেছে। কিন্তু তাঁদের হত্যার সত্যিটা মিথ্যার আড়ালে চাপা পড়ে থাকুক, এটা মেনে নেওয়া যায় না। পুলিশ যদি সত্যিই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তাদের আগে স্বীকার করতে হবে, তারা যে গল্প বলেছে, তাতে ফুটো আছে। সেই ছিদ্রগুলো বন্ধ করতে হবে প্রমাণ দিয়ে, আরেকটি গাল-গল্প দিয়ে নয়। নাহলে সারাদেশের মানুষ বিশ্বাস হারাবে, আর বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা বুঝে যাবে, তাঁদের জীবনের মূল্য এদেশে আসলে কতটুকু!

আরো পড়ুন

সর্বশেষ