২০২৪ সালের জুলাই মাস। ঢাকার রাস্তায় তখন আগুন, আর্তনাদ আর ধ্বংসের উৎসব। কারা এই আগুন জ্বালালো? কারা হত্যা করলো নিরীহ মানুষকে? কারা পুড়িয়ে দিলো সরকারি স্থাপনা? আজ ২০২৬ সালের আগস্টে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নগুলো আরও জোরে ঘুরে ফিরে আসছে। কারণ, এখন প্রকাশ্যে আসছে একের পর এক চমকে দেওয়া তথ্য। সর্বশেষ ঘটনা রাজধানীর ডেমরার সারুলিয়া এলাকার। সেখান থেকে পুলিশ আটক করল জুয়েল ভুঁইয়া ওরফে ওস্তাদকে। তার কাছ থেকে উদ্ধার হলো দুটি হাতে তৈরি বোমা। সাধারণ চোর-ছ্যাঁচ্চোরদের এত বোমা থাকে না, থাকে জঙ্গির কাছে।
জুয়েল ভুঁইয়া কোনো সাধারণ অপরাধী না। পুলিশের ভাষ্য, সে নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পালানো জঙ্গি। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কারাগারে দাঙ্গা বাধে, সেই সুযোগে পালায় জুয়েলসহ নয়জন। তারা সবাই নব্য জেএমবির সদস্য। আর জুয়েলের ঘনিষ্ঠজন নাজমুল হাসান মামুন ওরফে বোমারু মামুন, যে কিনা জেএমবির বোমা তৈরির কারিগর। এত বড় জঙ্গি নেটওয়ার্ক কি হুট করে গজায়? না, এর পেছনে থাকে পরিকল্পনা, থাকে টাকা, থাকে বিদেশি শক্তি আর দেশি দোসরদের সমর্থন।
মনে করুন তো, ২০২৪ সালের সেই জুলাই মাসে হঠাৎ করেই সারা দেশে তুমুল দাঙ্গা শুরু হলো। ছাত্র আন্দোলনের নামে রাস্তায় নেমে এলো সন্ত্রাসীরা। থানা, পুলিশ বক্স, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পুড়লো। কারাগার ভাঙলো, জঙ্গি পালালো। এত বড় সমন্বিত সহিংসতা কি কখনো স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে? পারে না। এর জন্য দরকার অস্ত্র, টাকা, প্রশিক্ষণ আর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্যটা কী ছিল? জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা। আর সেই কাজে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল কিছু স্বার্থান্বেষী মহল। তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করা। জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির তো প্রকাশ্যেই মাঠে ছিল। তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল জিয়াউর রহমানের আদর্শে বেড়ে ওঠা বিএনপির নেতাকর্মীরা। এই চক্রান্তের কেন্দ্রে ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি বিদেশি ঋণদাতাদের প্রিয়পাত্র, সুদখোর মহাজন হিসেবে পরিচিত, আর ক্ষমতা দখলের পর নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন জঙ্গি আর যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির কাজে।
জুয়েল ভুঁইয়ার গল্পটাই ভাবুন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পালালো। ২৫ জুলাই ধরা পড়লো। তারপর ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সেপ্টেম্বরে জামিনে বের হলো। কে দিলো এই জামিন? কোন আইনে একজন জঙ্গি, যে কিনা কারাগার ভেঙে পালিয়েছিল, সে এত দ্রুত জামিন পেল? কারণ, তখন আইন, বিচার আর প্রশাসন সব ছিল একদল দখলদারের হাতে। যারা জঙ্গিদের সাথে হাত মিলিয়েই ক্ষমতায় এসেছিল। তাদের কাছে জুয়েলরা ছিল বন্ধু, সহযোগী, বীর সেনানী।
আজ পরিস্থিতি বদলেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ক্ষমতায় বিএনপি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি আসলেই সেই জঙ্গি নেটওয়ার্ক থেকে নিজেদের আলাদা করতে পেরেছে? নাকি ক্ষমতার মোহে চোখ বন্ধ করে রেখেছে? জুয়েল ভুঁইয়ার মতো জঙ্গিরা যে এখনো রাজধানীতে বোমা বানাচ্ছে, এটা প্রমাণ করে সেই নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয়। তাদের পেছনে টাকা আসছে, অস্ত্র আসছে, আর আসছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। যদি তা না হতো, তাহলে একজন জামিনে বের হওয়া পলাতক জঙ্গি এতদিন কোথায় ছিল? কে তাকে আশ্রয় দিচ্ছিল? কে তার বোমা তৈরির খরচ জোগাচ্ছিল?
২০২৪ সালের সেই দাঙ্গা ছিল একটি পূর্ব পরিকল্পিত ক্যু। একটি নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে দিতে বিদেশি রাষ্ট্রের টাকা, জঙ্গি সংগঠনের পেশি শক্তি আর সামরিক বাহিনীর নীরব সমর্থনকে কাজে লাগানো হয়েছিল। যারা এই ষড়যন্ত্রের কারিগর, তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করা। আর সেই লক্ষ্যে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল জঙ্গিবাদকে লালন করা। আজ সেই জঙ্গিরাই আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে, কারণ তারা জানে তাদের পৃষ্ঠপোষকরা এখনো সমাজের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে আছে।
ডেমরার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। এটি একটি সতর্কবার্তা। যে জঙ্গি নেটওয়ার্ক ২০২৪ সালে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল, সেই নেটওয়ার্ক এখনো ধ্বংস হয়নি। বরং নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য আবারও অস্থিতিশীলতা তৈরি করা, আবারও রক্ত ঝরানো, আবারও সেই শক্তিকে ফিরিয়ে আনা যারা জঙ্গিদের হাতে তুলে দিয়েছিল রাষ্ট্রের চাবি।
অথচ কেউ কথা বলছে না। যারা ২০২৪ সালে রাস্তায় আগুন জ্বালিয়েছিল, যারা জঙ্গিদের জামিনে বের করে এনেছিল, তারা আজ হয় ক্ষমতায়, নয়তো ক্ষমতার খুব কাছাকাছি। তাদের কোনো জবাবদিহি নেই। নেই কোনো অনুশোচনা। জুয়েল ভুঁইয়া ধরা পড়েছে, কিন্তু বোমারু মামুন কোথায়? আরও কত জুয়েল, কত মামুন সক্রিয় আছে সারা দেশে, তার হিসাব কে রাখছে?
ইতিহাস ভুলে গেলে ইতিহাস আবার ফিরে আসে। বাংলাদেশের মানুষ ২০২৪ সালের সেই ভয়াবহ সময়ের কথা কি ভুলে গেছে? নাকি তারা বুঝে গেছে, আজ যে নীরবতা, আগামীকাল তা আবার পরিণত হবে আরেক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ে?

