নিরাপত্তাহীনতায় থরহরিকম্প জনজীবন, দৈনিক ১০ খুনের দেশে বিএনপি-জামাতের দায় কোথায়?

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির বুকে আজ যেন প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠে রক্তের দাগ মেখে। প্রতিদিন গড়ে ১০ জন করে মানুষ খুন হচ্ছেন। প্রতিদিন ১০টি পরিবার হারাচ্ছে তাদের আপনজনকে। প্রতিদিন ১০টি মরদেহ পড়ে থাকছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে, বাড়ির উঠানে, রাস্তার পাশে, ঝোপঝাড়ে। অথচ রাষ্ট্রের কর্ণধাররা যেন দেখছেন না, শুনছেন না, অনুভব করছেন না। জনগণের আর্তনাদ যেন পৌঁছাচ্ছে না কোনো কানে। কারণ এই আর্তনাদ শোনার মতো নৈতিক জায়গাটুকুই তো আজ শূন্য।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু মে থেকে জুলাই এই তিন মাসেই দেশে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৯৩৪টি। মানে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০ খুন। প্রতিদিন ১০টি। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে খুনের মামলা ২০৭৬টি। এই সংখ্যা শুধু শুকনো পরিসংখ্যান নয়, এ প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে রক্ত, আর্তনাদ, শোক, আর একটি করে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিবার।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলামের কথায়, “প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০’র মতো খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টা করে খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে।” পুলিশের এই স্বীকারোক্তিই বলে দেয়, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। কিন্তু শুধু স্বীকারোক্তি দিলেই তো দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। খুনিদের গ্রেপ্তার করা হয়, কিছু মামলার রায় হয়, তারপরও খুনের সংখ্যা কমে না। প্রশ্ন উঠছে, কেন?

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে বৈধ ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ধাক্কা সামলে না ওঠা, থানা থেকে অস্ত্র লুটপাটের ঘটনা, পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়া সব মিলিয়ে এক ধরনের অরাজকতাই তৈরি হয়েছে। আর এই সুযোগটা নিচ্ছে খুনিরা, সন্ত্রাসীরা, দখলদাররা, মাদক চক্র আর চাঁদাবাজরা।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দায়িত্বে কারা? ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি জামাত জোট সরকার। এই সরকারের প্রথম ছয় মাসের চিত্র কেমন? পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৭৮৯টি। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১৭৮০টি। অর্থাৎ খুনের মামলা বেড়েছে ৯টি। এটা কোন ধরনের শাসন? যে সরকার এসে খুনের সংখ্যা কমাতে পারল না, বরং ধরে রাখল আগের ধারাবাহিকতা, সেই সরকারের কাছে জনগণ কী আশা করতে পারে?

নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র আরও ভয়াবহ। গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। আগের ছয় মাসে ছিল ১০ হাজার ৯০টি। বেড়েছে ১০৭৫টি। অর্থাৎ নারী ও শিশুরা আজ সবচেয়ে বেশি অসুরক্ষিত। ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যা যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মিরপুরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার হয়েছে বটে, কিন্তু সেই দ্রুত বিচার কি সব ভুক্তভোগীর ভাগ্যে জোটে? রামিসার ঘটনা ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। প্রতিদিন দেশের আনাচে কানাচে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের শিকার মানুষগুলো বিচার পান না, পাবেনও না, কারণ ব্যবস্থাটাই আজ ভেঙে পড়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় মারা গেছে ১৩৪ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৫০ জন, চট্টগ্রামে ৩১ জন। মানুষকে পিটিয়ে হত্যা, পুড়িয়ে মারা, প্রকাশ্যে রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখা এসব ঘটনার সঙ্গে যেন সমাজ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। আর এই অপরাধ দমনে সরকারের ভূমিকা কোথায়? বিচার কোথায়? দায় কোথায়?

রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রটিও কম ভয়াবহ নয়। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত ৭৭ জন, আহত ২৯৭৪ জন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছে ১৬ জন। জামায়াত বিএনপির সংঘাতে ৯ জন। দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত ৪০ জন। অর্থাৎ ক্ষমতায় এসে নিজেদের দলীয় কোন্দল সামলাতে পারছে না বিএনপি, আর দেশের আইনশৃঙ্খলা সামলাবে কীভাবে? জামায়াতের লোকজনও প্রকাশ্যে সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে।

এলিনা খান, যিনি বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন, তার ভাষায়, “আমরা দেখছি নির্বাচিত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার পরিমাণ বাড়ছে। পদ পদবির জন্য মারামারি হচ্ছে। এই দায় তো সরকারকেই নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “এটা একটা নির্বাচিত সরকার। মানুষ চায় নিরাপত্তা। যে কোনো মূল্যে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এটির নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।”

অথচ এই সরকারের নেতারা কোথায় ব্যস্ত? কে কোন মন্ত্রণালয় লুটবে, কোন দপ্তরে কে বসবে, কোন ব্যাংক কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, কোন প্রকল্পে কার অংশীদারিত্ব থাকবে এই নিয়ে দিনরাত দলাদলি, কাড়াকাড়ি, লবিং, ঘুষ, দুর্নীতি। জনগণের নিরাপত্তা কারও মাথাব্যথা নয়। পুলিশ আজ নাস্তানাবুদ। একদিকে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে না, আরেকদিকে পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই প্রাণের ভয়ে কাজ করছে না। ২০২৪ সালের জুলাই দাঙ্গার পর পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়েছে। সেই দুর্বলতাটুকু কাটিয়ে ওঠার কোনো চেষ্টা চোখে পড়ে না। বরং পুলিশ প্রশাসনের ভেতরেও দলীয়করণ, পদোন্নতিতে অনিয়ম, বদলির রাজনীতি চলছে পুরোদমে।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক এই পরিস্থিতিকে বলছেন, “এখন অনেকের হাতে হাতে অস্ত্র চলে গেছে। অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বাড়ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিবাদ কিংবা ক্ষমতার আধিপত্যের কারণে খুন ও সহিংসতা বাড়ছে।” তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। কিন্তু সরকার কি সেই অভিযান চালাচ্ছে? নাকি শুধু পরিসংখ্যান বানিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে?

সবশেষ রংপুরের ঘটনা। এক ধর্মীয় সংখ্যালঘু শিক্ষক পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হয়েছে বাসায় ঢুকে। চারজন। একসঙ্গে। নিজের বাসায়। এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মনে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তা কি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভয়? না, এই ভয় দীর্ঘদিনের জমে থাকা নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। মানুষ জানে, আজ যে পরিবারটি খুন হলো, কাল যে কোনো পরিবারের ভাগ্যেও তা ঘটতে পারে। কারণ রাস্তায় গুলি, বাসায় ঢুকে খুন, ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাত, মবের পিটুনি, মাদকাসক্তের তাণ্ডব, রাজনৈতিক ক্যাডারদের সন্ত্রাস সব মিলিয়ে মানুষ আজ নিজের ঘরেও নিরাপদ নয়।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি জামাত শাসনামলে দেশে যে অপরাধ পরিস্থিতি ছিল, তার চিত্র নতুন করে মনে করতে হচ্ছে নাগরিকদের। তখনও সন্ত্রাস, বোমাবাজি, চাঁদাবাজি, খুন, গুম, খুনের পর মরদেহ গায়েব করে দেওয়ার ঘটনা ছিল নিত্যদিনের। মানুষ সে সময়টাকে বলত অন্ধকার যুগ। সেই অন্ধকার যুগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে কি না, এই প্রশ্ন এখন সবখানে। সন্ত্রাসীরা ছাড়া পাচ্ছে, মামলা শিকেয় উঠছে, পুলিশ মামলা নিতে চায় না, সাক্ষীরা ভয়ে সরে দাঁড়াচ্ছে, বিচার হচ্ছে না। সব মিলিয়ে আইনের শাসন আজ কার্যত অকার্যকর।

প্রতিদিন ১০টি খুনের খবর পত্রিকায় আসে, টেলিভিশনে ভেসে ওঠে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর সব হারিয়ে যায়। কিন্তু প্রতিটি খুনের পেছনে একটি করে পরিবার থেকে যায়, যাদের কান্না কখনো থামে না। সেই কান্নার মূল্য কি কোনোদিন বোঝা হবে? নাকি ক্ষমতার পালাবদল, দলীয় স্বার্থ, দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের খেলার মাঠে এই কান্না নিতান্তই গৌণ?

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির বুকে আজ যেন প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠে রক্তের দাগ মেখে। প্রতিদিন গড়ে ১০ জন করে মানুষ খুন হচ্ছেন। প্রতিদিন ১০টি পরিবার হারাচ্ছে তাদের আপনজনকে। প্রতিদিন ১০টি মরদেহ পড়ে থাকছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে, বাড়ির উঠানে, রাস্তার পাশে, ঝোপঝাড়ে। অথচ রাষ্ট্রের কর্ণধাররা যেন দেখছেন না, শুনছেন না, অনুভব করছেন না। জনগণের আর্তনাদ যেন পৌঁছাচ্ছে না কোনো কানে। কারণ এই আর্তনাদ শোনার মতো নৈতিক জায়গাটুকুই তো আজ শূন্য।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু মে থেকে জুলাই এই তিন মাসেই দেশে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৯৩৪টি। মানে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০ খুন। প্রতিদিন ১০টি। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে খুনের মামলা ২০৭৬টি। এই সংখ্যা শুধু শুকনো পরিসংখ্যান নয়, এ প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে রক্ত, আর্তনাদ, শোক, আর একটি করে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিবার।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলামের কথায়, “প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০’র মতো খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টা করে খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে।” পুলিশের এই স্বীকারোক্তিই বলে দেয়, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। কিন্তু শুধু স্বীকারোক্তি দিলেই তো দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। খুনিদের গ্রেপ্তার করা হয়, কিছু মামলার রায় হয়, তারপরও খুনের সংখ্যা কমে না। প্রশ্ন উঠছে, কেন?

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে বৈধ ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ধাক্কা সামলে না ওঠা, থানা থেকে অস্ত্র লুটপাটের ঘটনা, পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়া সব মিলিয়ে এক ধরনের অরাজকতাই তৈরি হয়েছে। আর এই সুযোগটা নিচ্ছে খুনিরা, সন্ত্রাসীরা, দখলদাররা, মাদক চক্র আর চাঁদাবাজরা।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দায়িত্বে কারা? ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি জামাত জোট সরকার। এই সরকারের প্রথম ছয় মাসের চিত্র কেমন? পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৭৮৯টি। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১৭৮০টি। অর্থাৎ খুনের মামলা বেড়েছে ৯টি। এটা কোন ধরনের শাসন? যে সরকার এসে খুনের সংখ্যা কমাতে পারল না, বরং ধরে রাখল আগের ধারাবাহিকতা, সেই সরকারের কাছে জনগণ কী আশা করতে পারে?

নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র আরও ভয়াবহ। গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। আগের ছয় মাসে ছিল ১০ হাজার ৯০টি। বেড়েছে ১০৭৫টি। অর্থাৎ নারী ও শিশুরা আজ সবচেয়ে বেশি অসুরক্ষিত। ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যা যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মিরপুরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার হয়েছে বটে, কিন্তু সেই দ্রুত বিচার কি সব ভুক্তভোগীর ভাগ্যে জোটে? রামিসার ঘটনা ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। প্রতিদিন দেশের আনাচে কানাচে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের শিকার মানুষগুলো বিচার পান না, পাবেনও না, কারণ ব্যবস্থাটাই আজ ভেঙে পড়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় মারা গেছে ১৩৪ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৫০ জন, চট্টগ্রামে ৩১ জন। মানুষকে পিটিয়ে হত্যা, পুড়িয়ে মারা, প্রকাশ্যে রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখা এসব ঘটনার সঙ্গে যেন সমাজ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। আর এই অপরাধ দমনে সরকারের ভূমিকা কোথায়? বিচার কোথায়? দায় কোথায়?

রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রটিও কম ভয়াবহ নয়। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত ৭৭ জন, আহত ২৯৭৪ জন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছে ১৬ জন। জামায়াত বিএনপির সংঘাতে ৯ জন। দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত ৪০ জন। অর্থাৎ ক্ষমতায় এসে নিজেদের দলীয় কোন্দল সামলাতে পারছে না বিএনপি, আর দেশের আইনশৃঙ্খলা সামলাবে কীভাবে? জামায়াতের লোকজনও প্রকাশ্যে সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে।

এলিনা খান, যিনি বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন, তার ভাষায়, “আমরা দেখছি নির্বাচিত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার পরিমাণ বাড়ছে। পদ পদবির জন্য মারামারি হচ্ছে। এই দায় তো সরকারকেই নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “এটা একটা নির্বাচিত সরকার। মানুষ চায় নিরাপত্তা। যে কোনো মূল্যে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এটির নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।”

অথচ এই সরকারের নেতারা কোথায় ব্যস্ত? কে কোন মন্ত্রণালয় লুটবে, কোন দপ্তরে কে বসবে, কোন ব্যাংক কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, কোন প্রকল্পে কার অংশীদারিত্ব থাকবে এই নিয়ে দিনরাত দলাদলি, কাড়াকাড়ি, লবিং, ঘুষ, দুর্নীতি। জনগণের নিরাপত্তা কারও মাথাব্যথা নয়। পুলিশ আজ নাস্তানাবুদ। একদিকে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে না, আরেকদিকে পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই প্রাণের ভয়ে কাজ করছে না। ২০২৪ সালের জুলাই দাঙ্গার পর পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়েছে। সেই দুর্বলতাটুকু কাটিয়ে ওঠার কোনো চেষ্টা চোখে পড়ে না। বরং পুলিশ প্রশাসনের ভেতরেও দলীয়করণ, পদোন্নতিতে অনিয়ম, বদলির রাজনীতি চলছে পুরোদমে।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক এই পরিস্থিতিকে বলছেন, “এখন অনেকের হাতে হাতে অস্ত্র চলে গেছে। অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বাড়ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিবাদ কিংবা ক্ষমতার আধিপত্যের কারণে খুন ও সহিংসতা বাড়ছে।” তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। কিন্তু সরকার কি সেই অভিযান চালাচ্ছে? নাকি শুধু পরিসংখ্যান বানিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে?

সবশেষ রংপুরের ঘটনা। এক ধর্মীয় সংখ্যালঘু শিক্ষক পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হয়েছে বাসায় ঢুকে। চারজন। একসঙ্গে। নিজের বাসায়। এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মনে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তা কি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভয়? না, এই ভয় দীর্ঘদিনের জমে থাকা নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। মানুষ জানে, আজ যে পরিবারটি খুন হলো, কাল যে কোনো পরিবারের ভাগ্যেও তা ঘটতে পারে। কারণ রাস্তায় গুলি, বাসায় ঢুকে খুন, ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাত, মবের পিটুনি, মাদকাসক্তের তাণ্ডব, রাজনৈতিক ক্যাডারদের সন্ত্রাস সব মিলিয়ে মানুষ আজ নিজের ঘরেও নিরাপদ নয়।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি জামাত শাসনামলে দেশে যে অপরাধ পরিস্থিতি ছিল, তার চিত্র নতুন করে মনে করতে হচ্ছে নাগরিকদের। তখনও সন্ত্রাস, বোমাবাজি, চাঁদাবাজি, খুন, গুম, খুনের পর মরদেহ গায়েব করে দেওয়ার ঘটনা ছিল নিত্যদিনের। মানুষ সে সময়টাকে বলত অন্ধকার যুগ। সেই অন্ধকার যুগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে কি না, এই প্রশ্ন এখন সবখানে। সন্ত্রাসীরা ছাড়া পাচ্ছে, মামলা শিকেয় উঠছে, পুলিশ মামলা নিতে চায় না, সাক্ষীরা ভয়ে সরে দাঁড়াচ্ছে, বিচার হচ্ছে না। সব মিলিয়ে আইনের শাসন আজ কার্যত অকার্যকর।

প্রতিদিন ১০টি খুনের খবর পত্রিকায় আসে, টেলিভিশনে ভেসে ওঠে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর সব হারিয়ে যায়। কিন্তু প্রতিটি খুনের পেছনে একটি করে পরিবার থেকে যায়, যাদের কান্না কখনো থামে না। সেই কান্নার মূল্য কি কোনোদিন বোঝা হবে? নাকি ক্ষমতার পালাবদল, দলীয় স্বার্থ, দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের খেলার মাঠে এই কান্না নিতান্তই গৌণ?

আরো পড়ুন

সর্বশেষ