দেশের সাধারণ মানুষ যখন তীব্র লোডশেডিং আর রেকর্ড মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট, ঠিক তখনই তাদের পকেট কাটার নতুন আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। ‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’—প্রচলিত এই প্রবাদের মতোই গ্রাহকদের মানসম্মত বিদ্যুৎ দিতে ব্যর্থ হয়ে উল্টো আবারও দাম বাড়ানোর সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
আগামীকাল বুধবারই খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর নতুন ঘোষণা আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফের (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) শর্ত পূরণের অংশ হিসেবেই এই জনবিরোধী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই মাস আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত একটি মন্ত্রিসভা কমিটি ইউনিটপ্রতি ১ থেকে ১.৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সুপারিশ করে। সেই পথ ধরেই আগামীকাল সকাল ১১টায় বিইআরসির কারিগরি কমিটির বৈঠকে ইউনিটপ্রতি মূল্যবৃদ্ধির হার চূড়ান্ত করা হবে এবং বিকেলের দিকে নতুন ট্যারিফ ঘোষণা করা হতে পারে। নতুন এই বর্ধিত মূল্য গত ১ জুন থেকেই ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা হবে বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ২০ ও ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে বিপিডিবি ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। তবে বিইআরসির কারিগরি দল গড়ে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২৫ পয়সা মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ করেছে, যা কমিশন চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে।
বিদ্যুতের এই দফায় দফায় দাম বাড়ানোর তীব্র সমালোচনা করে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে চরম কষ্টে আছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়লে পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হবে।”
ফিরে আসছে তারেক রহমানের ‘খাম্বা যুগ’?
বিদ্যুৎ খাতের এই চরম নাজুক পরিস্থিতির জন্য দেশের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তারেক রহমানের অদক্ষতা এবং বিএনপির পুরোনো ‘খাম্বা সংস্কৃতি’কে দায়ী করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বিএনপি, অথচ বাসায় বিদ্যুৎ নাই, পামে তেল নাই, বাজারে সিন্ডিকেট।” অন্য এক ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “হোমিও ওষুধের মতো ফোঁটায় ফোঁটায় মিলছে বিদ্যুৎ।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘খাম্বা’। তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ‘ওয়ান গ্রুপ’ কোনো টেন্ডার ছাড়াই শত শত কোটি টাকার খুঁটি বা খাম্বা সরবরাহের কাজ পেয়েছিল। বিদ্যুৎ সংযোগ না দিয়ে মাইলের পর মাইল শুধু শূন্য খাম্বা পুঁতে রেখে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের সেই স্মৃতি আজও দেশবাসীর মনে তাজা। ২০০৬ সালে কানসাটে বিদ্যুতের দাবিতে রাজপথে নামা সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনা এবং এই খাম্বা কেলেঙ্কারিই ছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির ঐতিহাসিক ভরাডুবির অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমান সংকটের মুখে মন্ত্রীদের “লোডশেডিং সহ্য করা ভালো” সুলভ দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য শুনে জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন—দেশ কি তবে আবারও সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ‘খাম্বা যুগে’ ফিরে যাচ্ছে?
শহর থেকে গ্রামে হাহাকার, বিপর্যস্ত অর্থনীতি
এদিকে বিদ্যুতের অভাবে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন এখন নরকতুল্য। রাজশাহী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নাটোরে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বোরো চাষের সেচ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। সিলেট ও বরিশালের অনেক এলাকায় দিনরাতের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। ময়মনসিংহে বিদ্যুৎ সংকটে মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদন মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে, যা মৎস্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তীব্র গরমে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের নাভিশ্বাস উঠেছে। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর ভিড়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প যেমন—ওয়েল্ডিং শপ, অটো ব্রিকস এবং ফিড মিলগুলোর উৎপাদন হ্রাস পেয়ে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। জেনারেটর চালানোর মতো জ্বালানি (তেল/গ্যাস) সংকটের কারণে বিকল্প ব্যবস্থাও সচল রাখা যাচ্ছে না। এমনকি চার্জের অভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের দৈনিক আয় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ প্রতিবারের মতো এবারও দ্রুত ত্রুটি সারিয়ে স্বস্তির আশ্বাস দিলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। কয়লা ও গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দেশের বিশেষ করে পল্লী অঞ্চলের মানুষের এই ‘ভয়াবহ অন্ধকার’ ও লোডশেডিং থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর এই অন্ধকারের মধ্যেই জনগণের ওপর চাপানো হচ্ছে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা, যা ‘কিল মারার গোঁসাই’ প্রবাদটিকে আবারও সত্য প্রমাণিত করল।

