দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জননিরাপত্তার বর্তমান চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড এবং সহিংসতার ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতাবোধ তৈরি করছে। গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাত্র আটটি জেলাতেই গত কয়েক দিনে ৯ জন মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, সামাজিক ও পারিবারিক কলহ এবং প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসতা যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
জেলাভিত্তিক সহিংসতার চিত্র ও নির্মমতা
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে যাওয়া অপরাধের ধরণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, অপরাধীদের মধ্যে আইন বা প্রশাসনের কোনো ধরনের ভয় কাজ করছে না।
খুলনা (পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড): খুলনা মহানগরীর লবণচরায় কাজী রাশিদুল ইসলাম নামের এক যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত মার্চ মাসেও তাঁর বাড়িতে ঢুকে সন্ত্রাসীরা গুলি চালিয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূর্ববর্তী ঘটনার পর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো এই হত্যাকাণ্ড এড়ানো সম্ভব হতো।
চাঁদপুর (বর্বরোচিত আক্রমণ): হাইমচরে যৌথ মালিকানাধীন পুকুরের ঘাটলা নির্মাণকে কেন্দ্র করে ওমর ফারুক নামের এক যুবকের চোখেমুখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সামান্য সামাজিক দ্বন্দ্বে এমন নৃশংসতা চরম সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।
নেত্রকোনা (তুচ্ছ ঘটনায় সংঘর্ষ ও খুন): নেত্রকোনায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে সাউন্ড বক্সে গান বাজানো এবং ছবি তোলা নিয়ে সংঘর্ষে ফয়সাল আহমেদ নামের এক কলেজছাত্র নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, পৌর শহরেই মনোয়ারা বেগম নামের এক নারীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং তাঁর স্বামী-সন্তানকে জখম করা হয়েছে।
গণপিটুনি (আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা): চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট এবং মেহেরপুরের গাংনীতে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে দু’জন নিহত হয়েছেন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থার সংকটের কারণেই মানুষ এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।
গাজীপুর ও ময়মনসিংহ (জমি ও পারিবারিক বিরোধ): গাজীপুরের শ্রীপুরে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আজিজুল ইসলাম নামের এক রিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ময়মনসিংহের কোতোয়ালিতে জমি বিরোধের জেরেই ছোট ভাইয়ের লাঠির আঘাতে বড় ভাই আব্দুল বাছেদ খুন হয়েছেন।
নরসিংদী (কিশোরের রহস্যজনক মৃত্যু): নরসিংদীতে পুকুরপাড় থেকে ফাহিম মিয়া নামের এক কিশোর ইজিবাইকচালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, বরং দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এক ধরনের শিথিলতার বহিঃপ্রকাশ। যখন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় একই সময়ে একের পর এক খুনের খবর আসে—তাও আবার গণপিটুনি, প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা কিংবা পারিবারিক কলহের জেরে—তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অপরাধ দমনে প্রশাসনের যে ধরনের কঠোর ও দৃশ্যমান অবস্থান থাকা প্রয়োজন ছিল, তা মাঠপর্যায়ে অনুপস্থিত।
বর্তমানে সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছে যে, জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কতটা সফল? অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দ্রুত আইনি পদক্ষেপের অভাব সমাজকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত পার করতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিককে।

