দেশের প্রায় তিন কোটি খুচরা দোকানকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। আসন্ন ২০২৬-২৭ বাজেটে এই প্রস্তাব রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। শুনতে সংস্কারমূলক মনে হলেও ব্যাপারটা আসলে ততটা নিরীহ না, বিশেষত যখন এই সিদ্ধান্ত আসছে এমন একটি সরকারের হাত থেকে যাদের ক্ষমতায় আসার পথটাই ছিল বাঁকা।
ফেব্রুয়ারির ভোট মনে আছে তো? যেটাকে ভোট বলা যায় কি না সেটাই প্রশ্ন। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণ যে ভোটে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, সেই ভোটে জিতে ক্ষমতায় বসেছে বিএনপি। একটা দল যার জন্ম সেনানিবাসে, যার রাজনীতির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বন্দুকের নল আর পেশিশক্তির গল্প। সেই দলের মন্ত্রীরা এখন বসে বাজেট বানাচ্ছেন, আর সেই বাজেটের টার্গেটে পড়েছেন দেশের সবচেয়ে নিচুতলার মানুষগুলো, মানে মহল্লার মুদির দোকানদার, রাস্তার পাশের চায়ের স্টল, ছোট কাপড়ের দোকান।
প্রস্তাবটা হলো এই, ডিলার বা উৎপাদনকারী যখন খুচরা দোকানে মাল দেবে, তখনই বিলের উপর শূন্য দশমিক দুই শতাংশ কর কেটে রাখবে। প্রতি এক হাজার টাকার মালে দুই টাকা। শুনতে নগণ্য লাগছে, কিন্তু একটু ভাবুন। এই যে লোকটা সকালে উঠে টং দোকান খোলেন, দিনে হয়তো পাঁচ-দশ হাজার টাকার বেচাকেনা করেন, তার লাভের মার্জিন কত? দশ থেকে পনেরো শতাংশ হলেই সে খুশি। সেখানে এই কর তার কাছে “নামমাত্র” মনে হবে না।
আর আসলেই কি সমস্যা শুধু দুই টাকায়? সমস্যা হলো এই কাঠামোটা একবার বসলে পরে এটা বাড়বে। এনবিআর নিজেই বলছে এটা ভবিষ্যতে ভ্যাট নেটওয়ার্কে ঢোকানোর পথ তৈরি করবে। অর্থাৎ এটা শেষ না, শুরু। আজ শূন্য দশমিক দুই, কাল কত হবে সেটা এই সরকারের ট্র্যাক রেকর্ড দেখলেই বোঝা যায়।
এখন একটু দাঁড়িয়ে ভাবা দরকার, এই তিন কোটি দোকান আসলে কারা? এরা কোনো কর্পোরেট হাউসের শাখা না। এরা সেই মানুষ যারা পরিবার চালানোর জন্য একটা ছোট পুঁজি নিয়ে নেমেছেন। গ্রামের মাঝিপাড়ার মুদি দোকান, শহরের গলির মাথায় সবজির দোকান, রিকশার সামনে তেলেভাজার ডালা। এদের দিয়েই টিকে আছে বাংলাদেশের মানুষ। বড় মলে যেতে পারে না এমন কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন এই ছোট দোকানগুলোর উপর নির্ভরশীল।
এই মানুষগুলোকে কর দেওয়ার চাপে ফেললে কী হবে? সরবরাহকারী কর কেটে রাখবে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দোকানদার পণ্যের দাম একটু বাড়াবে, সেই বাড়তি দাম গিয়ে পড়বে ক্রেতার ঘাড়ে। মানে শেষ পর্যন্ত মার খাবে সেই সাধারণ মানুষ যে সকালে বাজারে যায়।
এখন প্রশ্ন হলো, সরকার কি এই টাকা তুলে মানুষকে ভালো সেবা দেবে? রাস্তাঘাট ঠিক হবে? হাসপাতালে ওষুধ থাকবে? সরকারি স্কুলে ভালো শিক্ষক আসবে? ইতিহাস বলে না। বিএনপির শাসনামলের যে ছবি মানুষের মনে আছে, সেটা দুর্নীতি, হাওয়া ভবন, চাঁদাবাজি আর সিস্টেমের ভেতর পর্যন্ত দলীয় লোক ঢোকানোর গল্প। সেই দলের এই সরকার এখন কর আদায়ে উৎসাহী হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেই করের টাকা কোথায় যাবে সেটা নিয়ে কোনো জবাবদিহিতার কথা নেই।
ভারতের মডেল থেকে নেওয়া হয়েছে বলে এনবিআর জানাচ্ছে। ভারতের কথা যখন বলছেন, তখন ভারতের সেবার কথাও বলুন। সেখানে জিএসটি নেটওয়ার্কে ব্যবসায়ীরা অনলাইনে রিটার্ন দেন, তাৎক্ষণিক রিফান্ড পান, ডিজিটাল সিস্টেম কাজ করে। আমাদের এনবিআর অফিসে গেলে কী পাওয়া যায় সেটা যে কোনো ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে। ইউরোপীয় মাত্রায় কর চাই, কিন্তু সেবার মান এখনো সেই একই।
জামায়াত-বিএনপির এই জোটের রাজনীতির পুরো ইতিহাস হলো উপর থেকে সুবিধা নেওয়া, নিচের দিকে চাপ দেওয়া। বড় ব্যবসায়ীরা, শিল্পপতিরা, ব্যাংক লুটেরারা কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যায়। কর ফাঁকির মামলা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। কিন্তু তিন কোটি ছোট দোকানদারের ঘাড়ে ট্যাক্স চাপানোর সিস্টেম তৈরিতে বেশ তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।
মোবাইলে এসএমএস আসবে, এ-চালান থাকবে, ডিজিটাল ডেটাবেস হবে। সব ভালো কথা। কিন্তু দেশের যে লক্ষাধিক ছোট ব্যবসায়ী এখনো স্মার্টফোন ঠিকমতো চালাতে পারেন না, যাদের কাছে অ্যাকাউন্টেন্ট রাখার সামর্থ্য নেই, তারা এই “ডিজিটাল” সিস্টেমের সাথে কীভাবে তাল মেলাবেন? সেই প্রশ্নের জবাব বাজেট প্রস্তাবে নেই।
রাজস্ব বাড়ানো দরকার, এটা সত্যি। কিন্তু যাদের কাছ থেকে বাড়ানো হচ্ছে এবং যেভাবে বাড়ানো হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। একটা অনির্বাচিত সরকার, যে ক্ষমতায় এসেছে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায়, সে যখন দেশের সবচেয়ে ছোট মানুষগুলোর উপর করের জাল বিছায়, তখন সেটা কেবল রাজস্বনীতির বিষয় থাকে না।

