সংখ্যাগুলো একটু মিলিয়ে দেখুন। এক বছরে একুশ বার অভিযান, ষোলোটা ড্রেজার, দুইটা এক্সকাভেটর, এগারোটা ট্রাক জব্দ, এক লাখ সাত হাজার ঘনফুট বালু ধ্বংস। এত বিশাল অভিযানের পরও গ্রেপ্তার হয়েছে মোটে ছয়জন। মানে এই লুটের নেপথ্যে থাকা মূল লোকজন গায়েই লাগেনি।
আর যিনি ঝিলতলীর বালু লুটের হোতা বলে চিহ্নিত, তিনি নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন ট্রাকের পর ট্রাক বালু তুলেছেন, তারপর একরকম চ্যালেঞ্জের সুরে বলেছেন এলাকায় শতাধিক লোক তোলে, সবাই অপরাধী হলে তিনিও অপরাধী। এই আত্মবিশ্বাস এমনি এমনি আসে না। এই লোকের পরিচয় করেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক। দলীয় পদ থাকা একজন মানুষ প্রকাশ্যে নিজের অপরাধ স্বীকার করছেন, অথচ তাকে ধরার মতো সাহস প্রশাসনের নেই, এটাই বলে দেয় ক্ষমতার সমীকরণটা কোথায় দাঁড়িয়ে!
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, বন বিভাগের লোকজনও এই চক্রের অংশ হয়ে গেছে বাধ্য হয়ে। করেরহাট রেঞ্জ অফিসের একজন কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন, কিছু বনকর্মীকে অভিযানের খবর আগেভাগে রাজনৈতিক প্রভাবশালী লুটেরাদের কাছে পৌঁছে দিতে হয়, ফলে হাতেনাতে ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
চেকপোস্ট দিয়ে প্রতিটা বালুর ট্রাক পার হতে গেলে একশ থেকে দুইশ টাকা ঘুষ লাগে বলে বনপ্রহরীরা জানাচ্ছেন, যদিও দায়িত্বরত কর্মকর্তা তা অস্বীকার করেছেন। প্রতি ট্রাক বালু চৌদ্দ থেকে ষোলো হাজার টাকায় বিক্রি হয়, আর সেই বালু যাচ্ছে মীরসরাই, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ডের নির্মাণকাজে। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাটাই একটা লাভজনক নেটওয়ার্ক, যার প্রতিটা স্তরে টাকার ভাগ যাচ্ছে, আর সেই নেটওয়ার্ক সচল রাখতে দরকার রাজনৈতিক ছাতা।
আঠারশো তিরানব্বই সাল থেকে সংরক্ষিত এই বন এত সহজে লুট হচ্ছে দেখে বোঝা যায়, আইন এখানে কাগজে আছে, মাঠে নেই। গ্রেপ্তার হওয়া মানুষ কয়েক দিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে একই কাজে ফিরে যান, এটা কোনো দুর্বল বিচারব্যবস্থার গল্প না, এটা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার গল্প। যে দল বন উজাড় করা নিজের ওয়ার্ড নেতাকে জবাবদিহি করাতে পারে না, তারা কীভাবে দেশ চালানোর জবাবদিহিতা দেবে, সেই প্রশ্নটা এখনই তোলা দরকার।

