বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যে প্রতিবেদনটা হাতে এসেছে, সেটা পড়লে প্রথমে মনে হবে ছাপার ভুল হয়েছে। কারণ অর্থনীতির সবচেয়ে মৌলিক যে সূত্রটা প্রথম বর্ষের ছাত্রকেও পড়ানো হয়, সেটা বলছে উৎপাদন কেন্দ্রে দাম কম থাকবে, ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বাড়বে। সেই হিসেবে গ্রামে উৎপাদিত ধান, ডাল, সবজি, মাছ, দুধের দাম গ্রামে কম থাকার কথা, শহরে বেশি। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নিজেরই হিসাব বলছে, গ্রামে মূল্যস্ফীতি শহরের চেয়ে বেশি। এটা কোনো ছাপার ভুল নয়। এটা একটা গোটা ব্যবস্থার ভেতরে স্থায়ী পঁচন ধরারই প্রমাণ, যেটা দেখার মতো কেউ নেই বলেই সেটা বেড়েই চলেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ, শহরে ৮ দশমিক ৭০। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে হিসাবটা আরও ভয়ংকর। গ্রামে ৯ দশমিক ৮৬, শহরে ৮ দশমিক ৪০। মানে পোশাক কিনতে, ওষুধ কিনতে, বাচ্চার পড়ার খরচ জোগাতে, যাতায়াতে গ্রামের মানুষ শহরের মানুষের চেয়ে দেড় শতাংশ বেশি হারে দাম দিচ্ছে। যে মানুষটার হাতে টাকা কম, তাকেই বেশি দাম গুনতে হচ্ছে। এটাকে বাজার অর্থনীতি বলে না, এটাকে বলে বাজার ব্যবস্থার নির্মম মশকরা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতেও সেই একই ছবি। শহরে ৮ দশমিক ২৪, গ্রামে ৮ দশমিক ৩৬। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে শহর ৮ দশমিক ৯০, গ্রাম ৯ দশমিক ৫৩। অথচ এই সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কেউ একবারও বলেননি যে কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে। বরং যে বিবিএস এই সংখ্যা তৈরি করছে, তাদেরই কর্মকর্তা বলছেন, কেন গ্রামে বেশি মূল্যস্ফীতি, সেই অনুসন্ধান তারা করেন না। এই স্বীকারোক্তিটাই সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলে দেয় যে রাষ্ট্রের তথ্য ব্যবস্থাপনার চরিত্রটা এখন কী রকম! সংখ্যা দেবে, কিন্তু সংখ্যার মানে খুঁজবে না। আগুনের তাপমাত্রা মাপবে, কিন্তু আগুন নেভানোর দায় নেবে না।
সেলিম রায়হান বলছেন, এই তথ্য অর্থনীতির প্রচলিত চিত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। গ্রামে তো উল্টো মূল্যস্ফীতি কম থাকার কথা, কারণ পণ্য সেখানে উৎপন্ন হয়, সেখানেই ভোগ হয়, অথচ এখন দেখা যাচ্ছে গ্রাম থেকে পণ্য হড়কে যাচ্ছে শহরে, আর গ্রামের মানুষকে শহরের দামের চেয়েও বেশি দাম দিয়ে সেই পণ্য কিনতে হচ্ছে। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যে গ্রামের মানুষ নিজের ঘরে ফলানো ফসল নিজের ঘরে বসে খেতে পারছে না, অথচ সেই ফসল শহরের শপিংমল আর রেস্তোরাঁয় আরামে পৌঁছে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্য কোনো প্রাকৃতিক নিয়মে ঘটছে না, ঘটছে নীতি আর বাজার ব্যবস্থার চাপে।
বিবিএসের যে কর্মকর্তা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেটা আরও বাজে। তিনি বলেছেন, সড়ক আর মোবাইল যোগাযোগ ভালো হওয়ায় গ্রামের পণ্য দ্রুত শহরে চলে যাচ্ছে, গ্রামে আর পণ্য থাকছে না, তাই সেখানে দাম বাড়ছে। এটা কোনো ব্যাখ্যা নয়, এটা অভিযোগের মতো শোনায়। অবকাঠামো ভালো হওয়া মানে তো হওয়ার কথা ছিল গ্রামের মানুষের বাজার সুবিধা বাড়বে, গ্রামের উৎপাদক তার ফসলের ভালো দাম পাবে, গ্রামের ভোক্তা কম দামে পণ্য পাবে। কিন্তু হচ্ছে তার উল্টো। সড়ক আর মোবাইল ব্যবহার করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা, আড়তদাররা, পাইকাররা। তারাই গ্রামের হাট থেকে কম দামে কিনে শহরে চালান করছে, আর গ্রামের ভোক্তাকে ফেলছে দরিদ্রের মতো উচ্চ দামের মুখে। অর্থাৎ যে পরিকাঠামো গ্রামের মানুষের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটা এখন শোষণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না তো কী?
গ্রাম আর শহরের আয়ের ব্যবধানের হিসাবটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২৩ বলছে, গ্রামীণ পরিবারের গড় আয় ২৬ হাজার ১৬৩ টাকা, আর ব্যয় ২৬ হাজার ৮৪২ টাকা। অর্থাৎ আয়ের চেয়ে খরচ ৬৭৯ টাকা বেশি। এই ঘাটতি পূরণ হয় কীভাবে? ঋণ করে, সঞ্চয় ভেঙে, খাবারের মান কমিয়ে, পুষ্টির সঙ্গে আপস করে। অথচ এই পরিবারগুলোর মোট ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি চলে যায় শুধু খাবারের পেছনে, ১৩ হাজার ১২৫ টাকা। বাকি টাকায় ভাড়া, ওষুধ, পোশাক, শিক্ষা, জ্বালানি সব সামলাতে হয়। এখন যদি খাদ্যবহির্ভূত জিনিসের দাম ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ হারে বাড়ে, তাহলে সেই পরিবার কী করবে? হয় খাবার কমাবে, নয়তো ওষুধ বন্ধ করবে, নয়তো ছেলেমেয়ের পড়া বন্ধ করবে। এই তিনটাই ঘটছে রোজ, অথচ ঢাকার ফাইভ স্টার হোটেলে বসে নীতি নির্ধারকরা ভাবছেন সব ঠিক আছে!
মজুরির হিসাবটা আরও কঠিন করে দিয়েছে পুরো ব্যাপারটা। কৃষি খাতে মজুরি বাড়ার হার কমছে। ২০২৪-২৫ সালে যেখানে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, ২০২৫-২৬ সালে সেখানে ৮ দশমিক ২১। শুধু এক শতাংশের ভগ্নাংশ নয়, এটা প্রবণতা। একইভাবে পশুপালনে ৮ দশমিক ৩৬ থেকে ৮ দশমিক ৩৫, মৎস্যে ৫ দশমিক ৭৬ থেকে ৫ দশমিক ৭৫। অথচ শহরকেন্দ্রিক শিল্পে মজুরি বাড়ছে, ৮ দশমিক ২৩ থেকে ৮ দশমিক ২৪। সেবা খাতে ৮ দশমিক ৩৪। মানে যে মানুষ দেশের খাদ্য উৎপাদন করছে, তার আয় বাড়ছে সবার চেয়ে ধীরে। আর সে যে পণ্য কিনছে, তার দাম বাড়ছে সবার চেয়ে দ্রুত। এই দুই ফ্রেম একসাথে রাখলেই বোঝা যায়, গ্রামীণ মানুষকে আসলে ইচ্ছা করেই পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা নীতি না হওয়ার ফল, নাকি নীতি থাকার ফল, সেটাই বড় প্রশ্ন।
যারা ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়টা মনে রেখেছেন, তারা জানেন অপশাসন কাকে বলে। তখনকার চিত্র ছিল হুবহু এরকমই। কৃষকের ফসলের দাম নিয়ে কারসাজি, সারের জন্য হাহাকার, বিদ্যুতের অভাবে সেচ বন্ধ, আর ঢাকায় বসে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা। আজ ২০২৬ সালে এসে সেই একই দৃশ্য ফিরে এসেছে কি না, সেই প্রশ্নটাই এখন গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। শুধু ঘোরে না, সন্দেহটা দানা বাঁধছে। কারণ যে রাজনৈতিক শক্তি তখন ক্ষমতায় ছিল, আজ আবার তারাই ক্ষমতার কেন্দ্রে। ইতিহাস কি তবে সত্যিই নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে? গ্রামের হাটে পণ্য নেই, গুদামে ধান নেই, গরুর খামারে খড়ের দাম আকাশছোঁয়া, আর সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি নাকি নিয়ন্ত্রণে। কার নিয়ন্ত্রণে? গরিবের কষ্ট নিয়ন্ত্রণে, নাকি বাজারের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে?
বিবিএস যে প্রক্রিয়ায় দাম সংগ্রহ করে, সেটা তাদের নিজস্ব দাবি অনুযায়ী “খুবই মজবুত”। ৭৪৯ ধরনের পণ্য আর সেবা, সব সিটি করপোরেশন, ৫৬ জেলা শহর, ৬৪ জেলার গ্রামীণ বাজার থেকে তথ্য আসে। এই তথ্য যদি বলে গ্রামে বেশি মূল্যস্ফীতি, তাহলে সেটা বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু বিশ্বাস করার পরের ধাপ কী? বিশ্লেষণ তো করতে হবে। সেই বিশ্লেষণ কে করবে? বিবিএস বলছে তারা করে না, কারণ ওটা তাদের কাজ না। সরকার বলছে ওদের কাজ আর্থিক নীতি। কিন্তু গ্রামের বাজার থেকে পণ্য হড়কে যাওয়া কি আর্থিক নীতির আওতায় পড়ে না? ভোক্তা অধিকার কি শুধু শহরের বাজারে অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকবে? গ্রামের আড়তদাররা যখন পণ্য গুদামে তুলে রাখে, তখন কি সেই বাজারে অভিযান চলে? এই প্রশ্নগুলো কেউ তুলছে না, কারণ তুললে জবাব দিতে হবে, আর জবাব দেওয়ার মুখ তো নেই!
এখনকার সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি হলো তথ্যের সহজলভ্যতাও। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, অনলাইন নিউজ, সোশ্যাল মিডিয়া, সবই আছে। গ্রামের মানুষ এখন আর অন্ধকারে নেই। তারা দেখতে পাচ্ছে তাদের উৎপাদিত ফসল কোথায় যাচ্ছে, কী দামে বিক্রি হচ্ছে, অথচ তাদের হাতে কী আসছে। এই সচেতনতাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ফাঁকা বুলি, শুধু পরিসংখ্যানের কারিকুরি আর টেলিভিশনে কথার ফুলঝুরি দিয়ে আর কাজ হচ্ছে না। মানুষ জানতে চাচ্ছে, কেন তাদের হাটে পণ্য নেই। কেন তাদের সন্তানকে ওষুধ কিনতে শহরে যেতে হয় বেশি দামে। কেন তাদের মজুরি বাড়ে না, কিন্তু ভাড়া, বিদ্যুৎ, সারের দাম বাড়ে প্রতি সপ্তাহে।
গ্রামীণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথাও বারবার শোনানো হয় ভাঙা ক্যাসেটের মতো। সেই কর্মসূচির চাল, ডাল, টাকা কতজন সত্যিকারের গরিবের হাতে পৌঁছায়, আর কতটুকু মাঝপথে হাওয়া হয়, তার কোনো নিরপেক্ষ হিসাব নেই। যে তালিকা তৈরি হয়, সেখানে প্রকৃত দুস্থ বাদ পড়েন, পক্ষপাতমূলক পছন্দের লোক ঢোকেন। এই অনিয়মের খবর প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ্য। কিন্তু শাস্তি কই? জবাবদিহি কই? একই অনিয়ম চলছে বাজারে, চলছে প্রকল্পে, চলছে বিতরণে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে দুই স্তরের সংকট তৈরি হচ্ছে, একদিকে আয় বাড়ছে না, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে, সেই দুই ফাঁসে পড়ে মানুষ দম বন্ধ অনুভব করছে।
সবশেষে ফিরে আসতে হয় সেই মূল প্রশ্নে। গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ার কারণ খুঁজতে হবে কি? নাকি কারণটা সবার সামনেই আছে, শুধু স্বীকার করার সাহস নেই? কারণটা হলো বাজার ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় হাটকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই। কোল্ড স্টোরেজ, গুদাম, পরিবহন সব মিলিয়ে একটা চক্র তৈরি হয়েছে যারা ইচ্ছা করলেই সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়াতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জায়গা থেকে সরকার বারবার পিছিয়ে গেছে, কারণ সেই চক্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগ ক্ষমতার বুননেই জড়িয়ে থাকে। এটা কোনো নতুন কথা না, কিন্তু এখন কষ্টটা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে।

