কারাগারের দেয়ালের ইটগুলোর কথা বলার ক্ষমতা নেই। কিন্তু এই নির্বাক ইটের আড়ালে প্রতিদিন যে নীরব গণহত্যা চলছে, তার হিসাব কি কেউ রাখে? গত দুই বছরে ২২৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে। শুধু সংখ্যাটা শুনলে বোঝা যায় না ভেতরের অবস্থা কতোটা খারাপ। এই মৃত্যুগুলো কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়, এগুলো রাষ্ট্রীয় অবহেলা আর পরিকল্পিত নিপীড়নের ফসল।
যে সরকার ২০২৪ সালে জুলাই দাঙ্গা বাঁধিয়ে, বিদেশী রাষ্ট্রের টাকায়, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় আর সামরিক বাহিনীর সমর্থনে নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলে দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল, সেই সুদী মহাজন ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অপশাসনের ছায়া এখনো প্রকট। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি আর ক্ষমতার ভাগ বসানো জামায়াত এখন দেশ চালাচ্ছে। কিন্তু কারাগারের ভেতরের চিত্র আগের চেয়েও ভয়াবহ।
আসুন, সংখ্যাগুলো একটু খোলসা করি।
কারা মহাপরিদর্শকের কার্যালয় বলছে, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৩৪২ জন বন্দি মারা গেছেন। এর আগের বছর মারা গিয়েছিল ২৩২ জন। অর্থাৎ পরিস্থিতি আগের চেয়েও ভয়াবহ। আর মৃত্যুর কারণ হিসেবে তারা যে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কথা বলছেন, সেটাই তো আসল প্রশ্নের জন্ম দেয়। সুস্থ মানুষ হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মারা যায় কী করে? চিকিৎসকরা বলবেন, তীব্র মানসিক চাপ, ডিপ্রেশন, ট্রমা থেকে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তাহলে কারাগারের ভেতরে বন্দিদের কী অবস্থা, সেটা সহজেই অনুমেয়।
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন বলছে, এই দুই বছরে মারা যাওয়া ২২৭ জনের মধ্যে ৪০ জনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। এরমধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনজন, ২০২৫ সালে ২২ জন আর ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত ১৫ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এটা কি কাকতালীয় হতে পারে? যে দলের সরকারকে ফেলে দিয়ে ক্ষমতা দখল করা হলো, সেই দলের নেতাকর্মীরাই কারাগারে সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছেন? অথচ দায়িত্বরতরা বলছেন, হৃদরোগ। কী সুবিধাজনক ব্যাখ্যা!
আইন ও শালিস কেন্দ্রের হিসাব আরও ভিন্ন কথা বলে। তারা বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৪ জন, ২০২৫ সালে ১০৭ জন আর ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৬১ জন কারাবন্দি মারা গেছেন। একই সময়ে গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে মারা গেছেন ২২ জন। অথচ কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাহলে এই মৃত্যুগুলো কীসের?
বগুড়া কারাগারে পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু বেশ কয়েক মাস আগে দেশ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তাদের অধিকাংশই মারা যান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের যুবলীগ নেতা মনিরের মৃত্যুর পেছনে অভিযোগ উঠেছে মানসিক নির্যাতনের। ১৭ মাস ধরে তিনি কারাগারে ছিলেন, মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন। ডজন খানেক মামলা দিয়ে তাঁকে জামিনে বেরোতে দেওয়া হয়নি। এক মামলায় জামিন পেলে আরেক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আটকে রাখা হতো। এটা কি বিচার বিভাগের ব্যবহার, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ছোবল?
এই যে কারা কর্তৃপক্ষ চিকিৎসক সংকটের কথা বলছেন, সেটা তো আর নতুন সমস্যা নয়। চিকিৎসক সংকট ছিল আগেও, কিন্তু এত মৃত্যু তো তখনো হতো না। তাহলে এখন হঠাৎ করে মৃত্যুর মিছিল কেন? কারণটা পরিষ্কার। যাদের আটক রাখা হচ্ছে, তাদের বাঁচিয়ে রাখার কোনো ইচ্ছাই নেই ক্ষমতাসীনদের। বরং নিরবে নিঃশব্দে তাদের নিঃশেষ করে দেওয়াই যেন লক্ষ্য।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন যা বলেছেন, সেটাই বাস্তবতা। হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না এবং কমানোর ব্যাপারে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। নেই কোনো জবাবদিহিতা, নেই কোনো বিচার। কারা কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি করে দেয়, সেটাও বছরের পর বছর ধরে ঝুলতে থাকে। মৃত্যুর পরিবারগুলো শুধু ছুটে বেড়ায় ন্যায়বিচারের আশায়।
যে বিএনপি আর জামায়াত এখন দেশ চালাচ্ছে, তারা কি এসব মৃত্যুর জন্য কোনো দায় নেবে? তারা তো ক্ষমতায় এসেছিল মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু তাদের শাসনামলে কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে, কমেনি। পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে মৃত্যু বন্ধ হয়নি। তাহলে তাদের গণতন্ত্রটা আসলে কার জন্য? শুধু কি নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য?
এমএসএফের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমানের কথাটা মনে রাখার মতো। তিনি বলেছেন, অনেক ঘটনাই প্রকাশ পায় না বা জানা যায় না। ফলে হেফাজতে মৃত্যুর যে সংখ্যা প্রকাশিত হয়, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও বেশি। এরমানে, আমরা যা জানতে পারছি, তা পুরো চিত্র নয়। কারাগারের ভেতরে আরও অনেক মৃত্যু ঘটছে, যা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। পরিবারের কান্না, মৃতের শেষ ইচ্ছা, বিচার পাওয়ার আকুতি কিছুই আর আলো দেখছে না।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? এককভাবে কারা কর্তৃপক্ষ? নাকি পুরো শাসকগোষ্ঠী? কারা কর্তৃপক্ষ শুধু আদেশ পালনকারী। আসল খেলা যারা খেলছেন, তারা ক্ষমতার মসনদে বসে আছেন। তাদের নির্দেশ ছাড়া কোনো বন্দির প্রতি এ ধরনের নৃশংসতা সম্ভব নয়। যারা নিজেদের গণতন্ত্রের মানসপুত্র দাবি করেন, তারাই আসলে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকছেন।
মৃতদের পরিবারের দিকে একবার তাঁকান। একজন মা তার ছেলের লাশ বুকে নিয়ে কাঁদছেন, যে ছেলেটি মারা গেছে তথাকথিত হৃদরোগে। অথচ ছেলেটি ছিল পুরোপুরি সুস্থ। কারা কর্তৃপক্ষ লাশ দিতে দেরি করে, ময়নাতদন্তের নামে আরও হয়রানি চলে। সব শেষে একটি কাগজ ধরিয়ে দেয়, যেখানে লেখা থাকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। এরপর? এরপর আর কিছু নেই। নীরবতা, শুধুই নীরবতা।
বাংলাদেশের কারাগারগুলোর এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজরে আসা উচিত ছিল অনেক আগেই। কিন্তু কারা যেন তাদের চোখ বন্ধ করে রেখেছে। বিদেশী শক্তিগুলো, যারা ২০২৪ সালের ক্যুকে সমর্থন দিয়েছিল, তারাও আজ নীরব। কারণ তারা জানে, এই সরকার তাদের পোষা কুকুরের মতোই অনুগত। সুতরাং মানবাধিকার লঙ্ঘন হলেও কিছু যায় আসে না।
এই যে বিদেশী রাষ্ট্রের টাকা আর ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় ক্ষমতা দখল করা হয়েছিল, তার সুফল এখন ভোগ করছে কারা? সাধারণ মানুষ নয়, বরং সেই বাতিল শক্তিগুলোই এখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক। অথচ দেশের মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, গণতন্ত্র রক্ষা করতে হবে। কী নির্মম পরিহাস!
মৃত ২২৭ জনের প্রতিটি মানুষই কারও না কারও প্রিয়জন ছিলেন। তারা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান ছিলেন, তারা ছিলেন বৃদ্ধ বাবার ভরসা, স্ত্রীর সংসার করার স্বপ্ন, সন্তানের বাবা হওয়ার গৌরব। আজ তারা সবাই ইতিহাসের খাতায় শুধু একটি সংখ্যা মাত্র। কিন্তু এই সংখ্যাগুলোই একদিন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জ্বলন্ত প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে।
মানবাধিকারকর্মীরা যখন বলেন, পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না, তখন সেটা শুধু একটি পর্যবেক্ষণ নয়, এটি একটি অভিযোগ। রাষ্ট্র যে তার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ, সেটার চরমতম প্রমাণ এই মৃত্যুগুলো। এবং এই ব্যর্থতার জন্য কেউ জবাবদিহি করছে না, সেটা আরও বড় অপরাধ।
কারাগারে বন্দি থাকা মানেই অপরাধী নয়, এবং অপরাধী হলেও তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অধিকার কারা কর্তৃপক্ষের নেই। আইনে আছে, প্রতিটি বন্দির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আইন এখন শুধুই কাগজের ফুল, সুবাসহীন, প্রাণহীন। যে সরকার আইনের চোখে সবাইকে সমান দেখার কথা বলে, সেই সরকারই আইনকে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষা করছে।

