জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রিপোর্ট বলছে আল-কায়দা বাংলাদেশে জাল বিস্তার করছে। ঢাকার মেট্রো স্টেশনে বোমা মিলছে, সাভারে প্রেসার কুকার বোমা নিষ্ক্রিয় করতে হচ্ছে, মাদারীপুরের একটা মহিলা মাদ্রাসায় বিস্ফোরণে চারজন মানুষ আহত হয়ে পড়ে আছেন। আর এসবের মধ্যে সরকার যা করল তা হলো রিপোর্টটাকে “অনুমানভিত্তিক” বলে খারিজ করে দেওয়া। প্রশ্নটা এখানেই শুরু, রাষ্ট্র সমস্যা লুকাতে ব্যস্ত নাকি সমাধান করতে?
আরও অস্বস্তিকর ঘটনা হলো, যে কারা মহাপরিদর্শক প্রকাশ্যে বলেছিলেন কারাগারের ভেতরের নিরাপত্তা কতটা নড়বড়ে, সরকারের অফিশিয়াল বয়ানের সঙ্গে যার কথা মিলল না, তাকে দ্রুত সরিয়ে সশস্ত্র বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হলো। সত্যি কথা বলার শাস্তি যদি বদলি হয়, তাহলে বাকিরা মুখ খুলবে কীসের ভরসায়। এই একটা সিদ্ধান্তই বলে দেয় স্বচ্ছতার চেয়ে ভাবমূর্তি রক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এখন।
অথচ দায় এড়ানোর জায়গা নেই কারো। ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের নামে যখন কারাগার ভাঙল, চিহ্নিত জঙ্গিরা বেরিয়ে গেল, তার হিসাব কে দেবে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হিযবুত তাহরীরের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রধান জসিম উদ্দিন রাহমানির মতো হাই প্রোফাইল জঙ্গি জামিনে বেরিয়ে গেলেন, যা আন্তর্জাতিক মহলের চোখ এড়ায়নি। আর এখন, বিএনপি-জামাত গং ক্ষমতা দখলের পরও একই প্যাটার্ন, বোমা মিলছে, নিরাপত্তা কর্মকর্তা সরানো হচ্ছে, রিপোর্ট অস্বীকার করা হচ্ছে। প্রশাসনের হাতবদল হলেও সংস্কৃতিটা বদলায়নি, লুকাও আর অস্বীকার করো।
মূল্যটা কিন্তু গুনতে হচ্ছে দেশের বাইরে বসে থাকা সাধারণ মানুষকে। ফিনল্যান্ড, সুইডেন, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসীরা এখন প্রতিদিন সহকর্মী কিংবা পরিচিতজনের প্রশ্নের মুখে পড়ছেন, তোমার দেশে আল-কায়দা ফিরছে নাকি। ছাত্ররা ভিসা রিফিউজালের নতুন এক ঢেউয়ের শঙ্কায় আছেন, শ্রমিকরা স্কিলড মাইগ্রেশনের সুযোগ হারানোর ভয়ে আছেন। রেমিট্যান্স যে অর্থনীতির অক্সিজেন, সেই অক্সিজেনেই টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে একটামাত্র রিপোর্টে। আর এই মূল্য শোধ করতে হচ্ছে তাদের, যাদের কোনো হাত নেই কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায়, কারও জামিনের কাগজে সইও নেই।
জামায়াতে ইসলামী এখন সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি, আর তাদের ইতিহাসও প্রশ্নের বাইরে না, উগ্রপন্থার সঙ্গে আদর্শিক নৈকট্যের অভিযোগ পুরনো এবং এখনও তাড়া করে ফেরে দলটাকে। বিরোধী আসনে বসেও সেই ছায়া থেকে বেরোতে তাদের বিশেষ কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি এখনও।
কিন্তু রাষ্ট্র চালানোর দায়িত্ব যাদের কাঁধে, প্রশ্নটা তাদের দিকেই বেশি ধেয়ে যায়। ক্ষমতায় বসে যদি এক বছরের মধ্যেই আগের ইউনুসের অ-সরকারের মতো একই কায়দায় সত্য আড়াল করার চেষ্টা দেখা যায়, তাহলে জনগণকে যে তথাকথিত পরিবর্তনের মিথ্যাচার করেছিলো সেটাই প্রমাণিত হয়ে যায়।
যতক্ষণ না রাষ্ট্র নিজেই মেনে নেবে সমস্যাটা বাস্তব, ততক্ষণ সমাধানের প্রথম ধাপটাই শুরু হবে না। আর সেই দেরির মাশুল প্রতিদিন গুনে যাচ্ছেন প্রবাসে থাকা লাখো বাংলাদেশি, নিজের দেশের নাম শুনলেই যাদের এখন প্রথমে মাথা নিচু হয়ে যায়।

