স্মৃতি কি এতই দুর্বল বাঙালির? ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামাত জোট দেশের ব্যাংকিং খাতকে লুটপাটের কারখানা বানিয়েছিল। প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির মহোৎসব হয়েছিল তৎকালীন জামাত-ঘনিষ্ঠ ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ঘিরে। জালিয়াতি করতে গিয়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকটা অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলেছিল।
সেই বিএনপি-জামাতই আজ ২০২৬ সালে এসে আপনার ব্যাংক হিসাবকে নতুন করে নিশানা বানালো। পার্থক্য একটাই, ২০০১ সালে লুট করেছিল ব্যাংকের ভল্ট। এবার সরাসরি লুটতে চায় আমানতকারীর পকেট। মাসে তিনবার টাকা তুললে ১০০-৩০০ টাকা ফি, নিষ্ক্রিয় হিসাব চালু করতে ৫০০ টাকা, ঋণ প্রক্রিয়াকরণ মাশুল চার গুণ। প্রযুক্তি ব্যয়ের নাম করে এমন নির্লজ্জ প্রস্তাব আর কোনো দল আনতে পারে না।
যুক্তি দিয়ে ভাবুন। ব্যাংকের প্রধান আয়ের উৎস কী? গ্রাহকের জমানো আমানত। ব্যাংক আপনার টাকা ফ্রি পেয়ে ব্যবসা করে, ঋণ দিয়ে সুদ খায়, ট্রেজারি বন্ডে লগ্নি করে। যে ব্যাংক আপনার টাকায় মাসের পর মাস মুনাফা করল, আপনি মাসে চারবার আপনার নিজের সেই টাকা ছুঁতে গেলেই কাফফারা দেবেন? এটা তো অতি ফাত্রা যুক্তি। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে সাধারণ মানুষ ব্যাংক বিমুখ হবে। বাস্তবতা হলো, ইচ্ছে করেই বিমুখ করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ নির্ধারিত হয় পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে। কিন্তু বিএনপি-জামাতের প্রস্তাবিত ফি কাঠামো কোনো অর্থনৈতিক মডেল ফলো করে না। মাসে তিনবার তোলার যে সীমা বেঁধে দেওয়া হলো, তা নিম্নবিত্ত আর নিম্ন-মধ্যবিত্তের লেনদেনের স্বাভাবিক গণ্ডির মধ্যেই পড়ে। একজন দিনমজুর, রিকশাচালক, নিম্ন বেতনের চাকরিজীবী মাসে বেতন তোলা, বাড়িভাড়া দেওয়া, সন্তানের স্কুলের ফি আর হঠাৎ অসুখের খরচা এই চার-পাঁচটা লেনদেন তো করবেই। এই মানুষটির কাছ থেকে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া মানে খাবারের থালা থেকে ভাগ বসানো।
এখন প্রশ্ন হলো, এই প্রস্তাব এলো কেন? কারণ বিএনপি-জামাতের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী আর ব্যাংক মালিকদের মুনাফা বাড়াতে হবে। সাধারণ আমানতকারীকে জর্জরিত করে সেই টাকা পাচার হবে পার্টির ভোটের ফান্ডে। ২০০১-০৬ মেয়াদে যেমন এনজিও আর ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আড়ালে জামাত বিপুল সম্পদ গড়েছিল, এবার সরাসরি ফি-এর মাধ্যমে সেই চক্র আবার সক্রিয় হলো।
অথচ এই একই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আজ আকাশছোঁয়া। বিএনপি-জামাতের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ঋণ আদায়ে ব্যাংক নীরব, অথচ আপনার একাউন্ট থেকে ফি কেটে নিতে ব্যস্ত। যেখানে খেলাপি ঋণের জন্য কোনো জরিমানা নেই, সেখানে আপনার বৈধ টাকা তোলায় ফি বসানো মানে অর্থনীতির মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে মশকরা করা।
এটাই বিএনপি-জামাতের আসল চেহারা। ক্ষমতায় বসলে ওরা প্রথমে সাধারণ মানুষের জীবনধারণকে দুঃসহ করে তোলে, তারপর আড়ালে লুটপাট চালায়। এই ফি বসানোর প্রস্তাব কোনো ছোট ঘটনা নয়, এটা ওদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের জানান মাত্র।

