সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক ক্লাসের বাইরে। দুই বছর ধরে বেতন নেই। আদালতের রায় আছে, মন্ত্রণালয়ের চিঠি আছে, কিন্তু স্কুলের গেট খুলছে না। এই অবস্থায় মাউশির মহাপরিচালক বলছেন, “আমরা তো লোকালদের ম্যানেজ করতে পারি না।” এই একটা বাক্যই বলে দেয় রাষ্ট্র আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
ধামরাইয়ের আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার একটা মরা স্কুলকে বাঁচিয়েছিলেন। উপজেলায় শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন। দুইবার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে জুলাই দাঙ্গার পর একদল লোক তার পদত্যাগ চাইল। পরিচালনা কমিটির সভাপতি মিরপুরের বাসায় ডেকে চাপ দিলেন। পদত্যাগ হয়ে গেল। এরপর বেতন বন্ধ, জমি বিক্রি, ধার। বয়স পঞ্চাশের বেশি, নতুন চাকরি নেই। এই মানুষটা বলছেন, কষ্টের কথা বলতে গেলে চোখের জল আসে, কিন্তু বলা হয় না। এই “বলা হয় না” কথাটার ভেতরে যে অসহায়ত্ব আছে, সেটা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না।
কুলাউড়ার আব্দুল কাদির বলছেন আওয়ামী লীগের আমলেও তার স্কুলে বিএনপির লোক সভাপতি ছিলেন। তারপরও তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কয়েকবার চিঠি দিয়েছে, কাজ হয়নি। আদালতে গেছেন, রায় পেয়েছেন। এখন দেখছেন রায় কাজে লাগে কিনা। ভিকারুননিসার কেকা রায় চৌধুরী মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পেয়েছেন ফেব্রুয়ারিতে, বর্তমান পর্ষদ সেই নির্দেশ মানেনি। দুই বছর বেতন নেই।
এখন বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায়। ফেব্রুয়ারি থেকে। চার মাস হয়ে গেছে। এই সাড়ে তিন হাজার শিক্ষকের বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেই। যারা মাঠে এই শিক্ষকদের ঢুকতে দিচ্ছে না, তারা এখনকার স্থানীয় ক্ষমতার ছায়াতেই বসে আছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা, নতুন পরিচালনা পর্ষদগুলো, স্থানীয় প্রভাবশালীরা, এরা সবাই জানে যে উপরে চাপ নেই। চাপ না থাকলে সরে যাওয়ার কারণ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো সত্তরজন শিক্ষক ক্লাস নিতে পারছেন না। তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন হয়েছিল, এক মাসের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল, হাতেগোনা কয়েকটা এসেছে। অধ্যাপক জিনাত হুদা বলছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩-এর অধ্যাদেশ মানা হয়নি, অপরাধ প্রমাণের আগে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, এবং যাদের সরানো হয়েছে তারা বিভাগের সবচেয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক। ফলে পাঠদান ভেঙে পড়ছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কত বছর লাগবে কেউ জানে না।
একটা জিনিস পরিষ্কার করা দরকার। ৫ আগস্টের পর যা হয়েছে সেটা শুধু “পরিবর্তনের উত্তাপ” বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ এখন আর নেই। প্রায় ছয় হাজার শিক্ষককে জোর করে সরানো হয়েছে। ছয়জন মারা গেছেন। চার শতাধিক অসুস্থ হয়েছেন। এর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সত্যিকারের হতে পারে, সেটা তদন্ত করে বিচার করার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু যাকে-তাকে মব দিয়ে তাড়ানো বিচার না, এটা প্রতিহিংসা। আর এই প্রতিহিংসার পরিবেশ তৈরিতে যারা ইন্ধন দিয়েছে, তারা এখন ক্ষমতার অংশ।
আড়াই হাজার শিক্ষক নানাভাবে ফিরতে পেরেছেন। বাকিদের জন্য রাস্তা এখনো বন্ধ। মন্ত্রণালয় চিঠি লেখে, মাউশি ফরোয়ার্ড করে, জেলা শিক্ষা অফিস ফাইল রাখে। এই চিঠির চেইনের শেষে একজন মানুষ বসে আছেন যার বেতন নেই, সংসার নেই, ভবিষ্যৎ নেই। তার জন্য এই আমলাতান্ত্রিক চিঠির খেলা কোনো সমাধান না।

