ঈদুল আজহার আগে থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এটিএম বুথে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কোথাও বুথে টাকা নেই, কোথাও মেশিন বিকল, আবার কোথাও অন্য ব্যাংকের কার্ড দিয়ে টাকাই তোলা যাচ্ছে না। একজন মানুষ আট থেকে দশটা বুথ ঘুরে শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এটা কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিপদ নয়, বরং দেড়-দুই বছর ধরে জমে ওঠা ব্যর্থতার একটা দৃশ্যমান ফল।
যে সরকার ফেব্রুয়ারিতে একটা পাতানো, তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছ থেকে ব্যাংক খাতে সংস্কারের প্রত্যাশা আসলে কতটুকু বাস্তবসম্মত ছিল সেটা এখন প্রশ্নের মুখে। বিএনপি এবং তাদের মন্ত্রিসভা এই মুহূর্তে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার দায়িত্বে আছে। কিন্তু ঈদের মতো একটা পূর্বানুমানযোগ্য পরিস্থিতিতেও যদি এটিএম বুথে টাকা না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির জায়গায় গলদ অনেক গভীরে।
প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আগে নগদ টাকার চাহিদা বাড়ে, এটা নতুন কিছু নয়। পশু কেনাবেচা থেকে শুরু করে ঈদ বোনাস, বাজার-সদাই, সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোকে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়। কিন্তু এবার ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে পরিমাণ নগদ চেয়েছিল, তার পুরোটা পায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাহিদামতো সরবরাহ দিতে পারেনি এবং সরকার এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কার্যকর কোনো উদ্যোগও নেয়নি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটা প্রযুক্তিগত বিপত্তি। নতুন গভর্নরের স্বাক্ষরযুক্ত নোট বাজারে ছাড়া হয়েছে, কিন্তু এটিএম মেশিনগুলোকে সেই নোট শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া হয়নি। ফলে মেশিন টাকা আটকে দিচ্ছে বা নোট শনাক্ত করতে পারছে না। এটা নিছক প্রযুক্তিগত ঝামেলা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই ধরনের পরিবর্তনের আগে সমন্বয় করার দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সেটা হয়নি, কারণ তদারকির জায়গাটা এখনও দুর্বল।
আসল সমস্যাটা আরও পুরোনো। দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম মিলিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সুদী মহাজন ইউনুসের আমল থেকেই, সেটা কোনো একটি সরকারের একার সৃষ্টি নয়। তবে যে দল এতদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে নিজেদের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, ক্ষমতায় আসার পর তাদের কাছ থেকে অন্তত একটা সক্রিয় সংস্কার প্রচেষ্টার প্রত্যাশা ছিল। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
বিএনপির মন্ত্রিসভা এখন যে পরিস্থিতিতে দেশ চালাচ্ছে, তাতে ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেই, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধারের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। ফলে সামান্য চাপেই পুরো সেবাব্যবস্থায় ফাটল দেখা দিচ্ছে। ঈদের আগে থেকেই এটিএমে টাকা না পাওয়া সেই ফাটলেরই একটা ছোট্ট কিন্তু বেদনাদায়ক প্রতিফলন।
যে মানুষটা আট-দশটা বুথ ঘুরে শেষ পর্যন্ত টাকা পাননি, তার কাছে এটা নিছক ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়। এটা রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের বিশ্বাসের সম্পর্কটা আরেকটু ক্ষয়ে যাওয়ার গল্প।

