হামে চার মাসে শিশু মৃত্যু ১১৮০: ওষুধ যায় ব্যাগে, শিশু যায় কবরে

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড এখন এক জীবন্ত অভিশাপের নাম। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসে ২৮৫টা পরিবার তাদের সন্তানকে হারিয়েছে এই হাসপাতালের বেডে শুইয়ে। এর মধ্যে শুধু মার্চ আর এপ্রিল, মাত্র দুই মাসে ১৬০টা শিশু মারা গেছে হাম, হাম উপসর্গ আর হাম পরবর্তী নিউমোনিয়ায়। প্রতিটা মৃত্যুর পেছনে একটা করে পরিবার ভেঙে গেছে, অথচ এই দেশের শাসকদের চোখের পাতাও নড়েনি।

তথ্য বলছে, এই মৃত্যুগুলো কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। এটা সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, পরিকল্পিত অবহেলা আর কাঠামোগত দুর্নীতির ফসল। ২০২৫ সালে যেখানে ৯২০টা শিশুমৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই সেই সংখ্যা ১১৮০ ছাড়িয়ে গেছে। প্রবণতা স্পষ্ট, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, আর দায়িত্বপ্রাপ্তরা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার বদলে ফাইলপত্রে স্বাক্ষর করে যাচ্ছেন নির্বিকার ভঙ্গিতে।

সবচেয়ে পৈশাচিক দিকটা হলো হাসপাতালের স্টোরে ওষুধ মজুদ থাকার দাবি সত্ত্বেও রোগীর স্বজনদের ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে বাইরের দোকান থেকে কিনতে হচ্ছে ওষুধ, স্যালাইন, ক্যানোলা, এমনকি অ্যান্টিবায়োটিকও। পিআইসিইউতে ভর্তি আহনাফের বাবা আহাদ উদ্দিন ছয় দিনে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করেছেন বাইরের ওষুধ কিনে। প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে তার, যে টাকা তার পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব। এই টাকাটা কেন খরচ করতে হচ্ছে? অথচ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান দাবি করছেন, স্টোরে পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ আছে। তাহলে ওষুধ কোথায় যাচ্ছে?

উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করলেই বেরিয়ে আসে ভয়াবহ সত্যিটা। হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে, স্টোর থেকে প্রতিদিন স্টাফরা হাতব্যাগে করে ওষুধ বের করে নিয়ে যাচ্ছেন। বের হওয়ার মুখে তাদের কোনো তল্লাশির ব্যবস্থা নেই। নেই কোনো সিসিটিভি নজরদারি। অভিযোগ সোজা, এই ওষুধ বাইরের দোকানে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে, আর যে দোকানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে, সেই দোকানগুলো থেকেই পরে রোগীর স্বজনরা বিপুল দামে কিনে আনছেন। এটা চুরি নয়, এটা সংঘবদ্ধ অপরাধ। এই অপরাধের সঙ্গে হাসপাতাল প্রশাসনের কারা জড়িত, তাদের নাম প্রকাশ্যে আসেনি আজ অবধি। প্রশ্ন জাগে, কেন আসেনি? কে বা কারা তাদের রক্ষা করছে?

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ যে সরকারের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি বিতর্কিত, অংশগ্রহণহীন, জনগণ কর্তৃক বয়কটকৃত তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার বৈধতা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন আছে, এই ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করছে মাত্র। জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন আর তার এই নামসর্বস্ব মন্ত্রিসভার কাছে ১৬০টা শিশুর মৃত্যু কি কোনো বিষয়ই নয়?

চিকিৎসকরা বলছেন, হাম পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে দ্বিগুণ সময় লাগছে। সাধারণ নিউমোনিয়ায় যেখানে ৫ থেকে ৭ দিনে রোগী সুস্থ হয়, সেখানে হাম পরবর্তী নিউমোনিয়ায় ১৪ দিন বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হচ্ছে। এসব রোগীর জন্য দরকার ৬০ লিটার বা তারও বেশি ক্ষমতার হাইফ্লো ন্যাজেল ক্যানোলা। অথচ পিআইসিইউতে ২০টি সিটের মধ্যে মাত্র ১৫টি বরাদ্দ আছে এই রোগীদের জন্য। বাকি ৫টি সিটে অন্যান্য রোগী রাখা হচ্ছে, ফলে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে।

নার্সরা বলছেন, তিন শিফটে মাত্র ১২ জন নার্স দিয়ে এই পুরো ওয়ার্ড সামলাতে হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ডাক্তাররাও পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছেন না ওয়ার্ডে। মূলত দিনের বেলায় জুনিয়র চিকিৎসকরা এসে চলে যান, আর রাতে রোগীরা নার্সদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকেন। হাম ওয়ার্ডে ভর্তি ৬৭ জন রোগীর জন্য আলাদা ডাক্তার নেই বললেই চলে, নিয়মিত রাউন্ড হয় না, রোগীদের নিয়মিত মনিটরিং হয় না। ফলে যে শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব, সেও অপূর্ণ চিকিৎসায় মারা যায়।

একটা বেডে তিনটা শিশু রাখার অর্থ কিন্তু সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা। যে শিশু নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি হলো, সে একই বেডে থাকা অন্য শিশুর কাছ থেকে নতুন ইনফেকশন পাচ্ছে। মায়েরা একে অপরের গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছেন, কোথাও কোনো ইনফেকশন কন্ট্রোল ব্যবস্থা নেই, অথচ এটাই চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালের শিশু বিভাগ।

প্রশ্ন সরাসরি, এই রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা কোথায়? যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবে বলে আগাম বিদেশে পাড়ি জমান, যারা জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তাদের কাছে ১৬০টা শিশুর মৃত্যু কতটুকু মূল্যবান? ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন শিশুমৃত্যুর এই মহামারি ঠেকাতে পুরোপুরি অক্ষম হয়েছে, তখন তার রাজনৈতিক দায় কেউ এড়াতে পারে না। এরপর বিএনপি ক্ষমতা দখলের পর তারেক রহমান যেভাবে দলীয় ফোরামে ভাষণ দিয়ে বেড়াচ্ছেন, তার কাছে জানতে চাওয়া উচিত, এই শিশুগুলোর মৃত্যুর দায় কে নেবে? যদি কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করা না হয়, যদি ওষুধ পাচারকারীদের গ্রেপ্তার না করা হয়, যদি দায়িত্বে অবহেলাকারী চিকিৎসক বা প্রশাসকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে এটা শুধু ব্যর্থতা নয়, এটা সরাসরি যোগসাজশ।

ওষুধ চুরি, শিশুমৃত্যু, দায়িত্বে অবহেলা আর তথাকথিত সরকারের নিষ্ক্রিয়তা একসুতোয় বাঁধা। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে ব্যর্থ, সে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার রাখে কিনা, সেই প্রশ্ন প্রতিটা মৃত শিশুর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হচ্ছে। ২৮৫টা পরিবারের কান্না কি শোনা যাচ্ছে সচিবালয়ের দালানে? শোনা যাচ্ছে কি ঢাকার ক্ষমতার অলিন্দে?

যে ওয়ার্ডে তিনটা শিশুকে গাদাগাদি করে এক বেডে রাখতে হয়, যে ওয়ার্ডে নার্স নেই, ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, অথচ বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে ত্রিশ হাজার টাকা খরচ করে, সেখানে একটাই সত্য উচ্চারিত হয়। এই রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের নয়। এই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের সন্তানদের চিকিৎসা করাতে বিদেশ যান, আর এদেশের কুষ্টিয়া, পেকুয়া, ফেনী, কুমিল্লার বাবা মায়েদের সন্তান মরছে হাম আর নিউমোনিয়ায় অক্সিজেনের অভাবে।

শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের সিংহভাগই আন্ডারওয়েট আর অপুষ্টির শিকার। রাষ্ট্রের পুষ্টিনীতির ব্যর্থতা, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি আর স্বাস্থ্যবাজেটের করুণ অবস্থা মিলে এই শিশুদের শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল করে দিয়েছে যে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগও তাদের কাছে মহামারি হয়ে উঠছে। হামের টিকা নিশ্চিত করা গেলে, পুষ্টিহীনতা দূর করা গেলে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা গেলে এই শিশুগুলোর অনেককেই বাঁচানো যেত। কিন্তু সেটা করার মতো সদিচ্ছা বা সক্ষমতা কোনোটাই এই সরকারের নেই।

২০২৬ সালের মে মাসে দাঁড়িয়ে যখন হাসপাতালে হাম আর নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান আকাশছোঁয়া, তখন সরকারের কোনো জবাবদিহি নেই। তারেক রহমানের প্রতি প্রশ্ন, এবং গোটা নামসর্বস্ব মন্ত্রিসভার প্রতি প্রশ্ন, এই শিশুগুলোর মৃত্যুর দায় কে নেবে? ডক্টর ইউনুসকে বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা যদি না করতে পারে বিএনপি, তাহলে বুঝতে বাকি থাকবে না যে, বিএনপির সাথে ইউনুসের সম্পর্ক শালা-দুলাভাইয়ের থেকেও ঘনিষ্ঠ!

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড এখন এক জীবন্ত অভিশাপের নাম। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসে ২৮৫টা পরিবার তাদের সন্তানকে হারিয়েছে এই হাসপাতালের বেডে শুইয়ে। এর মধ্যে শুধু মার্চ আর এপ্রিল, মাত্র দুই মাসে ১৬০টা শিশু মারা গেছে হাম, হাম উপসর্গ আর হাম পরবর্তী নিউমোনিয়ায়। প্রতিটা মৃত্যুর পেছনে একটা করে পরিবার ভেঙে গেছে, অথচ এই দেশের শাসকদের চোখের পাতাও নড়েনি।

তথ্য বলছে, এই মৃত্যুগুলো কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। এটা সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, পরিকল্পিত অবহেলা আর কাঠামোগত দুর্নীতির ফসল। ২০২৫ সালে যেখানে ৯২০টা শিশুমৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই সেই সংখ্যা ১১৮০ ছাড়িয়ে গেছে। প্রবণতা স্পষ্ট, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, আর দায়িত্বপ্রাপ্তরা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার বদলে ফাইলপত্রে স্বাক্ষর করে যাচ্ছেন নির্বিকার ভঙ্গিতে।

সবচেয়ে পৈশাচিক দিকটা হলো হাসপাতালের স্টোরে ওষুধ মজুদ থাকার দাবি সত্ত্বেও রোগীর স্বজনদের ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে বাইরের দোকান থেকে কিনতে হচ্ছে ওষুধ, স্যালাইন, ক্যানোলা, এমনকি অ্যান্টিবায়োটিকও। পিআইসিইউতে ভর্তি আহনাফের বাবা আহাদ উদ্দিন ছয় দিনে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করেছেন বাইরের ওষুধ কিনে। প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে তার, যে টাকা তার পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব। এই টাকাটা কেন খরচ করতে হচ্ছে? অথচ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান দাবি করছেন, স্টোরে পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ আছে। তাহলে ওষুধ কোথায় যাচ্ছে?

উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করলেই বেরিয়ে আসে ভয়াবহ সত্যিটা। হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে, স্টোর থেকে প্রতিদিন স্টাফরা হাতব্যাগে করে ওষুধ বের করে নিয়ে যাচ্ছেন। বের হওয়ার মুখে তাদের কোনো তল্লাশির ব্যবস্থা নেই। নেই কোনো সিসিটিভি নজরদারি। অভিযোগ সোজা, এই ওষুধ বাইরের দোকানে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে, আর যে দোকানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে, সেই দোকানগুলো থেকেই পরে রোগীর স্বজনরা বিপুল দামে কিনে আনছেন। এটা চুরি নয়, এটা সংঘবদ্ধ অপরাধ। এই অপরাধের সঙ্গে হাসপাতাল প্রশাসনের কারা জড়িত, তাদের নাম প্রকাশ্যে আসেনি আজ অবধি। প্রশ্ন জাগে, কেন আসেনি? কে বা কারা তাদের রক্ষা করছে?

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ যে সরকারের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি বিতর্কিত, অংশগ্রহণহীন, জনগণ কর্তৃক বয়কটকৃত তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার বৈধতা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন আছে, এই ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করছে মাত্র। জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন আর তার এই নামসর্বস্ব মন্ত্রিসভার কাছে ১৬০টা শিশুর মৃত্যু কি কোনো বিষয়ই নয়?

চিকিৎসকরা বলছেন, হাম পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে দ্বিগুণ সময় লাগছে। সাধারণ নিউমোনিয়ায় যেখানে ৫ থেকে ৭ দিনে রোগী সুস্থ হয়, সেখানে হাম পরবর্তী নিউমোনিয়ায় ১৪ দিন বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হচ্ছে। এসব রোগীর জন্য দরকার ৬০ লিটার বা তারও বেশি ক্ষমতার হাইফ্লো ন্যাজেল ক্যানোলা। অথচ পিআইসিইউতে ২০টি সিটের মধ্যে মাত্র ১৫টি বরাদ্দ আছে এই রোগীদের জন্য। বাকি ৫টি সিটে অন্যান্য রোগী রাখা হচ্ছে, ফলে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে।

নার্সরা বলছেন, তিন শিফটে মাত্র ১২ জন নার্স দিয়ে এই পুরো ওয়ার্ড সামলাতে হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ডাক্তাররাও পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছেন না ওয়ার্ডে। মূলত দিনের বেলায় জুনিয়র চিকিৎসকরা এসে চলে যান, আর রাতে রোগীরা নার্সদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকেন। হাম ওয়ার্ডে ভর্তি ৬৭ জন রোগীর জন্য আলাদা ডাক্তার নেই বললেই চলে, নিয়মিত রাউন্ড হয় না, রোগীদের নিয়মিত মনিটরিং হয় না। ফলে যে শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব, সেও অপূর্ণ চিকিৎসায় মারা যায়।

একটা বেডে তিনটা শিশু রাখার অর্থ কিন্তু সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা। যে শিশু নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি হলো, সে একই বেডে থাকা অন্য শিশুর কাছ থেকে নতুন ইনফেকশন পাচ্ছে। মায়েরা একে অপরের গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছেন, কোথাও কোনো ইনফেকশন কন্ট্রোল ব্যবস্থা নেই, অথচ এটাই চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালের শিশু বিভাগ।

প্রশ্ন সরাসরি, এই রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা কোথায়? যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবে বলে আগাম বিদেশে পাড়ি জমান, যারা জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তাদের কাছে ১৬০টা শিশুর মৃত্যু কতটুকু মূল্যবান? ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন শিশুমৃত্যুর এই মহামারি ঠেকাতে পুরোপুরি অক্ষম হয়েছে, তখন তার রাজনৈতিক দায় কেউ এড়াতে পারে না। এরপর বিএনপি ক্ষমতা দখলের পর তারেক রহমান যেভাবে দলীয় ফোরামে ভাষণ দিয়ে বেড়াচ্ছেন, তার কাছে জানতে চাওয়া উচিত, এই শিশুগুলোর মৃত্যুর দায় কে নেবে? যদি কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করা না হয়, যদি ওষুধ পাচারকারীদের গ্রেপ্তার না করা হয়, যদি দায়িত্বে অবহেলাকারী চিকিৎসক বা প্রশাসকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে এটা শুধু ব্যর্থতা নয়, এটা সরাসরি যোগসাজশ।

ওষুধ চুরি, শিশুমৃত্যু, দায়িত্বে অবহেলা আর তথাকথিত সরকারের নিষ্ক্রিয়তা একসুতোয় বাঁধা। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে ব্যর্থ, সে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার রাখে কিনা, সেই প্রশ্ন প্রতিটা মৃত শিশুর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হচ্ছে। ২৮৫টা পরিবারের কান্না কি শোনা যাচ্ছে সচিবালয়ের দালানে? শোনা যাচ্ছে কি ঢাকার ক্ষমতার অলিন্দে?

যে ওয়ার্ডে তিনটা শিশুকে গাদাগাদি করে এক বেডে রাখতে হয়, যে ওয়ার্ডে নার্স নেই, ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, অথচ বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে ত্রিশ হাজার টাকা খরচ করে, সেখানে একটাই সত্য উচ্চারিত হয়। এই রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের নয়। এই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের সন্তানদের চিকিৎসা করাতে বিদেশ যান, আর এদেশের কুষ্টিয়া, পেকুয়া, ফেনী, কুমিল্লার বাবা মায়েদের সন্তান মরছে হাম আর নিউমোনিয়ায় অক্সিজেনের অভাবে।

শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের সিংহভাগই আন্ডারওয়েট আর অপুষ্টির শিকার। রাষ্ট্রের পুষ্টিনীতির ব্যর্থতা, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি আর স্বাস্থ্যবাজেটের করুণ অবস্থা মিলে এই শিশুদের শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল করে দিয়েছে যে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগও তাদের কাছে মহামারি হয়ে উঠছে। হামের টিকা নিশ্চিত করা গেলে, পুষ্টিহীনতা দূর করা গেলে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা গেলে এই শিশুগুলোর অনেককেই বাঁচানো যেত। কিন্তু সেটা করার মতো সদিচ্ছা বা সক্ষমতা কোনোটাই এই সরকারের নেই।

২০২৬ সালের মে মাসে দাঁড়িয়ে যখন হাসপাতালে হাম আর নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান আকাশছোঁয়া, তখন সরকারের কোনো জবাবদিহি নেই। তারেক রহমানের প্রতি প্রশ্ন, এবং গোটা নামসর্বস্ব মন্ত্রিসভার প্রতি প্রশ্ন, এই শিশুগুলোর মৃত্যুর দায় কে নেবে? ডক্টর ইউনুসকে বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা যদি না করতে পারে বিএনপি, তাহলে বুঝতে বাকি থাকবে না যে, বিএনপির সাথে ইউনুসের সম্পর্ক শালা-দুলাভাইয়ের থেকেও ঘনিষ্ঠ!

আরো পড়ুন

সর্বশেষ