গভীর রাতে গোপালগঞ্জ থেকে ছুটে আসা এক বাবা। কোলে শ্বাসকষ্টে কাতর শিশু। আগারগাঁওয়ের শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে সেই বাবার চোখেমুখে অসহায়ত্ব। টিকিট কাটতে তিন ঘণ্টা। তারপর আবার লাইন। শিশুটি কাঁদছে, কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে রাত। এই দৃশ্য কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং ২০২৬ সালে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জুবায়ের রহমান নামে ওই অভিভাবক জানালেন, জরুরি বিভাগের সামনে বিশাল লাইন দেখে তিনি হতবাক হয়েছিলেন। তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটার পরও ভেতরে ঢুকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত দারোয়ানকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে তবে ঢোকা গেল। তার ভাষায়, “দারোয়ান যাকে চেনে বা যিনি টাকা দিতে পারেন, তাকেই আগে ঢুকতে দেয়।” এ যেন হাসপাতাল নয়, নিলামের বাজার।
মর্জিনা বেগম এসেছিলেন ঢাকার বাইরে থেকে। শ্বাসকষ্টে ভোগা নাতিকে নিয়ে সারা সকাল লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলেন বটে, কিন্তু শিশুটির কী হয়েছে সেটুকু জানার সৌভাগ্যও হয়নি তার। ভর্তির জন্য কাউন্টারে গিয়ে শুনলেন প্রায় চার হাজার টাকা লাগবে। বলা হলো দেড়টায় আসতে। দেড়টায় গেলে বলা হলো দুইটায়। দুইটায় গিয়ে শুনলেন তিনটার আগে নয়, সিট খালি নেই। সকাল থেকে কিছু খাননি মর্জিনা। নাতির অবস্থা খারাপ, অথচ ভর্তি হতে পারলে বাড়ি ফেরার পথটুকুও যে অনিশ্চিত, সেই দুশ্চিন্তায় পুড়ছিলেন তিনি।
এই হাসপাতালে সিট পাওয়া মানেই এক যুদ্ধ। অন্তত নাছির উদ্দীন আহমেদের ক্ষেত্রে সেটাই প্রমাণিত হলো। মেয়ে সোফাইয়াকে নিয়ে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বুধবার সকাল থেকে শিশুটির অবস্থার অবনতি হতে থাকে। আইসিইউ প্রয়োজন। নাছির উদ্দীনকে দেখা গেল কাউন্টারের সামনে উসখুস করছেন, আনসার সদস্যদের পা ধরে বলছেন সিট খুঁজে দিতে। তার আর্তি, “আইসিইউ লাগবে ভাই, আইসিইউ লাগবে। ভর্তি করতে এত কষ্ট করলাম, এখন আবার কষ্ট হচ্ছে আইসিইউ নিয়েও।”
হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। টাকার বিনিময়ে সিট পাইয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি যেন প্রকাশ্য রহস্য। টাঙ্গাইলের শিহাব মিয়া স্বীকার করলেন, পরিচিত লোক থাকায় তার মেয়ে সহজেই আইসিইউ পেয়েছে। কিন্তু যাদের কেউ নেই, তাদের ভাগ্যে জোটে কেবল অনির্দিষ্টকালের অপেক্ষা।
গোপালগঞ্জের রাশেদ খানের কথায় ধরা পড়ল পুরো চিত্রটা। তিনি বললেন, “ইমার্জেন্সিতে দাঁড়াতে হয় লাইনে। আবার দেখলাম, অনেকেই টাকা দিয়ে চলে যাচ্ছে ভেতরে। তখন মনে হয়, এখানের রোগীর চেয়ে টাকার মূল্য বেশি।” অসুস্থ সন্তানের কষ্ট, একজন পিতার আর্তি, সব যেন ম্লান হয়ে যায় টাকার ঝনঝনানির কাছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে শিশু কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অভিভাবকদের সারি দেখলে চোখে পানি চলে আসে। কোনো শিশু কাঁদছে, কোনো শিশু মায়ের কোল থেকে নেমে পালাতে চাইছে, আবার কোনো শিশু কাঁধে মাথা রেখে নির্জীব হয়ে পড়ে আছে। ভেতরে একজন চিকিৎসক আর চারজন নার্স হিমশিম খাচ্ছেন রোগীর ঢল সামলাতে। দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে চাপ আরও বেড়েছে আকাশছোঁয়া।
জনসংযোগ কর্মকর্তা বশির উদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কেন এই অব্যবস্থাপনা। তিনি কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। চিকিৎসকরাও কথা বলতে রাজি হননি। ফলে অভিযোগের পাহাড় জমলেও কর্তৃপক্ষের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না।
হাসপাতালের করিডোরে মেঝেতে শুয়েছিলেন জালাল উদ্দিন নামের এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে উঠে বসলেন। তার কণ্ঠে জমাটবাঁধা বেদনা, “আমরা এমন অবস্থায় আছি, যেখানে যত টাকা লাগে তাই দিচ্ছি। কারণ সন্তানকে তো বাঁচাতে হবে! সন্তান অসুস্থ, এই দুর্বলতারই সুযোগ নিচ্ছে সবাই।”
ঠিক এখানেই প্রশ্ন জাগে, ক্ষমতায় কারা? ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন স্বাস্থ্যখাতের চেহারা ছিল ঠিক এমনই। রোগীর চেয়ে দালালের দাম বেশি ছিল, সিট পেতে লাগত ঘুষ, অসহায় মানুষের কষ্ট ছিল নিত্যদিনের খবর। ২০২৬ সালে সেই একই দলের নেতৃত্বাধীন সরকার সেই একই চিত্র ফিরিয়ে এনেছে যেন পরিকল্পিতভাবেই।
একটি রাজনৈতিক দল যার জন্মই হয়েছে সেনানিবাসে, যার প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান স্বৈরশাসনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, সেই বিএনপি আজও জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসেনি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অংশগ্রহণহীন, জনগণের বয়কট করা, মঞ্চস্থ ভোটের মাধ্যমে তারা আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেছে। ফলাফল চোখের সামনে। হাসপাতালের করিডোরে শুয়ে থাকা বাবারা, অসুস্থ শিশু কোলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা মায়েরা, টাকার বিনিময়ে চিকিৎসা কেনার আর্তি জানানো অভিভাবকেরা তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
এখন ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস। ফিরে এসেছে সেই ২০০১-০৬ সালের বিভীষিকাময় দিনগুলো। তখন যেমন টাকা থাকলে চিকিৎসা, না থাকলে মৃত্যু ছিল নিয়তি, এখনও তেমনই। সেই দুঃসময় আবারও ফিরিয়ে এনেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। নামসর্বস্ব মন্ত্রীসভা নিশ্চুপ, দায়িত্বশীল কেউ মুখ খুলতে রাজি নন। অথচ এই মন্ত্রীরাই তো দেশ চালাচ্ছেন, জনগণের করের টাকায় বেতন নিচ্ছেন, বিদেশ ভ্রমণ করছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের সন্তান হাসপাতালের মেঝেতে কাতরাচ্ছে, তার কোনো জবাবদিহি নেই।
গণতন্ত্রের নামে ভোটারবিহীন ভোট, সংসদীয় ব্যবস্থার নামে দলীয় একনায়কত্ব, আর স্বাস্থ্যসেবার নামে মানবেতর বাণিজ্য। এই ত্রিমুখী বিপর্যয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এ দেশের সাধারণ মানুষ। যাদের কাছে সন্তানের নিঃশ্বাসই সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু সে নিঃশ্বাসের দামও ঠিক করে দিচ্ছে দালাল, দারোয়ান আর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা। আর এসবের পেছনে যে সরকারের অনুমোদন, যে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, তা যেন ছেয়ে আছে সারা দেশময়।

