বাংলাদেশের তৈরি পোশাকখাত এই মুহূর্তে যে সংকটের মধ্যে আছে, সেটা নিয়ে ভাবলেই যে কারো বুক ভারী হয়ে আসার কথা। আশুলিয়ার একটা কারখানায় দশ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। জেনারেটর চালাতে ডিজেল লাগবে, কিন্তু ডিজেল পেতে পাম্পে পাম্পে ঘুরতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাসের জ্বালানি খরচ পনেরো লাখ থেকে এক লাফে ত্রিশ লাখে উঠে গেছে। এর মধ্যে তুলার দাম বেড়েছে, পরিবহন খরচ বেড়েছে, বিদেশি বায়াররা বাড়তি দাম দিতে রাজি নয়। বিজিএমইএ বলছে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে পঁচিশ থেকে ত্রিশ শতাংশ কমে গেছে। গত মার্চে রপ্তানি কমেছে গত বছরের একই মাসের চেয়ে উনিশ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে দেশ চালাচ্ছে যে সরকার, তাদের কার্যকলাপ দেখলে বোঝা দুষ্কর যে তারা আসলে এই সংকট সমাধান করতে চায় কিনা, নাকি সংকটটাকে বাঁচিয়ে রেখে সুবিধা নেওয়াটাই তাদের কাজ।
এই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো সেই নির্বাচনে ছিল না। সাধারণ মানুষ ভোট দিতে যায়নি। কিন্তু সেই নির্বাচনের মাধ্যমেই বিএনপি এখন ক্ষমতায়। একটা দল যেটার জন্ম হয়েছিল সেনানিবাসে, যেটা গড়ে উঠেছে দুর্নীতি আর সন্ত্রাসকে আঁকড়ে ধরে, সেই দলের নামসর্বস্ব মন্ত্রিসভা এখন কোটি মানুষের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের কথা বলতে গেলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ফুয়েল ক্রাইসিস তাৎক্ষণিকভাবেই সমাধান করে দেওয়া হয়েছে। এই কথাটা পড়ে হাসবেন না কাঁদবেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। যে সংকটে হাজারো কারখানার উৎপাদন ত্রিশ শতাংশ কমে গেছে, রপ্তানি উনিশ শতাংশ পড়ে গেছে, শ্রমিকদের বেতন দেওয়া নিয়ে মালিকরা দুশ্চিন্তায় আছেন, সেই সংকট “তাৎক্ষণিকভাবে” সমাধান হয়ে গেছে? এই দাবি করতে একটুও লজ্জা লাগে না?
ফুয়েল কার্ড দেওয়া হচ্ছে, এক হাজার কারখানা আবেদন করেছে, বিপিসির সঙ্গে ট্যাগ করে দেওয়া হয়েছে। এগুলো শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু বাস্তবতা হলো এই সংকটের শিকড় অনেক গভীরে। ডলার সংকট, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের হাল, তেল-গ্যাস-কয়লা আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরের শেষ প্রান্তিকে সত্যিই চালু হবে কিনা, এই প্রশ্নগুলোর কোনো সৎ জবাব সরকারের কাছে নেই।
বরং যা দেখা যাচ্ছে তা হলো, সমস্যার মূলে না গিয়ে লোক দেখানো কিছু পদক্ষেপ নিয়ে বাহবা নেওয়ার চেষ্টা। আর এটাই বিএনপির চিরকালের রাজনীতি। সমস্যা তৈরি করো, অথবা সমস্যাকে আরও জটিল করো, তারপর সেই সমস্যারই অর্ধেক সমাধান করে ত্রাণকর্তা সাজো।
পোশাকখাতের ব্যবসায়ীরা সরাসরি বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে বিদেশি বায়াররা বিকল্প বাজারের দিকে সরে যাবে। বাংলাদেশ এখন পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয়। এই অবস্থানটা রাতারাতি তৈরি হয়নি, লাখো শ্রমিকের ঘাম আর পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে। একটা অযোগ্য, জনবিচ্ছিন্ন সরকারের ব্যর্থতায় সেই অর্জন মাটিতে মিশে যেতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়তি শুল্কের চাপ আগে থেকেই ছিল, তার ওপর এই জ্বালানি সংকট এসে পড়েছে। টানা আট মাস ধরে রপ্তানি কমছে। এই সময়টায় দরকার ছিল একটা সরকার যেটা সত্যিকার অর্থে কাজ করতে জানে, কূটনৈতিক দরকষাকষিতে পারদর্শী, এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। বিএনপি সরকার সেই মানদণ্ডের ধারেকাছেও নেই।
একটা দল যেটার বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ, যেটা জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই ক্ষমতায় এসেছে, সেই দলের কাছে লাখো শ্রমিকের ভবিষ্যৎ জিম্মি হয়ে আছে। এটাই বোধহয় এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট।

