প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হেলিকপ্টারে করে দিল্লির পথে পাঠানোর কয়েক ঘণ্টা আগেও সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন—পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর আগেই ক্ষমতার পালাবদলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাতে সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাদের এক টেলিকনফারেন্সে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ‘পরোক্ষ অভ্যুত্থানের’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খাকি পোশাকধারীদের ওই গোপন বৈঠকের তথ্য দুইটি সূত্র নর্থইস্ট নিউজকে নিশ্চিত করেছে। ওই বৈঠকে প্রধান প্রভাবক ছিলেন নৌবাহিনী প্রধান মোহাম্মদ নাজমুল হাসান।
ততক্ষণে সরকারের সামনে কার্যত কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক ঝামেলায় পড়ে যায়, একই রাতে সেনাপ্রধান শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে আশ্বস্ত করে যাচ্ছিলেন যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদে নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ধানমন্ডির একটি সেফ হাউজে চাপ প্রয়োগের সময় তিনি বমি করেন এবং অন্তত একবার জ্ঞান হারান বলে জানা যায়।
সোহায়েল যিনি আগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ছিলেন, ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট বনানী থেকে গ্রেপ্তার হন এবং বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তারের ১৩ দিন আগে তাকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরিয়ে নৌ-প্রশিক্ষণ ও ডকট্রিন অধিদপ্তরের কমান্ডার করা হয়েছিল। এর আগে তিনি র্যাব-এর মিডিয়া উইংয়ের প্রধান এবং পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তার গ্রেপ্তার ও বরখাস্তে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া এবং বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান। বিশেষ করে নৌবাহিনী প্রধান মোহাম্মদ নাজমুল হাসানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সোহেল তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন।
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সোহায়েল কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয় যে তিনি সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকিকে সমুদ্রপথে দেশত্যাগে সহায়তা করেছেন। পরবর্তীতে তাকে শেখ হাসিনা, তারিক সিদ্দিকি এবং জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় রাষ্ট্রীয় সাক্ষী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে কথিত ‘সিরিয়াল কিলিং’-এর প্রমাণ দিতে পারলে সোহায়েলকে পরিবারসহ বিদেশে নিরাপদে স্থানান্তরের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
জুলাই-আগস্টের অস্থিরতার সময় সোহায়েল নিয়মিত বার্তায় দাবি করেন যে সেনাবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্র, সরকার, পুলিশ, বেসামরিক প্রশাসন ও বিচার বিভাগ রক্ষায় দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছে। তার মতে, এই নিষ্ক্রিয়তা ছিল নীতিনির্ধারিত।
এদিকে সামরিক নেতৃত্বের মধ্যেও সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। সামরিক সচিব মেজর জেনারেল (অব.) কবির আহমেদ সমন্বয়ে অনিচ্ছুক ছিলেন। প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান শামীম দায়িত্ব পালনে দুর্বল ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চিফ অব জেনারেল স্টাফ সাইফুল আলম ও কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল মুজিবুল হকের সঙ্গে সেনাপ্রধানের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
২০০৪ সাল থেকে শেখ হাসিনার নিরাপত্তায় থাকা মেজর (অব.) শোয়েব ও মেজর (অব.) মামুনকে ২০২১ সালে সরিয়ে দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে। অস্থিরতার সময় জাতীয় সংসদ, গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো অরক্ষিত রাখা হয়। উচ্ছৃঙ্খল জনতা এসব স্থাপনায় লুটপাট চালায়। সেনা সদস্যদের উপস্থিতিতেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে ভাঙচুর হয়।
সেনাবাহিনী সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হয়। যদিও তাদের ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তারা পদত্যাগে বাধ্য হন। সারাদেশে প্রায় ৪০০টি পুলিশ স্টেশনে হামলা চালানো হয়, যেখানে নিরস্ত্র পুলিশ সদস্যরা আক্রান্ত হন। সব স্টেশন থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়, যা এখনো উদ্ধার হয়নি।
কেন্দ্রীয় সার্ভারে ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ বিভাগীয় তদন্তে বাধার মুখে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল পুলিশ বাহিনীকে দুর্বল করার একটি পরিকল্পিত কৌশল।
১৬ জুলাই থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকলেও তাদের শিথিলতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক ও মেজর জেনারেল জোবায়েরের বিরুদ্ধে সঠিক গোয়েন্দা তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা কোটা আন্দোলনকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ দেয়। এতে অন্তত ৪৩ জন নিহত হন। সরকার ও প্রশাসন পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং জনরোষ তীব্র হয়।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তোলা ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ছেন। এসব হামলাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারা হামলাকারীদের শনাক্তে আগ্রহ দেখায়নি। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন এবং বিভিন্ন মামলায় সাক্ষ্য দিচ্ছেন।
ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পেলেও স্নাইপার অস্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক পরিসরে পুলিশের হত্যার বিচার না হওয়ার বক্তব্য নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। জামায়াতে ইসলামী ঘটনাগুলোকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০১-২০০৬ মেয়াদের মতোই বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার মতো ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।
২০২৪ সালের এই অস্থিরতা শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরের গভীর সংকটের প্রতিফলন। ‘নীরব অভ্যুত্থান’, প্রশাসনিক ভাঙন, নিরাপত্তা দুর্বলতা এবং তদন্তহীন সহিংসতা—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক জটিল অধ্যায় হিসেবে রয়ে যাবে।

