বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ‘শক্তিশালী’ করার নামে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ২৯ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তদন্তে শুরু হয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের চারজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি জাতীয় দৈনিকের বিরুদ্ধে এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে সরকারি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এই উপদেষ্টারা হলেন-আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মাহফুজ আলম, রেজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খান। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন একটি সার্বভৌম দেশের রাজনীতি নিয়ে এমন সুনির্দিষ্ট আর্থিক অভিযোগ তোলেন, তখন তা খতিয়ে দেখা কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ২৯ মিলিয়ন ডলার এমন একটি সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে যার নাম আগে কেউ শোনেনি। মাত্র দুজন ব্যক্তি পরিচালিত সেই অখ্যাত সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে এই বিশাল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়। সে সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এনজিও-ঘনিষ্ঠ সরকার ক্ষমতায় থাকলেও তারা এই অভিযোগের কোনো স্বাধীন তদন্ত করেনি। উল্টো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তড়িঘড়ি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অভিযোগটি অস্বীকার করা হয়েছিল, যা এখনকার তদন্তকারীদের ভাষায় ছিল ‘দুর্নীতি আড়ালের অপচেষ্টা’।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত চার উপদেষ্টার মধ্যে তিনজন পুরুষ এবং একজন নারী। তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি এনজিওর মাধ্যমে অনুদান গ্রহণের আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, অভিযুক্ত এক উপদেষ্টার ছেলে গত আড়াই বছরে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। বাবার প্রভাব খাটিয়ে তিনি চট্টগ্রাম বন্দর এবং বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে রহস্যময় লেনদেন এবং চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্তেও তার সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্ত ওই উপদেষ্টা কড়া নজরদারিতে আছেন এবং যেকোনো সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তার বিরুদ্ধে অতীতে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকারের সময় বিএনপি-বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকারও অভিযোগ রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে এই চার উপদেষ্টা বর্তমানে ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ ও ‘গণভোটের রায়’ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে সক্রিয় রয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারা মূলত নিজেদের দুর্নীতি আড়াল করতে এবং তারেক রহমান সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। বর্তমানে তারা সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ‘মুখপাত্র’ হিসেবে কাজ করছেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে দেশের প্রথম সারির দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার নাম উঠে আসায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই পত্রিকা দুটি ড. ইউনূসের সরকারের সময়কার অনিয়ম নিয়ে নীরব ছিল, কিন্তু বর্তমান সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই নেতিবাচক ও সন্দেহজনক সাংবাদিকতায় লিপ্ত হয়েছে। গণমাধ্যম হয়েও যদি তারা আর্থিক লেনদেনে জড়িত থাকে, তবে তা সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংবাদমাধ্যমগুলো হলো প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার।
শিগগিরই এই আর্থিক কেলেঙ্কারির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আভাস পাওয়া গেছে।

