ইতিহাসের এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়ে রিজভী সাহেব একবার বিএনপির পল্টনের কার্যালয়ে দুটি কেঁচিগেটের মধ্যস্থলে এক যাতা খেয়ে এমনভাবে আটকে গিয়েছিলেন, যে না বেরোবার উপায়, না ঢোকার পথ। সেই থেকে রাজনীতির পাড়ায় তার নামটাই হয়ে যায়, “কেঁচিগেট রিজভী”। কে যেন বলে ফেলেছিল, “যাতা তো খেয়েছেন, কিন্তু হজম করতে পারেননি, কালক্রমে সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে সমস্যা!”
তারপর থেকে তার মধ্যে আরও কিছু আশীর্বাদস্বরূপ গুণের আবির্ভাব ঘটে। মাঝেমধ্যে স্মৃতিভ্রাট, যেমন হঠাৎ মনে পড়ে না তিনি কোন দলে আছেন, কোন কথা বলেছিলেন, বা আদৌ বলেছিলেন কি না। আর কথায় কথায় মিথ্যা বলার প্রবণতা, সেটা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, সত্য বললে অনেকে ভেবে বসেন বুঝি তিনি বোধহয় আজকে অসুস্থ!
আর যাতা খাওয়ার ঘটনাটা যখনই তোলা হয়, তিনি তখনই বলেন, “সেটা তো ভুল তথ্য, আমি কখনো যাতা খাইনি আমি শুধু কেঁচিগেটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম।” কেউ কেউ বলেন, “স্যার, আপনি তো আটকেই ছিলেন।” জবাবে তিনি বলেন, “আটকানো আর থাকা এক জিনিস না, এটা আপনি বুঝবেন না।”
এইভাবে রাজনীতির পাড়ায় “কেঁচিগেট রিজভী” নামটা এখন আর শুধু নাম নয়, এটা একটা প্রবাদ, একটা রূপক, আর একটা অলৌকিক চিপা খাওয়ার গল্প, যেখানে যাতা, কেঁচিগেট, আর স্মৃতিভ্রাট মিলে এক অদ্ভুত ত্রিভুজ তৈরি করেছে, যার এক বাহুতে অনর্গল মিথ্যাচার, এক বাহুতে উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে ভুলে যাওয়া, আর তৃতীয় বাহু সেই বিখ্যাত যাতা খাওয়ার ট্রমা, যা থেকে আজও তিনি বেরোতে পারেননি।
তাই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাহেব যখন বানী দেন যে, ❝এখন আর নুসরাতরা খুন হয় না, রুপারা খুন হয় না, খাদিজা তনু মিতুরা আর নির্যাতনের শিকার হয় না, আর সরকারি দল বিএনপির কোনো নেতাকর্মী এসবের সাথে জড়িত নয়❞, তখন আসলে তিনি একটা জুয়া খেলছেন, এই ধরে নিয়ে যে মানুষ ভুলে গেছে বা খবর রাখে না। কিন্তু খবর তো আছেই, আর সেই খবরগুলো তাঁর নিজের দলের অফিস থেকেই বেরোচ্ছে, বহিষ্কারের নোটিশ আকারে। এমন ডাহা মিথ্যা কথাগুলো তিনি বলেছেন মহিলা দলের নেত্রীদের সামনে দাঁড়িয়ে, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে, একেবারে সরকারি সাফল্যের সনদ হিসেবে। সমস্যা হলো, এই বাক্যটা বাস্তবতার সাথে মেলে না, আর সেই না মেলার তালিকাটা দিন দিন লম্বা হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির বারো তারিখে এক পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে বিএনপি, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার গরম করে বসে আছেন। তারপর থেকে সাত মাসে দলের নেতাকর্মীদের নামে যা ঘটেছে, তা রিজভীর ভাষণের ঠিক উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আছে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে স্বামীর নামে বিচার চাইতে যাওয়া এক গৃহবধূ স্থানীয় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরের কাছে ধর্ষণের শিকার হন। রংপুরের মিঠাপুকুরে ফ্যামিলি কার্ডের লোভ দেখিয়ে এক নারীকে ধর্ষণচেষ্টা করেন বিএনপি নেতা এনামুল হক। টাঙ্গাইলের গোপালপুরে যুবদল নেতা দুলাল উদ্দিন ওরফে রাবন এক তরুণীকে ধর্ষণ করেন, আর সেই দৃশ্য ভিডিও করে ছাত্রদল নেতা রোমান আহম্মেদ।
পাবনার আতাইকুলায় সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে যুবদল নেতা আবুল কাশেমকে গ্রেপ্তার করে দল থেকে বহিষ্কার করতে হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে যুবদল নেতা শহীদসহ দুজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মহন তালুকদার দশ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে অন্তঃসত্ত্বা করেন, শিশুটিকে ধর্ষণের কথা জানালে খুনের হুমকিও দেওয়া হয় বলে মামলার এজাহারে লেখা। পুলিশ প্রথমে গ্রেপ্তার করেনি, খবর ছড়ানোর পর দল তাকে বহিষ্কার করে। চাঁদপুরের মতলব উত্তরে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে অন্তঃসত্ত্বা করায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা কাইয়ুম গ্রেপ্তার হয়েছেন।
জুলাইয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণে ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা এক নারীকে ধর্ষণ করে বিএনপি কর্মী খোকন, ভিডিও ফুটেজ ধরে তাকে শনাক্ত করা হয়। আগস্টে এক কলেজছাত্রী ধর্ষণ দায়ে এক ছাত্রদল নেতাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ছাব্বিশ আগস্ট যুবদলের তিন নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি শিমুল ফিটারের বিরুদ্ধে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করেন।
সাতাশ আগস্ট নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় পৌর বিএনপির সহ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বকুলের নেতৃত্বে দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে দীর্ঘদিন ভয়ভীতি দেখিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ, ভিডিও ধারণ ও পর্নোগ্রাফির প্রমাণ মেলে, মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। একত্রিশ আগস্ট কক্সবাজারের খুরুশকুলে ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিকান্দার আলীর বিরুদ্ধে পারিবারিক বিরোধ মেটানোর কথা বলে এক নারীকে হোটেলে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার করেন। আর এই সপ্তাহেই, সাত আট সেপ্টেম্বর, স্বেচ্ছাসেবক দলের এক ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক ইসমাইলের বিরুদ্ধে পারিবারিক বিরোধ মেটানোর প্রলোভনে এক কিশোরীকে ধর্ষণের দায়ে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। লক্ষ্মীপুরে যুবদল নেতা আল আমিন ছৈয়ালের বিরুদ্ধে প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে।
এমএসএফের হিসাবে এপ্রিলে দেশে নারী শিশু নির্যাতনের তিনশো বিশটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়, মে মাসে দুইশো ঊনষাট জন নারী ও মেয়েশিশু নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে বাহাত্তর জন ধর্ষণের শিকার। জুনে সংখ্যাটা তিনশো তেত্রিশ, জুলাইয়ে অন্তত দুইশো নিরানব্বই। জানুয়ারি থেকে জুলাই, এই সাত মাসে এক হাজার ছয়শো সাতষট্টি জন নারী ও কন্যাশিশু নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন, দুইশো একানব্বই জন নিহত হয়েছেন। আগস্টে পঞ্চান্ন জন নারী ও কন্যাশিশু খুন হয়েছেন, চুয়ান্ন জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তার মধ্যে তেরো জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার। এই সংখ্যাগুলো কোনো বিরোধী দলের বানানো গল্প নয়, এগুলো এমএসএফ আর দেশের সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব হিসাব।
রিজভী যখন বলেন এখন আর কোনো সংবাদ নেই, তখন প্রশ্ন জাগে তিনি কোন দেশের কথা বলছেন আসলে? কোহেকাফ নগর? প্রতি মাসে শত শত নারী আর শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, খোদ ক্ষমতাসীন দল আর তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নামে বারবার ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের প্রমাণ মিলছে, দল একের পর এক নেতাকে বহিষ্কার করে দায় সারছে, অথচ মাইক হাতে পেলেই বলা হচ্ছে সমাজ থেকে অপরাধ মুছে গেছে। এই দ্বিচারিতা নতুন কিছু নয়।
২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপির শাসনে ঠিক এই সুরই শোনা গিয়েছিল, তখনও নেতাকর্মীদের অপরাধ অস্বীকার করা হতো, তখনও অস্বীকৃতিকেই সাফল্যের গল্প বানিয়ে বলা হতো। দুই দশক পার হয়ে গেছে, দলের নাম একই, কৌশলও একই, শুধু বক্তার মুখটা বদলেছে। ক্ষমতায় ফিরলে বিএনপির অতীতের অভ্যাসও যে ফিরে আসে, প্রমাণের জন্য আর কোনো ভাষণ দরকার নেই, খবরের কাগজের পাতা উল্টালেই যথেষ্ট।

