গত বছর আগস্টে যখন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকায় পা রাখলেন, তখন গোটা কূটনৈতিক মহলে একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। প্রায় তেরো বছর পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর, বড় বড় বুলি, নতুন বন্ধুত্বের গল্প, আর তার সঙ্গে একটা চকচকে ঘোষণা, নলেজ করিডোর। পাঁচ বছরে পাঁচশো পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি, টিউশন থেকে শুরু করে খাবার, থাকা, ভাতা, বিমান টিকিট, সবকিছু কাভার করা এক স্বপ্নের প্যাকেজ। যে সরকার আর যে জোট এই সম্পর্ক নবায়নের জন্য এত উদগ্রীব ছিল, তারা এই মুহূর্তটাকে একরকম কূটনৈতিক বিজয় হিসেবেই দেখাতে চেয়েছিল।
এক বছর পর সেই বিজয়ের গল্পটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? একদল তরুণ, যারা মাসের পর মাস পরীক্ষা দিয়ে, বাছাই প্রক্রিয়া পার করে, নিজেদের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিল এই প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে, তারা এখন হাতে পেয়েছে এমন এক অফার লেটার যেখানে শুধু টিউশন ফি আর হোস্টেল খরচের কথা বলা আছে। খাবার নেই, মাসিক ভাতা নেই, যাতায়াত নেই, বিমান ভাড়া নেই। যে জিনিসটা ছাড়া বিদেশের মাটিতে একজন শিক্ষার্থীর টিকে থাকাই অসম্ভব, সেটাই উধাও।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ায় ঢাকার ভূমিকা কী ছিল? যে সরকার এত আগ্রহ নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের গল্প ফেরি করেছে, বৃত্তির প্রচারে নিজেরাও যুক্ত থেকেছে, সেই একই সরকার যখন শিক্ষার্থীরা প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ তুলল, তখন হয়ে গেল একেবারে নিশ্চুপ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপক্ষীয় সচিব নজরুল ইসলামকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, তার জবাব ছিল বিষয়টা নাকি তাদের “নলেজে” নেই। শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা কেলেঙ্কারি, যেটা নিয়ে মাসের পর মাস অভিযোগ জমা হচ্ছে, সেটা নাকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরেই পড়েনি। এটা অজ্ঞতা নাকি ইচ্ছাকৃত এড়িয়ে যাওয়া, সেই প্রশ্নটা তোলা অন্যায় নয়।
ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশনের অবস্থাও একই রকম। কাউন্সিলর শাবিদ উল্লাহ ওয়াজির বারবার শুধু বলে গেছেন তারা তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, কিন্তু সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এসেও কোনো সদুত্তর নেই। পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশনকে ইমেইল করেও দুই সপ্তাহে কোনো জবাব মেলেনি। অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব ছিল এই সম্পর্ককে বিশ্বাসযোগ্য রাখা, তারা প্রত্যেকেই একে অপরের দিকে ঠেলাঠেলি করে দায় এড়িয়ে গেছে।
এটাই আসল সমস্যা। বিদেশনীতিতে বড় বড় প্রতীকী মুহূর্ত তৈরি করা সহজ, একটা সফর সাজানো, একটা ঘোষণা দেওয়া, ছবি তোলা, তালি কুড়ানো। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময় যখন পদে পদে ফাঁক ধরা পড়ে, তখন যে সরকার এই সম্পর্ক নিয়ে এত সরব ছিল, তাদেরই সবচেয়ে বেশি জবাবদিহি করার কথা। অথচ বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা, যেখানে ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ তরুণ-তরুণীরা, যাদের পরিবার হয়তো এতদিনে ভিসা, মেডিকেল, প্রাথমিক খরচের জন্য টাকা জোগাড়ও করে ফেলেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফায়েজ আহমদ বলেছেন, এই ঘটনা প্রতারণার শামিল, এবং অন্য কোনো দেশ হলে এভাবে ঘটত না বলেই তার ধারণা। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকও বলেছেন, এখানে কোনো এক জায়গায় গ্যাপ আছে, আর সেটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই। কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই মানুষগুলোর কথাতেও স্পষ্ট, সমস্যাটা শুধু কাগজের ভুল না, এটা দায়িত্বশীলতার সংকট।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায়। যে সম্পর্ক নবায়নের জন্য এত জাঁকজমক আয়োজন হলো, তার প্রথম বাস্তব পরীক্ষাতেই যখন শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়, তখন সেই সম্পর্কের ভিত্তিটা আসলে কতটা মজবুত ছিল? আর যারা এই সম্পর্ক নিয়ে এত কথা বলেছেন, তারা এখন কেন এত চুপ?

