শেষ পর্যন্ত মুখ খুলতে বাধ্য হলেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক। বললেন, “খোঁজাখুঁজির সুবিধার জন্য কারখানার জায়গা পরিষ্কার করতে মালিককে বলা হয়েছে।” শুনে মনে হয়, ১৮২টা প্রাণ যেন ধুলোবালি, ঝাঁটা দিয়ে উড়িয়ে দিলেই সব সমস্যা মিটে যাবে। পুলিশের এক কর্মকর্তা আবার বলছেন, “আমরা নিখোঁজদের মোবাইলের লোকেশন ট্র্যাক করছি।” দুই বছর পর মোবাইল ট্র্যাকিং! কারখানার চিমনিতে এখনো কাঁচা পোড়া মাংসের গন্ধ, আর পুলিশ খুঁজছে স্যাটেলাইট সিগন্যাল।
এটাই সেই বিএনপি-জামাতের আমল, যেখানে ১৮২ জন মানুষের মৃত্যু কোনো ইস্যুই না। একদল লুটপাট করতে ঢুকে আগুনে পুড়ে ছাই, অন্যদল বাইরে থেকে তালা মেরে দিয়েছে, আর এখন ক্ষমতাসীনদের ভাবনা কী? একটাই, ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া। তারা ভেবেছিল, ৫ আগস্ট সরকার পতনের ধোঁয়াশায় সব চাপা পড়ে যাবে। পড়েছেও তাই। যে প্রতিবেদনে ভবন ভেঙে তল্লাশির কথা বলা হয়েছিল, সেই প্রতিবেদন এখন জেলা প্রশাসকের আলমারিতে তালাবন্দি। ডিএনএ টেস্টের নামে যে হাড়গোড় জমা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো পুলিশের মালখানায় পঁচে গলে শেষ, তাও কোনো উত্তর নেই।
সিনথিয়া নামের এক নারী দুই ভাই আর দুলাভাইকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায়। বলছেন, “পুলিশ আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। মনে হয় আমরা মানুষই না।” জাকির হোসেন সুনামগঞ্জ থেকে ছুটে এসে নিজের হাতে ভাইয়ের হাড় কুড়িয়েছেন, অথচ প্রশাসন তাকে বলেছে, “চুপ থাকেন, কিছু হবে না।” এ কেমন সরকার? এ কেমন শাসন? মানুষ মরছে, আর সরকার বলছে কারখানা পরিষ্কার করতে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়তে থাকা মানুষগুলোর আর্তনাদ যেন বিএনপি-জামাতের কানে পৌঁছায় না। ক্ষমতার নেশায় তারা এখন বধির।
মনে রাখবেন, গাজী টায়ারসের সেই কারখানা কোনো অদৃশ্য দ্বীপে নয়। নারায়ণগঞ্জের প্রাণকেন্দ্রে। সেখানে পাঁচদিন ধরে আগুন জ্বলেছে, বাতাসে উড়েছে মানুষের ছাই, আর স্থানীয় প্রশাসন হাত গুটিয়ে বসে দেখেছে। আজ দুই বছর পরও সেই ছাইয়ের স্তূপ সরেনি, কিন্তু বিএনপির মুখ থেকে একটি সহানুভূতির শব্দও সরেনি। জামাত তো দূরের কথা, তারা এগুলোকে ‘অনিবার্য দুর্ঘটনা’ বলে চালিয়ে দিতে ওস্তাদ। এদের চরিত্র ২০০১-০৬ সালেও এমন ছিল, ২০২৬-এ এসেও বদলায়নি।
শুধু গাজী টায়ারস কেন, পুরো বাংলাদেশ আজ একটা আতঙ্কের কারখানা। আইন নেই, বিচার নেই, মানবিকতা শেষ। যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তারা খুঁজে পায়নি দায়ী কাউকে। অথচ পুরো এলাকা জানে, দুর্বৃত্তরা তালা মেরে আগুন দিয়েছে। কিন্তু কার সাহস যে সত্যিটা বলবে? ক্ষমতার ভয়ে সবাই এখন মূক ও বধির। ১৮২টি প্রাণ শুধু সংখ্যা হয়ে গেছে। পরিবারগুলোর চোখের পানি শুকিয়ে পাথর হয়েছে, তবু বিচার মেলেনি। এটাই কি সেই ‘সুশাসন’, যার স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলো এরা?
আজ ২০২৬ সালের আগস্ট। রূপগঞ্জের সেই কারখানা এখনো দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃশব্দ কবরখানা হয়ে। দেয়ালে এখনো লেগে আছে কালো কালি, যেন ১৮২ জনের শেষ নিশ্বাস। অথচ এই ধ্বংসস্তূপের দায় কেউ নিচ্ছে না। সরকার বলছে মোবাইল ট্র্যাকিং করছে, অথচ অঙ্গার হয়ে যাওয়া দেহগুলো পড়ে আছে পোড়া লোহার গুঁড়োর নিচে। আপনি যদি নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা হন, তবে রূপগঞ্জে যান। দেখুন সেই মৃত্যুকূপ। আর শুধু দেখে আসবেন না, প্রশ্ন করুন জেলা প্রশাসককে, প্রশ্ন করুন সেই পুলিশ সুপারকে। আপনি যদি সারা দেশের নাগরিক হন, তাহলে রাস্তায় নামুন। ঢাকার শাহবাগ হোক কিংবা চট্টগ্রামের প্রেস ক্লাব চত্বর, ১৮২ আত্মার জন্য একটা প্রতিবাদ সভা করুন।
এই বিএনপি-জামাত জোট ভেবেছিল ৫ আগস্টের আড়ালে সব লুকিয়ে ফেলবে। কিন্তু রক্ত কখনো চাপা থাকে না। গাজী টায়ারসের ইট-সিমেন্ট সরাতে হবে, কারণ সেই ইটের নিচেই হয়তো এক টুকরো হাড়ের জন্য এখনো অপেক্ষা করছে কোনো মা। রাজনীতির এই নিষ্ঠুরতম প্রহসনের অবসান চাই। বিচার চাই। এবং এক্ষুণি চাই।

