“রাষ্ট্র মেরামত” করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিন শেষ হলো। এই ১০০ দিনে মানুষ মেরামত কমই দেখেছে। সবচেয়ে বেশি দেখেছে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা, অনিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্য বিপর্যয় আর দায় এড়ানোর সংস্কৃতি। সার্বিক বিষয়ে সরকার বলছে “সব নিয়ন্ত্রণে আছে”, কিন্তু সাধারণ মানুষ জিজ্ঞেস করছে ঠিক কোন জিনিসটা নিয়ন্ত্রণে আছে?
আইনশৃঙ্খলা: রাষ্ট্র না মব? দেশজুড়ে খুন, ছিনতাই, দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত সতর্ক করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে “পদত্যাগ করো নাহলে…” সংস্কৃতি চালু হয়েছে। ছাত্র-শিক্ষকদের প্রকাশ্যে অপমান, হুমকি, এমনকি শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। আইন যেন আদালতের না, রাস্তার হাতে চলে গেছে।
নারী ও শিশু নিরাপত্তা: ২০২৬ না মধ্যযুগ? ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ভয়াবহরকম বেড়েছে। বিশেষ করে মাদ্রাসা ও প্রান্তিক পর্যায়ে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে নিয়মিত। নারীদের চলাফেরা ও স্বাধীনতা নিয়ে সমাজে একধরনের অঘোষিত ভীতি তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের নীরবতা অনেকের কাছে জামাত তোষণে সরকারের মৌন “সমর্থন” বলেই মনে করছে।
অর্থনীতি: বাজারে আগুন, সরকারের মুখে তত্ত্ব – নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মধ্যবিত্ত এখন ক্যালকুলেটর নিয়ে বাজারে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্ব বাজারে আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ। টাকার মান কমেছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, কিন্তু দায়িত্বশীল গোষ্ঠী এখনো “গভীর ষড়যন্ত্র” খুঁজতেই ব্যস্ত। বৈদেশিক ইনভেস্টমেন্টের ইন্টারিম যাদুকরকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিএনপি সরকার ঠিক কোন আশায় সেটাও বুঝা মুশকিল!
জ্বালানি সংকট: পাম্পে লাইন, মন্ত্রীর ভাষণে স্বস্তি – ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানি সংকটে দেশের পরিবহন, শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অথচ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল “রিজার্ভ যথেষ্ট আছে।” ওদিকে বাস্তবে মানুষ দেখেছে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, জ্বালানী খাতের নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা। শেষ পর্যন্ত সমাধান? জ্বালানির দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কেটে “সংকট সমাধান”।
স্বাস্থ্যখাত: হামে ৫৫০+ শিশু মৃত্যু, কিন্তু ব্যস্ততা ছিল ইমেজ ম্যানেজমেন্টে – গত ৬০ দিনে হামে সরকারী হিসেবে ৫৫০-এর বেশি শিশু মারা গেছে। হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ বহুবার সতর্কবার্তা দিয়েছিল টিকাদান কর্মসূচি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে। কিন্তু সেই সতর্কতা ফাইলের নিচেই চাপা পড়ে ছিল। আজ পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, শুধু মৃত্যু নয়, অসংখ্য শিশু দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা নিয়ে বেঁচে থাকবে। সরকারের অগ্রাধিকার তখন কী ছিল? ড্রাইভিং শো, ফটোসেশন, সপরিবারে চলচ্চিত্র উদযাপন, রাজনৈতিক নাটক ও কুৎসা রটনা।
পরিবহন খাত: চাঁদাবাজি এখন “মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং” – নতুন সড়কমন্ত্রীর বক্তব্য যেন মহাসড়কের চাঁদাবাজিকে অফিসিয়াল বৈধতা দিয়েছে। পরিবহন খাতে “সমঝোতার চাঁদা” এখন ওপেন সিক্রেট। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষকরা, যারা পণ্য শহরে আনতেই পথে পথে চাঁদা দিচ্ছে। ফলে বাজারদর বাড়ছে, কৃষকের লাভ কমছে। সড়কে গত বিশ্ব বছরের মধ্যে সবচে বেশী বিশৃঙ্খলা বিরাজ করেছে বলে শিরোনাম হয়েছে জাতীয় পত্রিকায়।
শিক্ষা খাত: ২৫ বছর আগের সিলেবাসে ২০২৬ চালানোর চেষ্টা – শিক্ষামন্ত্রী আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সংকট সমাধানে ফিরতে চাইছেন ২৫ বছর আগের ধারণায়। এর সঙ্গে পাকিস্তানি শিক্ষাব্যবস্থার প্রশংসা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। সমালোচকদের ভাষায় – এটা শুধু পশ্চাদমুখিতা নয়, বরং বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকেই দুর্বল করার চেষ্টা।
পররাষ্ট্রনীতি: ১০০ দিনে কূটনৈতিক নীরবতা – এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো আন্তর্জাতিক সফর, বড় রাষ্ট্রের সমর্থন, বা উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক মহল এখনো এই সরকারের দিকনির্দেশনা নিয়ে স্পষ্টতই সতর্ক অবস্থানে আছে।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব: রাষ্ট্রনায়ক না সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বারবার সামাজিক মাধ্যমে ট্রলের শিকার হয়েছে। ইতিহাস, অবকাঠামো ও জাতীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভুল তথ্য বিতর্ক বাড়িয়েছে। একদিকে আমাদের শিশুরা হাসপাতালে মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকার ব্যস্ত “হাই-প্রোফাইল ড্রাইভিং” আর পারিবারিক ফটোসেশনে। মানুষ প্রশ্ন করছে – সংকট মোকাবিলা হচ্ছে, নাকি শুধু ক্যামেরা ম্যানেজমেন্ট? আজ পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতের কোন টাস্কফোর্স কিংবা বিশেষ বৈঠক হতেও দেখেনি কেউ, বরং চলছে দোষ চাপানোর রাজনীতি।
ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১০০ দিন সাধারণত একটি সরকারের দিকনির্দেশনা বোঝায়। বিএনপি সরকারের এই ১০০ দিনে জনগণ দেখেছে অব্যবস্থাপনা, জনদুর্ভোগ, স্বাস্থ্য বিপর্যয়, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক অনিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ইমেজ রক্ষার ব্যস্ততা। শুধু স্লোগান দিতে জানলেই রাষ্ট্র চালানো যায় না। লাগে শিক্ষা, দক্ষতা, বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রথম ১০০ দিনে সেই সক্ষমতার চেয়ে অজুহাতই বেশি দেখা গেছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের পর ১০০ দিন উদযাপনের মাহেন্দ্রখনে দেশ পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপন করছে। এ যেন দেশকে কুরবানি দেয়ার প্রকৃতির এক রূপক উপহাস…

