তদবিরের আব্বুরা যখন তদবিরকে ত্যাজ্য করার ডাক দেয়!

ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের কথা মনে আছে তো আপনাদের? গণমাধ্যমে ভোটকেন্দ্রের ছবিগুলো দেখেছিলেন? ফাঁকা চেয়ার, ঘুমন্ত প্রিসাইডিং অফিসার, আর দূরে দূরে দুয়েকজন এজেন্ট বসে আছেন নিজেদের দলেরই। বাইরে জনমানব নেই। আওয়ামী লীগ নেই, জাতীয় পার্টি নেই, বাম দলগুলো নেই, দেশের মূলধারার প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একটা বড় অংশই নেই। এই মাঠে বিএনপি একা খেলল, একা গোল দিল, একা জিতল, আর তারপর মাইক হাতে বলল, এটা জনগণের রায়।

এই “জনগণের রায়” থেকে বের হওয়া বিএনপির তথাকথিত মন্ত্রিপরিষদ এখন তদবির নিয়ে চিন্তিত। সিনিয়র নেতারা বলছেন, মানুষ বড্ড বেশি সুপারিশ নিয়ে আসছেন, অনানুষ্ঠানিক তদবির করছেন, এটা বন্ধ করতে হবে। শুনতে দায়িত্বশীল লাগছে, তাই না? কিন্তু এই কথা যারা বলছেন, চলুন পাঠক আপনাদের সাথে নিয়ে তাদের দলের ইতিহাসে একটু ফ্ল্যাশব্যাক মেরে আসা যাক।

হাওয়া ভবনের কথা মনে আছে? ২০০১ থেকে ২০০৬, বাংলাদেশে দুটো সরকার চলত একসাথে। একটা সচিবালয়ে, আরেকটা গুলশানের একটা বাড়িতে। তারেক রহমান তখন কোনো মন্ত্রী না, কোনো নির্বাচিত পদেও না, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ফাইল সেই বাড়ি হয়ে যেত। ব্যবসায়ীরা জানতেন, সরকারি বরাত পেতে হলে সচিবালয় না, হাওয়া ভবন। পোস্টিং চাই? হাওয়া ভবন। টেন্ডার চাই? হাওয়া ভবন। তদবিরকে তখন শুধু টিকিয়ে রাখা হয়নি, তদবিরকে একটা কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছিল। সেটা ছিল রাষ্ট্রের সমান্তরাল একটা ব্যবস্থা, যেখানে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছাড়া কিছুই নড়ত না।

এই তথ্য কোনো বিরোধী দলের প্রচারণা না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সেই সময়টায় একের পর এক প্রতিবেদন দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সাংবাদিকরা লিখেছেন। তারেক রহমান নিজে পরে দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন, বহুবছর লন্ডনে পালিয়ে ছিলেন, তারপর কিভাবে আর কাদের সাহায্যে আবারও বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করলেন, সেটা ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু ২০০১-০৬ ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কী হয়েছিল, সেটা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই।

তদবির নাগরিকের নৈতিক ব্যর্থতা না, এটা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া। মানুষ যখন ট্যাক্স নোটিশ পান যেটা অস্পষ্ট আর অযৌক্তিক, যখন ঠিকাদার সরকারি পাওনা আদায় করতে পারেন না মাসের পর মাস, যখন জমির রেকর্ড ঠিক করতে গেলে কোথায় যেতে হবে সেটাই জানা যায় না, তখন মানুষ “কাউকে” খোঁজেন। এটা সিস্টেমের ফাঁকগুলো ভরাট করার একটা উপায় মাত্র।

কিন্তু বিএনপির আমলে এই ফাঁকগুলো তৈরি করা হয়েছিল সুচিন্তিতভাবে। কারণ ফাঁক থাকলে সুবিধা নেওয়া যায়। যে কর্মকর্তা বিচক্ষণভাবে ফাইল আটকে রাখতে পারেন, তিনি দামি হয়ে ওঠেন। যে নেতা সেই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন, তিনি আরও দামি। এই চেইনটা রাজনৈতিক অর্থনীতির একটা পরিচিত মডেল, আর বাংলাদেশে এই মডেলটা ২০০১-০৬ সালে অনেকটা পরিপক্ক রূপ নিয়েছিল।

তার উপর জামাত ছিল। জামাতে ইসলামী যারা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছিল, যাদের শীর্ষ নেতারা পরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখে পড়েছিলেন, তারা তখন সরকারের অংশীদার ছিল। মন্ত্রিত্ব পেয়েছিল, প্রশাসনে ঢুকেছিল, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করেছিল। তদবির তখন শুধু অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য হতো না, আদর্শিক অনুগত্যও একটা মুদ্রা হয়ে উঠেছিল।

২০২৬ সালে এসে সেই দলই আবার ক্ষমতায়, একটা নির্বাচনের মাধ্যমে যেটাকে নির্বাচন বলতে বিবেক সায় দেয় না। যে দলের জন্ম জিয়াউর রহমানের হাতে, সেনাশাসনের ছায়ায়, গণতন্ত্রের বাইরে থেকে ক্ষমতা দখলের অভিজ্ঞতা যার ডিএনএতে আছে, সেই দল এখন সুশাসনের ভাষায় কথা বলছে। সিপিডির জরিপ জানাচ্ছে, ৭২ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বলেছে কর কর্মকর্তাদের হয়রানি আর ঘুষ তাদের প্রবৃদ্ধির বড় বাধা। এই সংখ্যাটা একটা সরকারের ব্যর্থতার সাক্ষ্য, কিন্তু এই ব্যর্থতার শিকড় কোথায় সেটা না দেখলে সংখ্যাটা অর্থহীন।

প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা মানে ডিজিটাইজেশন, লিখিত সিদ্ধান্ত, নিরীক্ষাযোগ্য রেকর্ড। এই জিনিসগুলো যে দল চায় না, তারা তদবির বন্ধের কথা বলতে পারে না। কারণ তদবির টিকে থাকে অস্বচ্ছতায়। আর অস্বচ্ছতা রাখা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে, কারণ সেখান থেকে সুবিধা আসে, দলের জন্য, নেতার জন্য, মনোনীত কর্মকর্তার জন্য।

ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্রশাসনে যা হচ্ছে সেটাও দেখুন। পোস্টিং বদলাচ্ছে, পরিচিত মুখগুলো জায়গামতো বসছে, দলীয় ঘনিষ্ঠতা আবার যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে উঠছে। এটা নতুন কিছু না, এটা চেনা ছবি, ২০০১ সালেও এভাবেই শুরু হয়েছিল। তদবির কমাতে চাইলে প্রথম কাজ সৎভাবে স্বীকার করা যে এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক কে ছিল। সেই স্বীকৃতি ছাড়া বাকি সব কথা শুধুই আলগা আলাপ মাত্র।

ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের কথা মনে আছে তো আপনাদের? গণমাধ্যমে ভোটকেন্দ্রের ছবিগুলো দেখেছিলেন? ফাঁকা চেয়ার, ঘুমন্ত প্রিসাইডিং অফিসার, আর দূরে দূরে দুয়েকজন এজেন্ট বসে আছেন নিজেদের দলেরই। বাইরে জনমানব নেই। আওয়ামী লীগ নেই, জাতীয় পার্টি নেই, বাম দলগুলো নেই, দেশের মূলধারার প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একটা বড় অংশই নেই। এই মাঠে বিএনপি একা খেলল, একা গোল দিল, একা জিতল, আর তারপর মাইক হাতে বলল, এটা জনগণের রায়।

এই “জনগণের রায়” থেকে বের হওয়া বিএনপির তথাকথিত মন্ত্রিপরিষদ এখন তদবির নিয়ে চিন্তিত। সিনিয়র নেতারা বলছেন, মানুষ বড্ড বেশি সুপারিশ নিয়ে আসছেন, অনানুষ্ঠানিক তদবির করছেন, এটা বন্ধ করতে হবে। শুনতে দায়িত্বশীল লাগছে, তাই না? কিন্তু এই কথা যারা বলছেন, চলুন পাঠক আপনাদের সাথে নিয়ে তাদের দলের ইতিহাসে একটু ফ্ল্যাশব্যাক মেরে আসা যাক।

হাওয়া ভবনের কথা মনে আছে? ২০০১ থেকে ২০০৬, বাংলাদেশে দুটো সরকার চলত একসাথে। একটা সচিবালয়ে, আরেকটা গুলশানের একটা বাড়িতে। তারেক রহমান তখন কোনো মন্ত্রী না, কোনো নির্বাচিত পদেও না, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ফাইল সেই বাড়ি হয়ে যেত। ব্যবসায়ীরা জানতেন, সরকারি বরাত পেতে হলে সচিবালয় না, হাওয়া ভবন। পোস্টিং চাই? হাওয়া ভবন। টেন্ডার চাই? হাওয়া ভবন। তদবিরকে তখন শুধু টিকিয়ে রাখা হয়নি, তদবিরকে একটা কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছিল। সেটা ছিল রাষ্ট্রের সমান্তরাল একটা ব্যবস্থা, যেখানে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছাড়া কিছুই নড়ত না।

এই তথ্য কোনো বিরোধী দলের প্রচারণা না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সেই সময়টায় একের পর এক প্রতিবেদন দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সাংবাদিকরা লিখেছেন। তারেক রহমান নিজে পরে দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন, বহুবছর লন্ডনে পালিয়ে ছিলেন, তারপর কিভাবে আর কাদের সাহায্যে আবারও বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করলেন, সেটা ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু ২০০১-০৬ ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কী হয়েছিল, সেটা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই।

তদবির নাগরিকের নৈতিক ব্যর্থতা না, এটা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া। মানুষ যখন ট্যাক্স নোটিশ পান যেটা অস্পষ্ট আর অযৌক্তিক, যখন ঠিকাদার সরকারি পাওনা আদায় করতে পারেন না মাসের পর মাস, যখন জমির রেকর্ড ঠিক করতে গেলে কোথায় যেতে হবে সেটাই জানা যায় না, তখন মানুষ “কাউকে” খোঁজেন। এটা সিস্টেমের ফাঁকগুলো ভরাট করার একটা উপায় মাত্র।

কিন্তু বিএনপির আমলে এই ফাঁকগুলো তৈরি করা হয়েছিল সুচিন্তিতভাবে। কারণ ফাঁক থাকলে সুবিধা নেওয়া যায়। যে কর্মকর্তা বিচক্ষণভাবে ফাইল আটকে রাখতে পারেন, তিনি দামি হয়ে ওঠেন। যে নেতা সেই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন, তিনি আরও দামি। এই চেইনটা রাজনৈতিক অর্থনীতির একটা পরিচিত মডেল, আর বাংলাদেশে এই মডেলটা ২০০১-০৬ সালে অনেকটা পরিপক্ক রূপ নিয়েছিল।

তার উপর জামাত ছিল। জামাতে ইসলামী যারা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছিল, যাদের শীর্ষ নেতারা পরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখে পড়েছিলেন, তারা তখন সরকারের অংশীদার ছিল। মন্ত্রিত্ব পেয়েছিল, প্রশাসনে ঢুকেছিল, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করেছিল। তদবির তখন শুধু অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য হতো না, আদর্শিক অনুগত্যও একটা মুদ্রা হয়ে উঠেছিল।

২০২৬ সালে এসে সেই দলই আবার ক্ষমতায়, একটা নির্বাচনের মাধ্যমে যেটাকে নির্বাচন বলতে বিবেক সায় দেয় না। যে দলের জন্ম জিয়াউর রহমানের হাতে, সেনাশাসনের ছায়ায়, গণতন্ত্রের বাইরে থেকে ক্ষমতা দখলের অভিজ্ঞতা যার ডিএনএতে আছে, সেই দল এখন সুশাসনের ভাষায় কথা বলছে। সিপিডির জরিপ জানাচ্ছে, ৭২ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বলেছে কর কর্মকর্তাদের হয়রানি আর ঘুষ তাদের প্রবৃদ্ধির বড় বাধা। এই সংখ্যাটা একটা সরকারের ব্যর্থতার সাক্ষ্য, কিন্তু এই ব্যর্থতার শিকড় কোথায় সেটা না দেখলে সংখ্যাটা অর্থহীন।

প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা মানে ডিজিটাইজেশন, লিখিত সিদ্ধান্ত, নিরীক্ষাযোগ্য রেকর্ড। এই জিনিসগুলো যে দল চায় না, তারা তদবির বন্ধের কথা বলতে পারে না। কারণ তদবির টিকে থাকে অস্বচ্ছতায়। আর অস্বচ্ছতা রাখা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে, কারণ সেখান থেকে সুবিধা আসে, দলের জন্য, নেতার জন্য, মনোনীত কর্মকর্তার জন্য।

ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্রশাসনে যা হচ্ছে সেটাও দেখুন। পোস্টিং বদলাচ্ছে, পরিচিত মুখগুলো জায়গামতো বসছে, দলীয় ঘনিষ্ঠতা আবার যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে উঠছে। এটা নতুন কিছু না, এটা চেনা ছবি, ২০০১ সালেও এভাবেই শুরু হয়েছিল। তদবির কমাতে চাইলে প্রথম কাজ সৎভাবে স্বীকার করা যে এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক কে ছিল। সেই স্বীকৃতি ছাড়া বাকি সব কথা শুধুই আলগা আলাপ মাত্র।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ