গত ১২ ফেব্রুয়ারির পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ যেন এক ‘মৃত্যুপুরীতে’ পরিণত হয়েছে। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনেই ঢাকায় অন্তত ১৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে বছরের প্রথম তিন মাসেই ১০৭টি হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে রাজধানী। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি এবং মার্চে ৩৩টি খুনের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই খুনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত তিন মাসে সারা দেশে মোট ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রাঙামাটির কুতুকছড়িতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে ধর্মসিং চাকমা নিহতের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া বিএনপির শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখন ঢাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন ও খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসীরা মুক্ত হয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজার এলাকায় পিচ্চি হেলাল ও ইমনের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধের জেরে প্রকাশ্যে কোপানোর ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী বিদেশে বসেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঢাকার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো এখন সন্ত্রাসীদের চারণভূমি। ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং জমি দখলের মহোৎসব চলছে। বাদশাহ, আহাদ, রবিন ও মাসুদের মতো সন্ত্রাসীরা সরকারি অফিসগুলোর টেন্ডার দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে, যা যে কোনো সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারওয়ান বাজারের আড়ত, সবজির ট্রাক এবং লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে মোহাম্মদপুর এলাকা এখন অপরাধের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। গত ১৫ এপ্রিল আসাদুল হক নামে এক যুবককে এবং ১২ এপ্রিল ‘এলেক্স ইমন’ নামের এক সন্ত্রাসীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একইভাবে পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন হত্যাকাণ্ডের পেছনেও জোসেফ ও ইমনের দীর্ঘদিনের বিরোধের যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা তাদের নেটওয়ার্ক বড় করছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এই চাঁদাবাজির অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ নিজ বাসভূমে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপরতার দাবি করলেও রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই ‘কিলার কালচার’ ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কার্যত কোনো দৃশ্যমান সফলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

