জুলাই দাঙ্গার পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়েই লুটপাটের উৎসবে মেতে ওঠার অভিযোগ উঠেছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও ইরান যুদ্ধের দোহাই দিয়ে ধাপে ধাপে জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বাড়ানোর পর এবার সাধারণ মানুষের পকেটে টান দিতে প্রস্তুত পরিবহন খাতের সিন্ডিকেটগুলো। সরকারের সবুজ সংকেতে আজ থেকেই কার্যকর হয়েছে বর্ধিত পরিবহন ভাড়া।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলনকক্ষে বাস ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরসহ আন্তজেলা বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার বাসের ভাড়া সমন্বয় করল। আজ থেকেই এই নতুন ভাড়া কার্যকর হবে।”
চলতি সপ্তাহেই সারাদেশে জ্বালানি তেলের দাম পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন তালিকা অনুযায়ী অকটেন: ১৪০ টাকা (আগে ১২০ টাকা), পেট্রোল: ১৩৫ টাকা (আগে ১১৬ টাকা), ডিজেল ১১৫ টাকা (আগে ১০০ টাকা), কেরোসিন: ১৩০ টাকা (আগে ১১২ টাকা) বিক্রি হচ্ছে
পাশাপাশি বিইআরসি গ্রাহক পর্যায়ে এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের দামও এক লাফে ২১২ টাকা বাড়িয়েছে। ফলে ১২ কেজি সিলিন্ডারের বর্তমান দাম দাঁড়িয়েছে ১,৯৪০ টাকা। গত মার্চ মাসেও যা ছিল ১,৩৪১ টাকা। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ৫৯৯ টাকা বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরকে তপ্ত করে তুলেছে।
সরকার জ্বালানি মজুত থাকার দাবি করলেও রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা গেছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন। পাম্পগুলোতে সরবরাহ ১০-১৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ায় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ পেট্রোল ও অকটেনে আগে থেকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকলেও বর্তমান সরকারের অদক্ষতা ও সিন্ডিকেট তোষণের কারণে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ উঠেছে, জনগণকে দরিদ্র ও দেশ দেউলিয়া দেখিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে ২ বিলিয়ন ডলার (২৪ হাজার কোটি টাকা) ঋণ নেওয়ার ফন্দি করছে সরকার। সমালোচকরা এই বিশাল ঋণের প্রচেষ্টাকে বিএনপির ‘লুটপাটের নতুন প্রজেক্ট’ ও বিশ্ব দরবারে ‘ভিক্ষার থালা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের প্রভাবে দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উৎপাদন বন্ধ হয়েছে দেশের চারটি বড় সরকারি সার কারখানায়। লোডশেডিংয়ের কারণে গার্মেন্টস খাতের উৎপাদন তলানিতে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির চেইন রিঅ্যাকশনে চাল, ডালসহ প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। নির্দিষ্ট বেতনের কর্মজীবীদের আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। খাবার টেবিল থেকে পুষ্টিকর খাবার ছাঁটাই করে সন্তানদের শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে লড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব এবং লুটপাটের মনোভাব দেশটিকে একটি স্থায়ী ঋণের ফাঁদে ফেলতে যাচ্ছে। নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম মাসেই যেভাবে ঋণের জন্য সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে, তাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ এখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

