২২ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার বেলা সাড়ে ১১টা। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট ফিলিং স্টেশন। তীব্র রোদ, ঝলসে দেওয়া গরম, আর দীর্ঘ এক লাইন—ডিজেলের আশায় দাঁড়িয়ে থাকা শত শত মানুষের ভিড়। সেই লাইনের মধ্যেই ছিলেন ৫৫ বছর বয়সী কৃষক আব্দুল আলম—মোহনপুর পৌরসভার বাকশৈল গ্রামের এক সাধারণ মানুষ, যার স্বপ্ন ছিল শুধু তার জমিতে সেচ দেওয়া, ফসল বাঁচানো, পরিবারটাকে টিকিয়ে রাখা।
ভোররাত থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সময় গড়িয়েছে, সূর্য মাথার ওপর উঠেছে, তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে—কিন্তু ডিজেলের দেখা নেই। অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর অসহ্য গরমের সঙ্গে লড়াই করতে করতে একসময় শরীর আর সায় দেয়নি। হঠাৎ করেই লাইনের মধ্যেই ঢলে পড়েন আব্দুল আলম। আশপাশের মানুষ ছুটে আসে, তাকে দ্রুত মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ—চিকিৎসক জানিয়ে দেন, তিনি আর নেই। প্রাথমিকভাবে বলা হচ্ছে, তীব্র গরমে হিট স্ট্রোকেই তার মৃত্যু হয়েছে।
রাজশাহীর মোহনপুরে আব্দুল আলম নামের এক কৃষকের এই মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন হচ্ছে—এই মৃত্যু কি শুধুই “হিট স্ট্রোক”, নাকি এটি একটি পরিকল্পনাহীন, অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত রাষ্ট্রযন্ত্রের পরোক্ষ হত্যাকাণ্ড?
একজন কৃষক—যার কাঁধে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভার—তাকে কেন ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ডিজেল সংগ্রহ করতে হবে? কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে জীবন আর জীবিকার মধ্যে তাকে বেছে নিতে হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সরাসরি এসে দাঁড়াতে হয় সরকারের সার্বিক ব্যবস্থাপনার সামনে।
প্রথমত, জ্বালানি ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা স্পষ্ট। কৃষি মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা বাড়বে—এটা নতুন কোনো তথ্য নয়। তবুও কেন পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হলো না? কেন পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ লাইন, বিশৃঙ্খলা, আর অমানবিক অপেক্ষা? এটি কি পরিকল্পনার অভাব, নাকি ইচ্ছাকৃত অবহেলা?
দ্বিতীয়ত, তাপদাহ মোকাবিলায় সরকারের উদাসীনতা ভয়াবহভাবে প্রকাশ পেয়েছে। যখন তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছায়, তখন জরুরি নির্দেশনা, ছায়াযুক্ত অপেক্ষার ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ, কিংবা বিকল্প বিতরণ ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে—মানুষ খোলা রোদে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর প্রশাসন দর্শকের ভূমিকায়।
তৃতীয়ত, গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতি চরম অবহেলা। কৃষকরা আজ জ্বালানি সংকটে জিম্মি। সেচ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদনে, বাজারে মূল্যবৃদ্ধিতে, এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সরকার কি এই বিপর্যয়ের গভীরতা বুঝতে পারছে?
এই মৃত্যু আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে—রাষ্ট্র যখন তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন সেই ব্যর্থতার বোঝা বইতে হয় সাধারণ মানুষকে, কখনও কখনও জীবন দিয়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ধরনের ঘটনা যদি এখনই কঠোরভাবে মোকাবিলা না করা হয়, তাহলে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে
খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে
এবং শেষ পর্যন্ত, সরকারের প্রতি আস্থার সংকট গভীর হবে।
একটি দায়িত্বশীল সরকার কখনোই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে দেয় না, যেখানে একজন কৃষক তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে মারা যায়। এই মৃত্যু কেবল একজন আব্দুল আলমের নয়—এটি একটি ব্যর্থ নীতির, একটি উদাসীন প্রশাসনের, এবং একটি অকার্যকর ব্যবস্থার মৃত্যু।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই মৃত্যুর দায় কে নেবে? নাকি এটাও আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে?

