দেশে বাকস্বাধীনতা এখন কেবল নামেই সীমাবদ্ধ—এমন অভিযোগ তুলেছেন বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা। সম্প্রতি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মতপ্রকাশের জেরে নাগরিকদের গ্রেফতারের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ২২ দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অন্তত পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে; অর্থাৎ গড়ে প্রতি চার দিন অন্তর একজন নাগরিক শ্রীঘরে যাচ্ছেন। গ্রেফতারকৃতদের তালিকায় সাধারণ গ্রামবাসী ও গৃহিণী থেকে শুরু করে কনটেন্ট ক্রিয়েটরও রয়েছেন।
ভৌগোলিক বিশ্লেষণ ও গ্রেফতারের প্যাটার্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৬ মার্চ ময়মনসিংহে গ্রেফতারের মাধ্যমে এই গ্রেফতারের ঘটনা শুরু হয়। এরপর ২ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জ, ৫ এপ্রিল ভোলা, ৬ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও এবং সবশেষ ১৭ এপ্রিল খোদ রাজধানী ঢাকায় গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। দেশের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের আইনি পদক্ষেপ একটি সুনির্দিষ্ট ‘প্যাটার্ন’ বা ধরন নির্দেশ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চপর্যায়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা বিশেষ নজরদারি ছাড়া দেশজুড়ে এমন ধারাবাহিক গ্রেফতার সম্ভব নয়।
তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তির খড়গ গ্রেফতারের কারণ হিসেবে ঘুরেফিরে আসছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়ে সমালোচনা। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর ফটোকার্ড শেয়ারের অভিযোগে আজিজুল হককে সাইবার সুরক্ষা ও সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেফতার করা হয়। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে একই অভিযোগে গোলাম মোস্তফা নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হলে মানবাধিকার সংস্থা ‘আসক’ তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে। এছাড়া গত বছরের ডিসেম্বরে তারেক রহমানকে কটূক্তির অভিযোগে এ কে এম শহিদুল ইসলাম নামে এক শিক্ষককেও গ্রেফতার হতে হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ ‘বাকস্বাধীনতা’ নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন জুলাই দাঙ্গার অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। সাম্প্রতিক পাঁচ গ্রেফতারের খবর শেয়ার করে তিনি ফেসবুকে বাকস্বাধীনতার পক্ষে আওয়াজ তুলেছেন। তবে তার এই অবস্থানকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে ট্রলের বন্যা।
নেটিজেনরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই হাসনাত আব্দুল্লাহর নেতৃত্বেই ‘সময় টেলিভিশন’-এর কার্যালয়ে মব চালানো হয়েছিল। এমনকি ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার বিরুদ্ধেও তিনি একের পর এক বিতর্কিত অভিযোগ তুলেছিলেন। সমালোচকরা বলছেন, যিনি একসময় প্রকাশ্য জনসভায় হুঙ্কার দিয়েছিলেন—”যারা বলবে মব জাস্টিস, ওরে সাইজ”—আজ তার মুখেই বাকস্বাধীনতার কথা অনেকটা ‘ভূতের মুখে রামনাম’ বা বাকস্বাধীনতার নামে চরম উপহাসের মতো শোনাচ্ছে।
উদ্বেগ সাধারণ মানুষের মতে, যখন সরকারের সমালোচনার কারণে একজন গৃহিণী বা গ্রামবাসী গ্রেফতার হন, তখন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া নজরদারি ও তুচ্ছ কারণে সাইবার আইনে গ্রেফতারের এই সংস্কৃতি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানুষের অবাধ মতপ্রকাশের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

