বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে যে অনিয়ম হয়েছে, সেটা আর “অভিযোগ” নয়। এনসিটিবির সদস্য নিজেই স্বীকার করেছেন, প্রাক্কলিত দর ফাঁস হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, কে ফাঁস করলো? আর যেই করুক, তাতে ক্ষতি কি?
সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য ৩১ কোটি বই ছাপাবে। সম্ভাব্য ব্যয় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রাক্কলিত দর ফাঁস হওয়ার পর ৭৫ জন মুদ্রণ ব্যবসায়ী চাপ দিয়ে দর বাড়িয়েছেন। এনসিটিবি বোর্ড সেটি মেনে নিয়েছে। তারপর ঠিকাদারেরা সমঝোতা করে দরপত্র দাখিল করেছেন।
মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে প্রতি ফর্মার দর ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা। ২০২৭ সালে সেটা ৩ টাকা ৩২ পয়সা। বাড়লো ৪৪ শতাংশ। অথচ প্রথমে দর ধরা হয়েছিল ২ টাকা ৮৫ পয়সা। অর্থাৎ শুরুর দর থেকে হিসাব করলে বাড়তি চাপটা আরও স্পষ্ট। শুধু মাধ্যমিকের বই ছাপাতেই বাড়তি খরচ ২৫২ কোটি টাকা।
এই ২৫২ কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে? করদাতার পকেট থেকে। আর সেটা যাবে কার পকেটে? যারা আগেই প্রাক্কলিত দর জেনে গেছেন, যারা চাপ দিয়ে দর বাড়িয়েছেন, যারা সমঝোতা করে কাজ ভাগাভাগি করেছেন। সিপিটিইউর সাবেক মহাপরিচালক স্পষ্ট বলেছেন, দরপত্র আহ্বানের পর প্রাক্কলিত দর পরিবর্তনের সুযোগ নেই। পরিবর্তন করতে হলে বাতিল করে নতুন দরপত্র ডাকতে হবে। কিন্তু এখানে সেটা হয়নি। মাঝপথে দর বাড়ানো হয়েছে, দরপত্র লাইভ থাকা অবস্থাতেই।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেছেন, কাগজ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খরচ বাড়ায় দর বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, দর বাড়ানোর সিদ্ধান্তটা এসেছে ঠিকাদারদের চাপের পর। আর যেই দরটা বাড়ানো হলো, সেটা ঠিকাদারদের আগেই জানা ছিল। এটা প্রমাণ করে, সিস্টেমের ভেতরে কেউ তথ্য পাচার করছেন।
আরও বড় প্রশ্ন, কালোতালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান কীভাবে ফিরে এলো? গতবার অনিয়মের অভিযোগে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকাভুক্ত করেছিল এনসিটিবি। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তার মধ্যে অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগ ছিল।
দরপত্রের তথ্য বলছে, ষষ্ঠ শ্রেণির ৬৬৯ নম্বর দরপত্রে প্রমা প্রিন্টিং, সীমান্ত প্রেস এবং ব্রাইট প্রিন্টিং কাছাকাছি দর জমা দিয়েছে। তিন প্রতিষ্ঠানের মালিক একই ব্যক্তি। অন্য কেউ প্রতিযোগিতা করেনি। সপ্তম শ্রেণির ৭১৪ নম্বর দরপত্রে ১৪টি প্রতিষ্ঠান কিনেছিল, কিন্তু দর জমা দিয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান।
মুদ্রণশিল্পের মালিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দরপত্র জমার আগের দিনই আলাপ হয়েছে, কোন শ্রেণিতে কত দর দিতে হবে। এই তথ্য প্রমাণ করে, প্রতিযোগিতা ছিল না। ছিল শুধু ভাগাভাগির খেলা।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামাত জোটের আমলে ঠিকাদারি লুট, দর ফাঁস আর সমঝোতার দরপত্র ছিল রমরমা ব্যবসা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো সব খাতে একই চিত্র। ২০২৬ সালে এসে সেই পুরনো চক্রই ফিরে এসেছে। একই কায়দা, একই কৌশল। পার্থক্য শুধু সময়ের।

