হিসাবটা এক মিনিটেই করা যায়। ঘরভাড়া ৫ হাজার টাকা, গ্যাসের একটা সিলিন্ডার ২ হাজার ৬৮ টাকা। ১২ হাজার ৫০০ থেকে এই দুটো বাদ দিলে থাকে ৫ হাজার ৪৩২ টাকা। এই টাকায় একজন গার্মেন্টস শ্রমিককে ত্রিশ দিন খেতে হবে, পরতে হবে, অসুখে ওষুধ কিনতে হবে, গ্রামের পরিবারকেও কিছু পাঠাতে হবে। দিনে দাঁড়ায় ১৮১ টাকা। যে বাজারে গরুর মাংস কেজি ৯০০ টাকা, সেখানে এই টাকায় এক দিনে আড়াইশ গ্রামও আসে না। শ্রমিকের জন্য আলাদা বাজার বসে না, ওই বাজারেই তাকে যেতে হয়, যেখানে আপনি আমি যাই।
এই মানুষগুলোর সংখ্যা ৪৪ লাখ। তাঁদের হাতে চলে দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ, জিডিপির প্রায় ১০ ভাগ। সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকের রেমিট্যান্স যোগ করলে দেশের অর্থনীতির এক-পঞ্চমাংশ দাঁড়িয়ে আছে দুই দল শ্রমিকের কাঁধে। এই দুই কাঁধ ভেঙে পড়লে পুরো দেশের পেটে টান পড়ে। তবু যে সরকার ক্ষমতায় বসে আছে, তার চোখে এই কাঁধের মালিকেরা কেন এখনো গণনার বাইরে?
মালিকপক্ষ আর সরকারের পুরোনো যুক্তিটা আমরা সবাই জানি। মজুরি বাড়ালে প্রতিযোগিতায় টেকা যাবে না, ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যাবে। কিন্তু বৈশ্বিক মজুরির তালিকাটা একবার খুলে দেখা যাক। বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের ওপরে আছে শুধু চীন। তিন নম্বর ভিয়েতনাম, পাঁচ নম্বর ভারত, চার নম্বর তুরস্ক। ভিয়েতনাম আর ভারতের ন্যূনতম মজুরি দেড়শ থেকে দুইশ ডলার, তুরস্কের ৬০০, চীনের ২৬০ থেকে ৪০৯। আমাদের ৯৬। এই দেশগুলোকে ক্রেতারা ছেড়ে যায়নি। তাহলে কোন যুক্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে মজুরি বাড়ালেই সব ধসে পড়বে? মজুরির দিক থেকে সেরা বিশ রপ্তানিকারকের মধ্যে আমরা উনিশ বা বিশ নম্বরে, পেছনে ফেলে রাখার মতো দেশ প্রায় নেই। যুক্তিটা আসলে যুক্তি নয়, অজুহাত।
এই অজুহাত ধরা পড়ে আরেকটা জায়গায়। ইউরোপের দোকানে একটা শার্ট বিক্রি হয় ৩৭০০ টাকায়। শ্রমিক পায় ২৫ থেকে ৩০ টাকা, অর্থাৎ এক ভাগেরও কম। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আর ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইনের তথ্য বলছে, অন্তত ৫৯ ভাগ, প্রায় ২ হাজার ১৮০ টাকা, যায় ইউরোপের দোকানদারের ঘরে। শ্রমিকের তুলনায় সত্তর গুণের বেশি। এই কাঠামোতে শ্রমিকের মজুরি কয়েক টাকা বাড়ালে দামে বিশেষ ফারাক পড়ে না, আর ক্রেতার সঙ্গে দর-কষাকষির জায়গাটাও সরকারেরই, শ্রমিকের নয়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ কখনো কড়া হয়েছে, এমন নজির আছে কি?
আরও একটা অঙ্ক আছে, যেটা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, আমদানি-রপ্তানির আড়ালে প্রতি বছর আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়। ৪৪ লাখ শ্রমিকে ভাগ করলে মাথাপিছু দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৪০০ ডলার। একজন শ্রমিক বছরে বেতন পান ১ হাজার ১৫২ ডলারের মতো। মানে প্রতি বছর যে টাকা দেশ থেকে অবৈধভাবে বেরিয়ে যায়, তা প্রতিটি শ্রমিকের বার্ষিক আয়ের তিন গুণ। যে সরকার এই পাচারের রাস্তা আটকাতে পারে না বা চায় না, শ্রমিকের কাছে সংযমের পাঠ নিয়ে যাওয়া তার মানায় না।
সোমালিল্যান্ডের পুরো অর্থনীতির আকার ৫ বিলিয়ন ডলার। আফ্রিকায় মিশরকে বাদ দিলে পোশাক রপ্তানিতে সেরা কেনিয়ার বার্ষিক আয় ৫০০ মিলিয়ন, আমাদের মাত্র ১.২৫ ভাগ। তবু তারা ২০৩৫ সালে ১ বিলিয়নের স্বপ্ন নিয়ে গর্ব করে। আর আমাদের হাতে এমন এক খাত, যার আয় কেনিয়ার আশি গুণ, অথচ খাতটির প্রাণ যারা, তাঁদের থালায় পড়ে দিনে ১৮১ টাকার ভাত।
এই খাতে একসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন নারী। ইউএন উইম্যানের গবেষণা অনুযায়ী ইউনূস সরকারের প্রথম বছরে ২১ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন, তার ১৮ লাখই নারী। বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেই ক্ষতি ফেরানোর কী উদ্যোগ দেখিয়েছে, সেটা জানতে চাওয়াটা কোনো বাড়াবাড়ি নয়। যে সরকার ঘরে ফেরা মেয়েদের কাজে ফেরাতে পারে না, আর যারা কাজে আছেন তাঁদের মজুরি নিয়েও কথা বলে না, সে সরকার কার জন্য?
রাস্তায় দাঁড়ানো এক নারী শ্রমিক পুলিশের বন্দুকের সামনে বলেছিলেন, “মারবেন? মারেন…”। এই কথাটা কেবল একজন মানুষের ক্ষোভ নয়। ক্ষমতায় যারা আছেন, এটা তাঁদের জন্য জিজ্ঞাসা, যার জবাব এখনো আসেনি। বেতন কত হবে তা আলোচনার বিষয় হতেই পারে। কিন্তু ১২,৫০০ টাকায় একজন মানুষ কীভাবে বাঁচে, এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় বিএনপি কিভাবে এড়াবে?

