দিল্লির ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ না করা নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বিমস্টেকের সভাপতি হিসেবে দাওয়াত দেওয়া হলেও এককভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ না জানানোয় তিনি যোগ দেননি। তবে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মূল কারণ কূটনৈতিক বা প্রটোকল সংক্রান্ত নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখতেই এই সম্মেলন বর্জন করা হয়েছে।
বিমস্টেকের প্রবিধান অনুযায়ী, প্রতি দুই বছর অন্তর নির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে সদস্য রাষ্ট্রগুলো আবর্তিতভাবে সভাপতির দায়িত্ব পায়। বর্তমানে বাংলাদেশ এই পদে আসীন থাকায় স্বভাবতই দেশের সরকারপ্রধান বিমস্টেকের প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলে বিমস্টেক প্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ পাওয়ার অর্থই হলো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকেই আহ্বান জানানো।
প্রটোকলের দোহাই দিয়ে ব্রিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে যোগদান না করার অজুহাতকে সরকার ও পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘নাটক’ বলে অভিহিত করছেন বিশ্লেষকরা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত ‘রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’-এর শর্তই আজ বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছে। চুক্তিটির ৪.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী—যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক স্বার্থে কোনো দেশের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে, বাংলাদেশকে সমান্তরাল বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন কর্তৃক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হওয়া রাশিয়া বা ইরানের মতো দেশগুলোর সাথে স্বাধীনভাবে সম্পর্ক বজায় রাখার সামর্থ্য হারায় ঢাকা।
চলতি ব্রিকস সম্মেলনে রাশিয়ার পাশাপাশি অতিথি রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের উপস্থিতি এবং জোটের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা—ডলারের বিকল্প হিসেবে নিজস্ব মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা—যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির চরম বিপরীত। ১৮তম নয়া দিল্লি ঘোষণাপত্রে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য জোর দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেখানে চীনের পক্ষ থেকে নাম না করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক বাধার কঠোর সমালোচনা করা হয়।
এমতাবস্থায়, বাংলাদেশে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিলে রাশিয়া ও ইরানের উপস্থিতিতে গঠিত এই অর্থনৈতিক অবস্থানের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে হতো, যা ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষোভের কারণ হতে পারতো। সরকার কেবল মার্কিন স্বার্থ রক্ষা ও ট্রাম্প প্রশাসনের অসন্তোষ এড়াতেই সম্মেলনে না গিয়ে পররাষ্ট্র নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্থ করেছে বলে সমালোচনা উঠছে।
ড. ইউনূসের রেখে যাওয়া বৈষম্যমূলক চুক্তি এবং তারেক রহমান সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের আঘাত আসছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমেরিকার ওপর একক নির্ভরশীলতার নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনবে।

