জামিনে মুক্তি পাওয়া জঙ্গিরা এখন কার খেদমতে?

বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা আবার শুরু হয়েছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আগে দেখতে হবে রাষ্ট্র নিজে এই ইস্যুতে কতটা সৎ আর কতটা দায়িত্বশীল। কারণ এখানে সমস্যা শুধু জঙ্গিদের নিয়ে না, সমস্যা হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের অস্বীকার করার রাজনীতি আর হিসাব গোপন করার সংস্কৃতি নিয়ে। অথচ চারপাশে যে সব ঘটনা ঘটছে তাতে চোখ বন্ধ করে থাকা মানে আগুনের ওপর চাদর টেনে ঘুমানোর চেষ্টা করা।

প্রথমেই হিসাবটা মেলানো দরকার। কারা কর্তৃপক্ষের নিজেদের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিন শত আটত্রিশ জন জঙ্গি সংশ্লিষ্ট আসামি জামিনে বেরিয়ে গেছে। জেল ভেঙে পালানো তিন জঙ্গি নেতা এখনো অধরা। নরসিংদী কারাগার থেকে একলাফে সাতাশ জন জঙ্গি পালিয়েছে, তাদের কাউকে ধরা যায়নি।

অথচ রাষ্ট্রের উচ্চমহল থেকে শোনা যায় জঙ্গি বলে কিছু নেই, যারা পালিয়েছে তাদেরও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু খোঁজ নেওয়া আর ধরতে পারার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ফারাক, সেটা কেউ স্বীকার করতে চায় না। কারা মহাপরিদর্শক নিজেই বলেছেন, নরসিংদী কারাগারের নথি পুড়ে যাওয়ায় এক শত ছেষট্টি জনের পরিচয়ই নিশ্চিত করা যায়নি। তার মানে কারা পালিয়েছে তা-ই রাষ্ট্র জানে না, আবার দাবি করে সব নিয়ন্ত্রণে আছে।

এবার আসা যাক জামিনে বের হওয়া মানুষগুলোর অবস্থানে। আল কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএসের সঙ্গে যুক্ত ইকরামুল হক ২০২৪ সালের অক্টোবরে জামিনে বের হওয়ার পর থেকে কার্যত উধাও। অথচ এই মানুষটা ভারতে দশটা মামলার আসামি, প্রযুক্তিতে দক্ষ, অনলাইনে দাওয়াহ ক্লাস নিতেন। তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর রাষ্ট্রের কাছে তার বর্তমান অবস্থানের কোনো তথ্য নেই। একই চিত্র বোমারু মামুনের ক্ষেত্রে। যে মানুষটার তৈরি বোমা পান্থপথের হোটেল ওলিওতে বিস্ফোরিত হয়েছিল, সে জামিনে বেরিয়ে এখন নব্য জেএমবির নেটওয়ার্কে সক্রিয় বলে পুলিশেরই দাবি। সাভার, আশুলিয়া, কেরাণীগঞ্জ, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, কুমিল্লা, সব জায়গায় বোমা উদ্ধারের ঘটনার সঙ্গে তার বা তার সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলছে। প্রশ্ন হলো, যার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, তাকে জামিন দেওয়া হলো কোন বিচারে? আদালত হয়তো আইনি প্রক্রিয়ায় খালাস দিয়েছে, কিন্তু গোয়েন্দাদের কাছ থেকে প্রতিদিন যে তথ্য আসছে তাতে এই খালাসকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যায় কতটা নড়বড়ে ছিল।

সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং টিমের ওই প্রতিবেদন। সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে, একিউআইএস আর আগের মতো বড় সংগঠন নেই, বরং ছোট ছোট সেলে বিভক্ত হয়ে বিকেন্দ্রীভূতভাবে কাজ করছে। নিজেদের লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক তারা নিজেরাই গড়ে তুলছে। আর বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তারা এখানে শাখা গড়ার চেষ্টা করছে। এই তথ্য যখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নজরদারি থেকে আসছে, তখন ঢাকার কোনো কর্মকর্তা যদি বলেন ওটা অনুমাননির্ভর, তাহলে সেটা বোকার মতো নিজের চোখ বন্ধ করে রাখা। কারণ ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লায় হামলার দায় একিউআইএস নিয়েছিল, এটা তো আর ঢালিউড সিনেমার গল্প না। প্রতিবেশী দেশে হামলা চালানো একটা সংগঠন যখন বাংলাদেশের ভেতরে পা রাখার চেষ্টা করে, তখন তাকে অস্বীকার করার মানে হয় না।

এখন প্রশ্ন হলো এই জঙ্গি তৎপরতার পেছনে কি কেবল আদর্শিক টান, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা। ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সময় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগ নিয়েছে জঙ্গিরা। জেল ভেঙেছে, পালিয়েছে, আবার কেউ জামিন পেয়েছে। কিন্তু এই সুযোগটা তারা পেল কেন? কারণ তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল মাথাহীন, নেতৃত্বহীন, আর রাষ্ট্র ছিল দিশেহারা। সেই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গিরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আজ যখন আবার কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থা এসেছে, তখন দেখা যাচ্ছে তাদের সেই নেটওয়ার্ক আগের চেয়ে বেশি ছড়িয়ে গেছে।

আরেকটা দিক হলো রাজনৈতিক উগ্রবাদ আর ধর্মীয় উগ্রবাদের সখ্যতা। যে শক্তি আজ ক্ষমতায়, তাদের অতীতেই আছে জামায়াতের সঙ্গে সখ্যের ইতিহাস। ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামী আর তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির অতীতে জঙ্গিবাদকে উসকে দিয়েছে, মদদ দিয়েছে। সেই জামায়াত আজ সরকারের শরিক কিংবা ক্ষমতার আশেপাশে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, জঙ্গি দমনে এই সরকার কতটা আন্তরিক হতে পারে? যে সরকারের অন্যতম স্তম্ভই জঙ্গিবাদের আদর্শগত ঘনিষ্ঠ, সে সরকার কি সত্যি সত্যি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে, নাকি নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ বাঁচাতে জঙ্গি ইস্যুকে চেপে রাখবে? উত্তরটা বাস্তবতায় স্পষ্ট। একদিকে বলা হচ্ছে জঙ্গি নেই, অন্যদিকে সারা দেশে বোমা উদ্ধার হচ্ছে, জঙ্গি ধরা পড়ছে, গোয়েন্দারা সতর্ক করছে। এর চেয়ে বড় অসংগতি আর কী হতে পারে।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান বলছেন, জামিনে বের হওয়াদের মনিটরিং করা হচ্ছে। কিন্তু মনিটরিং করার অর্থ যদি হয় খাতায় নাম লেখা, তাহলে তাতে জঙ্গি দমন হবে না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জামিনে বের হওয়া ইকরামুল হক উধাও, বোমারু মামুন ফের নেটওয়ার্কে সক্রিয়, জেল পালানো সাতাশ জনের কোনো হদিস নেই। এই অবস্থায় মনিটরিংয়ের দাবি করাটা নিছক জনসংযোগ ছাড়া কিছু না।

জঙ্গি দমনের জন্য শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট না, দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দরকার এমন একটা পরিবেশ যেখানে উগ্রবাদী আদর্শ প্রশ্রয় পাবে না, মদদ পাবে না। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা হচ্ছে। ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে এখন রাষ্ট্রের চক্ষুশূল হওয়া। কালো পতাকা মিছিল হয়, খেলাফতের দাবি তোলা হয়, অথচ ব্যবস্থা নেওয়া হয় বেছে বেছে। যে উগ্রবাদ সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থে লাগে, তাকে দেখতে হয় কড়া চোখে; আবার যে উগ্রবাদ ক্ষমতার ভিতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না, তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই দ্বৈতনীতিই জঙ্গিবাদকে বাঁচিয়ে রাখার প্রধান কারণ।

তাহলে প্রশ্নের উত্তর কী দাঁড়ায়? হ্যাঁ, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। আর সেটা এখন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সেই মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। কারাগার থেকে বের হওয়া জঙ্গিরা হারিয়ে যায়নি, তারা সংগঠিত হচ্ছে। একিউআইএস ঢোকার চেষ্টা করছে। নব্য জেএমবি ছোট ছোট সেলে ভাগ হয়ে সক্রিয়। বোমার সরঞ্জাম উদ্ধার, মাদ্রাসা-আস্তানায় বিস্ফোরণ, জেল পালানো, সব মিলিয়ে প্যাটার্নটা স্পষ্ট। এখন যদি রাষ্ট্র আবার সেই ২০০১-০৬ সালের পুরনো অস্বীকারের রাজনীতি ধরে রাখে, তাহলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।

বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা আবার শুরু হয়েছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আগে দেখতে হবে রাষ্ট্র নিজে এই ইস্যুতে কতটা সৎ আর কতটা দায়িত্বশীল। কারণ এখানে সমস্যা শুধু জঙ্গিদের নিয়ে না, সমস্যা হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের অস্বীকার করার রাজনীতি আর হিসাব গোপন করার সংস্কৃতি নিয়ে। অথচ চারপাশে যে সব ঘটনা ঘটছে তাতে চোখ বন্ধ করে থাকা মানে আগুনের ওপর চাদর টেনে ঘুমানোর চেষ্টা করা।

প্রথমেই হিসাবটা মেলানো দরকার। কারা কর্তৃপক্ষের নিজেদের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিন শত আটত্রিশ জন জঙ্গি সংশ্লিষ্ট আসামি জামিনে বেরিয়ে গেছে। জেল ভেঙে পালানো তিন জঙ্গি নেতা এখনো অধরা। নরসিংদী কারাগার থেকে একলাফে সাতাশ জন জঙ্গি পালিয়েছে, তাদের কাউকে ধরা যায়নি।

অথচ রাষ্ট্রের উচ্চমহল থেকে শোনা যায় জঙ্গি বলে কিছু নেই, যারা পালিয়েছে তাদেরও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু খোঁজ নেওয়া আর ধরতে পারার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ফারাক, সেটা কেউ স্বীকার করতে চায় না। কারা মহাপরিদর্শক নিজেই বলেছেন, নরসিংদী কারাগারের নথি পুড়ে যাওয়ায় এক শত ছেষট্টি জনের পরিচয়ই নিশ্চিত করা যায়নি। তার মানে কারা পালিয়েছে তা-ই রাষ্ট্র জানে না, আবার দাবি করে সব নিয়ন্ত্রণে আছে।

এবার আসা যাক জামিনে বের হওয়া মানুষগুলোর অবস্থানে। আল কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএসের সঙ্গে যুক্ত ইকরামুল হক ২০২৪ সালের অক্টোবরে জামিনে বের হওয়ার পর থেকে কার্যত উধাও। অথচ এই মানুষটা ভারতে দশটা মামলার আসামি, প্রযুক্তিতে দক্ষ, অনলাইনে দাওয়াহ ক্লাস নিতেন। তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর রাষ্ট্রের কাছে তার বর্তমান অবস্থানের কোনো তথ্য নেই। একই চিত্র বোমারু মামুনের ক্ষেত্রে। যে মানুষটার তৈরি বোমা পান্থপথের হোটেল ওলিওতে বিস্ফোরিত হয়েছিল, সে জামিনে বেরিয়ে এখন নব্য জেএমবির নেটওয়ার্কে সক্রিয় বলে পুলিশেরই দাবি। সাভার, আশুলিয়া, কেরাণীগঞ্জ, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, কুমিল্লা, সব জায়গায় বোমা উদ্ধারের ঘটনার সঙ্গে তার বা তার সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলছে। প্রশ্ন হলো, যার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, তাকে জামিন দেওয়া হলো কোন বিচারে? আদালত হয়তো আইনি প্রক্রিয়ায় খালাস দিয়েছে, কিন্তু গোয়েন্দাদের কাছ থেকে প্রতিদিন যে তথ্য আসছে তাতে এই খালাসকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যায় কতটা নড়বড়ে ছিল।

সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং টিমের ওই প্রতিবেদন। সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে, একিউআইএস আর আগের মতো বড় সংগঠন নেই, বরং ছোট ছোট সেলে বিভক্ত হয়ে বিকেন্দ্রীভূতভাবে কাজ করছে। নিজেদের লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক তারা নিজেরাই গড়ে তুলছে। আর বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তারা এখানে শাখা গড়ার চেষ্টা করছে। এই তথ্য যখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নজরদারি থেকে আসছে, তখন ঢাকার কোনো কর্মকর্তা যদি বলেন ওটা অনুমাননির্ভর, তাহলে সেটা বোকার মতো নিজের চোখ বন্ধ করে রাখা। কারণ ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লায় হামলার দায় একিউআইএস নিয়েছিল, এটা তো আর ঢালিউড সিনেমার গল্প না। প্রতিবেশী দেশে হামলা চালানো একটা সংগঠন যখন বাংলাদেশের ভেতরে পা রাখার চেষ্টা করে, তখন তাকে অস্বীকার করার মানে হয় না।

এখন প্রশ্ন হলো এই জঙ্গি তৎপরতার পেছনে কি কেবল আদর্শিক টান, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা। ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সময় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগ নিয়েছে জঙ্গিরা। জেল ভেঙেছে, পালিয়েছে, আবার কেউ জামিন পেয়েছে। কিন্তু এই সুযোগটা তারা পেল কেন? কারণ তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল মাথাহীন, নেতৃত্বহীন, আর রাষ্ট্র ছিল দিশেহারা। সেই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গিরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আজ যখন আবার কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থা এসেছে, তখন দেখা যাচ্ছে তাদের সেই নেটওয়ার্ক আগের চেয়ে বেশি ছড়িয়ে গেছে।

আরেকটা দিক হলো রাজনৈতিক উগ্রবাদ আর ধর্মীয় উগ্রবাদের সখ্যতা। যে শক্তি আজ ক্ষমতায়, তাদের অতীতেই আছে জামায়াতের সঙ্গে সখ্যের ইতিহাস। ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামী আর তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির অতীতে জঙ্গিবাদকে উসকে দিয়েছে, মদদ দিয়েছে। সেই জামায়াত আজ সরকারের শরিক কিংবা ক্ষমতার আশেপাশে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, জঙ্গি দমনে এই সরকার কতটা আন্তরিক হতে পারে? যে সরকারের অন্যতম স্তম্ভই জঙ্গিবাদের আদর্শগত ঘনিষ্ঠ, সে সরকার কি সত্যি সত্যি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে, নাকি নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ বাঁচাতে জঙ্গি ইস্যুকে চেপে রাখবে? উত্তরটা বাস্তবতায় স্পষ্ট। একদিকে বলা হচ্ছে জঙ্গি নেই, অন্যদিকে সারা দেশে বোমা উদ্ধার হচ্ছে, জঙ্গি ধরা পড়ছে, গোয়েন্দারা সতর্ক করছে। এর চেয়ে বড় অসংগতি আর কী হতে পারে।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান বলছেন, জামিনে বের হওয়াদের মনিটরিং করা হচ্ছে। কিন্তু মনিটরিং করার অর্থ যদি হয় খাতায় নাম লেখা, তাহলে তাতে জঙ্গি দমন হবে না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জামিনে বের হওয়া ইকরামুল হক উধাও, বোমারু মামুন ফের নেটওয়ার্কে সক্রিয়, জেল পালানো সাতাশ জনের কোনো হদিস নেই। এই অবস্থায় মনিটরিংয়ের দাবি করাটা নিছক জনসংযোগ ছাড়া কিছু না।

জঙ্গি দমনের জন্য শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট না, দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দরকার এমন একটা পরিবেশ যেখানে উগ্রবাদী আদর্শ প্রশ্রয় পাবে না, মদদ পাবে না। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা হচ্ছে। ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে এখন রাষ্ট্রের চক্ষুশূল হওয়া। কালো পতাকা মিছিল হয়, খেলাফতের দাবি তোলা হয়, অথচ ব্যবস্থা নেওয়া হয় বেছে বেছে। যে উগ্রবাদ সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থে লাগে, তাকে দেখতে হয় কড়া চোখে; আবার যে উগ্রবাদ ক্ষমতার ভিতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না, তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই দ্বৈতনীতিই জঙ্গিবাদকে বাঁচিয়ে রাখার প্রধান কারণ।

তাহলে প্রশ্নের উত্তর কী দাঁড়ায়? হ্যাঁ, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। আর সেটা এখন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সেই মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। কারাগার থেকে বের হওয়া জঙ্গিরা হারিয়ে যায়নি, তারা সংগঠিত হচ্ছে। একিউআইএস ঢোকার চেষ্টা করছে। নব্য জেএমবি ছোট ছোট সেলে ভাগ হয়ে সক্রিয়। বোমার সরঞ্জাম উদ্ধার, মাদ্রাসা-আস্তানায় বিস্ফোরণ, জেল পালানো, সব মিলিয়ে প্যাটার্নটা স্পষ্ট। এখন যদি রাষ্ট্র আবার সেই ২০০১-০৬ সালের পুরনো অস্বীকারের রাজনীতি ধরে রাখে, তাহলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ