ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ এলাকার ২০ লাখ বাসিন্দার দুর্ভোগকে পুঁজি করে মেগা প্রকল্পের নামে হাজার কোটি টাকার সরকারি অর্থ লুটপাট এবং খাল পুনর্দখলের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ষাটের দশকে কৃষি সেচের উদ্দেশ্যে নির্মিত এই ডিএনডি এলাকা বর্তমানে জনবহুল শহর ও শিল্পাঞ্চলে পরিণত হলেও, পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে এটি এক বিষাক্ত কৃত্রিম জলাশয়ে রূপ নিয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনআমলে বাংলাদেশকে টানা দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করার যে অপকীর্তি বিএনপি গড়েছিল, বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তাদের ছায়াতলে সেই পুরোনো ঐতিহ্য ও লুটপাটের সংস্কৃতিই নতুন করে ফিরে এসেছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রায়েরবাগ থেকে সাদ্দাম মার্কেট পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন ১০০-১২০ ফুট প্রশস্ত খালকে সংকুচিত করে মাত্র ১০-১২ ফুটে নামিয়ে আনার কুখ্যাত অধ্যায়টি শুরু হয়েছিল বিএনপির তৎকালীন শাসনামলেই। সেখানে ডজনখানেক পেট্রোল ও সিএনজি পাম্প দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের নামে বেআইনিভাবে বরাদ্দ দিয়ে খালের স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। সম্প্রতি বিগত সরকারের সংস্কার ও উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করা খালগুলো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে বিএনপি ও তার সহযোগীরা পুনরায় বেপরোয়াভাবে দখল করে নিয়েছে। খালের মুখে বাঁধ দিয়ে বাঁশ ও পাকা স্থাপনা তৈরি, ফিলিং স্টেশন নির্মাণ কিংবা ভুয়া রিয়েল এস্টেট ব্যবসার নামে মাছ চাষের মতো অপকর্ম চালিয়ে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
১৩৯ কোটি টাকা থেকে শুরু করে ১,৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত দফায় দফায় বাজেট বাড়ানো হলেও, সেই অর্থের সিংহভাগই চলে গেছে দলীয় নেতাকর্মী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পকেটে। এর ফলে খালের উদ্ধার বা সংস্কারে আউটপুট এসেছে শূন্য। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো ডিএনডি এলাকা নদী রূপ নেয় এবং বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট মাসের পর মাস বিষাক্ত পচা পানিতে ডুবে থাকে। ফলে ডেঙ্গু, চর্মরোগসহ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
নগর বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের মতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে যেভাবে দলীয় ক্যাডাররা খালের মুখ পলিথিন ও বর্জ্য দিয়ে ভরাট করে ফেলছে, তাতে শত শত পাম্প হাউস বসিয়েও এই জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার তকমা গায়ে লাগানো রাজনৈতিক গোষ্ঠী যখনই সুযোগ পায়, তখনই রাষ্ট্রের সম্পদকে নিজেদের ব্যক্তিগত পকেট ভরার হাতিয়ারে পরিণত করে—যার জ্বলন্ত প্রমাণ ডিএনডির এই করুণ দশা। মেগা প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট করে ২০ লাখ মানুষকে চরম অভিশাপের মুখে ঠেলে দেওয়ার এই ধারাবাহিক লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এখনই কঠোর বিচার ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

