এ দেশে বিতর্কিত নির্বাচনের জনক জিয়াউর রহমান

এম নজরুল ইসলাম
ভণ্ডরা নিজেদের ভণ্ডামি ঢাকতে ভালো ভালো কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে বা করতে চায়। গণতন্ত্রের ‘গ’ নাই যাদের মধ্যে তারাই গণতন্ত্রের জন্য গলা ফাটায়। আর এ কারণেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিয়ে মায়াকান্নার অভাব নাই। বিভ্রান্তি ছড়ানোর অন্ত নাই। বন্দুকের নল যাদের ক্ষমতার উৎস, গণতন্ত্রের জন্য তাদেরই মায়াকান্না দেখা যায় সবচেয়ে বেশি। যারা গণতন্ত্র হত্যা করেছে, তারাই নিজেদের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলে দাবি করে।

আর নিকট অতীতে সুশীল নামধারী কিছু ব্যক্তি গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না নয়, রীতিমতো মরা-কান্না জুড়ে দিয়েছিল। গত দুই বছরে দেশের মানুষ তাদের ভন্ডামি দেখেছে। তাদের আসল চেহারা দেখেছে। হতাশ হয়ে তারা আজ প্রশ্ন করছে, কোথায় গণতন্ত্র? কোথায় আইনের শাসন? কোথায় মানবাধিকার? সব কিছু দেখে শুনে কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই কথাগুলোই বারবার মনে পড়ে:

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নেই- করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’

আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে বিএনপি অনেক মিথ্যাচার করেছে। বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি বিএনপি। অংশ নেয়নি উপজেলা নির্বাচনেও। বরং উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপি নেতারা বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না দলটি। কেন? বিএনপির আমলে যেসব নির্বাচন হয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে কোনো নির্বাচন কি তার চেয়ে খারাপ ছিল। ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলেই সেই প্রশ্নের জবাব মিলবে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে কারা কলুষিত করেছে? কিভাবে করেছে? একটু পেছনে তাকানো যাক। স্পষ্ট করেই দেখা যাবে, বাংলাদেশে কারা, কখন, কিভাবে নির্বাচনকে বিতর্কিত করেছে। কারা গণতন্ত্র হত্যা করেছে। কারা মানবাধিকারকে ভুলুণ্ঠিত করেছে। কারা নির্বাচনে হেরে যাবে বলে নির্বাচন বর্জন করেছে।

বাংলাদেশে সব সময় নির্বাচন বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করেছে বিএনপি। নির্বাচনে ভোট কারচুপি থেকে শুরু করে সব অনিয়মের জন্মদাতা বিএনপি। কারচুপি করে নির্বাচনে জেতার জন্য সোয়া কোটি ভুয়া ভোটার বানিয়েছিল বিএনপি। বার্তা সংস্থা বিবিসি ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের মুখে যে কয়েকটি একতরফা ও বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই তালিকায় রয়েছে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।’

১৯৯৬ সালের ওই নির্বাচন নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের পাঁচ কোটি ভোটারের মধ্যে বেশির ভাগই ভোট দেননি।’ নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার ১০ শতাংশের কম হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদনে। এর আগে আরো একটি নির্বাচন আছে। সেটি হচ্ছে, ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ, মাগুরা উপনির্বাচন। কারচুপি ও জালিয়াতির নিকৃষ্টতম উদাহরণ ছিল সেই উপনির্বাচন।

আরো একটু পেছনে তাকানো যাক। গণতন্ত্র হত্যাসহ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সব রকমভাবে দূষিত করেছেন যে ব্যক্তি, তাঁর নাম জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান নিজের সমর্থন বাড়াতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতিতে বৈধতা দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এমন ব্যক্তিদের জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মন্ত্রী বানানো হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। একই ধারা অব্যাহত ছিল বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। সেদিন অদ্ভুত এক নির্বাচন প্রত্যক্ষ করে বাংলাদেশের মানুষ। দেশের রাষ্ট্রপতির প্রতি আস্থা ভোট বা গণভোট নামের একটি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই ভোটে ভোটারদের কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি কি রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের (বীর-উত্তম) প্রতি এবং তাঁর দ্বারা গৃহীত নীতি ও কার্যক্রমের প্রতি আস্থাশীল? ভোটের ফলাফলে দেখানো হয় ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’। মোট ভোট প্রদানের হার দেখানো হয় ৮৮.১ শতাংশ।

দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এই ভোটকে বলা হয়ে থাকে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। এই ‘হ্যাঁ-না’ ভোট নিয়ে আমার এক বন্ধুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা এখানে তুলে ধরি। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক ও সাংবাদিক। তিনি তাঁর ১৩ জন বন্ধুকে নিয়ে সেদিন গিয়েছিলেন ভোট দিতে। গিয়ে দেখেন ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। তাঁরা ভোটকেন্দ্রে হৈচৈ শুরু করে দেন। তখন তাঁদের প্রত্যেককে একটি করে ব্যালট পেপার দেওয়া হয়। তাঁরা ধরে নিলেন ওই কেন্দ্রে অন্তত ১৩টি ‘না’ ভোট তো নিশ্চিত। সন্ধ্যায় তাঁরা জানতে পারলেন, ওই কেন্দ্রে মোট ‘না’ ভোট পড়েছে মাত্র তিনটি। জিয়াউর রহমানের ‘হ্যাঁ-না’ ভোট বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে লজ্জাজনকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। এরপরও কি তাদের মুখে গণতন্ত্র বা নির্বাচন নিয়ে কথা বলা শোভা পায়?

আরো একটু পেছনে তাকাই। বন্দুকের নলের মুখে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল। জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজেই এক সামরিক ফরমান জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেছিলেন। আবার নিজেই আরেক ফরমান জারি করে ঘোষণা দেন তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য তাঁকে ভোট দেওয়ার প্রয়োজনই পড়েনি। তাঁর ইচ্ছা হয়েছে, তিনি চেয়ার দখল করেছেন।

একসময় তাঁর মনে হয়েছে, বিষয়টা হালাল করা দরকার। তিনি ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দেন। নিজেকে দেওয়া নিজের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ বৈধ করার জন্যই এই গণভোট বা আস্থা ভোটের আয়োজন। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায়, অথবা বলা যায়, সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থায় সবচেয়ে কলঙ্কজনক দুষ্ট ক্ষতের জন্ম দিয়েছিলেন তো তাদেরই নেতা জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭ সালের ৩০ মের গণভোট বা ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের চেয়ে বড় প্রহসন আর কি হতে পারে! কী আশ্চর্য, একদল বিদ্রোহী সেনা সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমানের নিহত হওয়ার দিনটিও ৩০ মে।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক।

এম নজরুল ইসলাম
ভণ্ডরা নিজেদের ভণ্ডামি ঢাকতে ভালো ভালো কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে বা করতে চায়। গণতন্ত্রের ‘গ’ নাই যাদের মধ্যে তারাই গণতন্ত্রের জন্য গলা ফাটায়। আর এ কারণেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিয়ে মায়াকান্নার অভাব নাই। বিভ্রান্তি ছড়ানোর অন্ত নাই। বন্দুকের নল যাদের ক্ষমতার উৎস, গণতন্ত্রের জন্য তাদেরই মায়াকান্না দেখা যায় সবচেয়ে বেশি। যারা গণতন্ত্র হত্যা করেছে, তারাই নিজেদের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলে দাবি করে।

আর নিকট অতীতে সুশীল নামধারী কিছু ব্যক্তি গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না নয়, রীতিমতো মরা-কান্না জুড়ে দিয়েছিল। গত দুই বছরে দেশের মানুষ তাদের ভন্ডামি দেখেছে। তাদের আসল চেহারা দেখেছে। হতাশ হয়ে তারা আজ প্রশ্ন করছে, কোথায় গণতন্ত্র? কোথায় আইনের শাসন? কোথায় মানবাধিকার? সব কিছু দেখে শুনে কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই কথাগুলোই বারবার মনে পড়ে:

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নেই- করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’

আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে বিএনপি অনেক মিথ্যাচার করেছে। বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি বিএনপি। অংশ নেয়নি উপজেলা নির্বাচনেও। বরং উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপি নেতারা বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না দলটি। কেন? বিএনপির আমলে যেসব নির্বাচন হয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে কোনো নির্বাচন কি তার চেয়ে খারাপ ছিল। ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলেই সেই প্রশ্নের জবাব মিলবে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে কারা কলুষিত করেছে? কিভাবে করেছে? একটু পেছনে তাকানো যাক। স্পষ্ট করেই দেখা যাবে, বাংলাদেশে কারা, কখন, কিভাবে নির্বাচনকে বিতর্কিত করেছে। কারা গণতন্ত্র হত্যা করেছে। কারা মানবাধিকারকে ভুলুণ্ঠিত করেছে। কারা নির্বাচনে হেরে যাবে বলে নির্বাচন বর্জন করেছে।

বাংলাদেশে সব সময় নির্বাচন বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করেছে বিএনপি। নির্বাচনে ভোট কারচুপি থেকে শুরু করে সব অনিয়মের জন্মদাতা বিএনপি। কারচুপি করে নির্বাচনে জেতার জন্য সোয়া কোটি ভুয়া ভোটার বানিয়েছিল বিএনপি। বার্তা সংস্থা বিবিসি ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের মুখে যে কয়েকটি একতরফা ও বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই তালিকায় রয়েছে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।’

১৯৯৬ সালের ওই নির্বাচন নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের পাঁচ কোটি ভোটারের মধ্যে বেশির ভাগই ভোট দেননি।’ নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার ১০ শতাংশের কম হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদনে। এর আগে আরো একটি নির্বাচন আছে। সেটি হচ্ছে, ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ, মাগুরা উপনির্বাচন। কারচুপি ও জালিয়াতির নিকৃষ্টতম উদাহরণ ছিল সেই উপনির্বাচন।

আরো একটু পেছনে তাকানো যাক। গণতন্ত্র হত্যাসহ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সব রকমভাবে দূষিত করেছেন যে ব্যক্তি, তাঁর নাম জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান নিজের সমর্থন বাড়াতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতিতে বৈধতা দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এমন ব্যক্তিদের জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মন্ত্রী বানানো হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। একই ধারা অব্যাহত ছিল বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। সেদিন অদ্ভুত এক নির্বাচন প্রত্যক্ষ করে বাংলাদেশের মানুষ। দেশের রাষ্ট্রপতির প্রতি আস্থা ভোট বা গণভোট নামের একটি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই ভোটে ভোটারদের কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি কি রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের (বীর-উত্তম) প্রতি এবং তাঁর দ্বারা গৃহীত নীতি ও কার্যক্রমের প্রতি আস্থাশীল? ভোটের ফলাফলে দেখানো হয় ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’। মোট ভোট প্রদানের হার দেখানো হয় ৮৮.১ শতাংশ।

দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এই ভোটকে বলা হয়ে থাকে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। এই ‘হ্যাঁ-না’ ভোট নিয়ে আমার এক বন্ধুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা এখানে তুলে ধরি। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক ও সাংবাদিক। তিনি তাঁর ১৩ জন বন্ধুকে নিয়ে সেদিন গিয়েছিলেন ভোট দিতে। গিয়ে দেখেন ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। তাঁরা ভোটকেন্দ্রে হৈচৈ শুরু করে দেন। তখন তাঁদের প্রত্যেককে একটি করে ব্যালট পেপার দেওয়া হয়। তাঁরা ধরে নিলেন ওই কেন্দ্রে অন্তত ১৩টি ‘না’ ভোট তো নিশ্চিত। সন্ধ্যায় তাঁরা জানতে পারলেন, ওই কেন্দ্রে মোট ‘না’ ভোট পড়েছে মাত্র তিনটি। জিয়াউর রহমানের ‘হ্যাঁ-না’ ভোট বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে লজ্জাজনকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। এরপরও কি তাদের মুখে গণতন্ত্র বা নির্বাচন নিয়ে কথা বলা শোভা পায়?

আরো একটু পেছনে তাকাই। বন্দুকের নলের মুখে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল। জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজেই এক সামরিক ফরমান জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেছিলেন। আবার নিজেই আরেক ফরমান জারি করে ঘোষণা দেন তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য তাঁকে ভোট দেওয়ার প্রয়োজনই পড়েনি। তাঁর ইচ্ছা হয়েছে, তিনি চেয়ার দখল করেছেন।

একসময় তাঁর মনে হয়েছে, বিষয়টা হালাল করা দরকার। তিনি ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দেন। নিজেকে দেওয়া নিজের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ বৈধ করার জন্যই এই গণভোট বা আস্থা ভোটের আয়োজন। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায়, অথবা বলা যায়, সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থায় সবচেয়ে কলঙ্কজনক দুষ্ট ক্ষতের জন্ম দিয়েছিলেন তো তাদেরই নেতা জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭ সালের ৩০ মের গণভোট বা ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের চেয়ে বড় প্রহসন আর কি হতে পারে! কী আশ্চর্য, একদল বিদ্রোহী সেনা সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমানের নিহত হওয়ার দিনটিও ৩০ মে।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ