বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প যতই উচ্চস্বরে প্রচার করা হোক, বাস্তবতা বারবার নির্মমভাবে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল রিপোর্ট ২০২৬’ সেই মুখোশ ছিঁড়ে দিয়েছে। মূলত নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে আইনি ও নীতিগত বাধা গুলো চিহ্নিত করে রাষ্ট্র ও সরকারকে সয়াহতা করতে এটি প্রকাশ করা হয়। যেখানে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নেমে গেছে ১৭৯তম স্থানে—যা ২০২৪ সালে ছিল ১৭৬ এবং ২০২২ সালে ১৭৩। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়া এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক ফলাফল।
আরও লজ্জাজনক হলো—দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান কেবল আফগানিস্তানের ওপরে। যে অঞ্চলে ভারত ১২৯তম, নেপাল ১৩০তম, ভুটান ১৩৯, শ্রীলংকা ১৫৯, পাকিস্তান ১৬৩—সেখানে বাংলাদেশ ১৭৯। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার স্পষ্ট চার্জশিট। তবে এই চিত্র সবসময় এমন ছিল না। বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল—যা আজকের পতনকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণের হার ২০০৯ সালের প্রায় ২৬-২৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯-২০ সালে প্রায় ৩৬-৩৭ শতাংশে পৌঁছায়। তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশের বেশি ছিল, যা দেশের রপ্তানি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মাইক্রোক্রেডিট, ডিজিটাল ফিন্যান্স এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে বহু নারী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অগ্রগতি কেন স্থায়ী হলো না? কেন সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আরও এগোনোর বদলে বাংলাদেশ এখন পিছিয়ে পড়ছে?
প্রথমত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই যে নীতিগত স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা আজও কাটেনি। নারী অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে যে আইনি কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন—এই তিন সূচকেই বাংলাদেশ পিছিয়েছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, পরিকল্পনাহীনতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রশাসনিক সংস্কৃতির ফল।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কথিত উন্নয়ন-রাজনীতি বাস্তবে কতটা অন্তঃসারশূন্য, এই রিপোর্ট তার প্রমাণ। সরকারের ভাষণে নারী ক্ষমতায়ন যতই জোরালো হোক, বাস্তবে আইনি কাঠামোর স্কোর মাত্র ৩৪.৩৮, সহায়ক কাঠামোতে ৩৪.৭৩, আর আইন প্রয়োগে নেমে এসেছে ২৭.৯২-এ। অর্থাৎ আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই—এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।
তৃতীয়ত, অর্থনীতির মূলধারায় নারীদের প্রবেশের পথে যে বাধাগুলো বারবার চিহ্নিত হচ্ছে—ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সীমাবদ্ধতা, জামানতের অভাব, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, যৌন হয়রানি, সাইবার সহিংসতা—এসব বিষয়ে সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। বরং এসব সমস্যাকে অস্বীকার বা ছোট করে দেখার প্রবণতাই বেশি।
সরকারের তথাকথিত “ফ্যামিলি কার্ড” বা ক্ষুদ্র উদ্যোগভিত্তিক পরিকল্পনা দিয়ে এই গভীর কাঠামোগত সংকট সমাধান সম্ভব—এমন ভাবনা একধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। কারণ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন কোনো দান বা সহানুভূতির বিষয় নয়; এটি একটি কাঠামোগত অধিকার, যা নিশ্চিত করতে হয় শক্তিশালী নীতি, আইনের প্রয়োগ এবং নিরাপদ পরিবেশের মাধ্যমে।
বিশ্বব্যাংক স্পষ্টভাবে বলছে—শ্রমবাজারে লিঙ্গ বৈষম্য কমাতে পারলে জিডিপি ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থাৎ নারীদের বাদ দিয়ে উন্নয়নের যে গল্প বলা হচ্ছে, সেটি শুধু অন্যায্য নয়, অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই রাষ্ট্র এখনো নারীদের শ্রমকে মূল্য দেয় না, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজ করে না। ফলে নারীরা তৈরি পোশাক শিল্প, ই-কমার্স বা কৃষিতে যুক্ত থাকলেও মূল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে তারা বহিষ্কৃতই থেকে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ব্যর্থতার দায় কেউ নিচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার দায় এড়িয়ে গেছে “সংক্রমণকালীন সীমাবদ্ধতা” দেখিয়ে, আর বর্তমান সরকার ব্যস্ত উন্নয়নের প্রচারণায়। কিন্তু পরিসংখ্যান মিথ্যা বলে না—বাংলাদেশ পিছিয়েছে, এবং সেটি ধারাবাহিকভাবে।
অথচ একসময় এই দেশই দেখিয়েছিল—সঠিক নীতি ও উদ্যোগ থাকলে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু সেই অগ্রগতিকে টেকসই রূপ না দিয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি না গড়ে, আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত না করে—রাষ্ট্র আজ আবার পেছনের দিকেই হাঁটছে।
এই বাস্তবতায় একটাই প্রশ্ন সামনে আসে—নারী উন্নয়নের গল্প কি শুধুই রাজনৈতিক বক্তৃতার অলঙ্কার, নাকি রাষ্ট্র সত্যিই পরিবর্তন চায়? যদি পরিবর্তন চায়, তাহলে এখনই প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, আর নারীদের জন্য বাস্তব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করা। অন্যথায়, আগামী রিপোর্টে হয়তো বাংলাদেশ আফগানিস্তানের সঙ্গেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না এবং তখন আর কোনো প্রচারণা এই ব্যর্থতা ঢাকতে পারবে না।

