জামায়াতের ইশারায় ট্রিগার টানা সেই ক্রসফায়ারের কারিগর আজ মানবাধিকারের ধ্বজাধারী!

২০২৬ সালে এসে আমরা এমন এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি যেখানে গুম, খুন আর ক্রসফায়ারের কারিগর নিজেই এখন মানবাধিকারের মশাল হাতে মিছিলের সামনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল বরখাস্ত হাসিনুর রহমানের মুখোশটা আজ আর কারো কাছেই অজানা নয়। অথচ এই মানুষটিই একসময় চট্টগ্রামের র‍্যাব ৭ এর নেতৃত্বে বসে পুরো একটি অঞ্চলকে মৃত্যুভয়ে কাঁপিয়ে তুলেছিলেন। ২০০৪ থেকে ২০০৬ এই তিন বছর ছিল তার হাতে ক্ষমতার অপব্যবহারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। পাহাড়ে নিরস্ত্র বেসামরিক পাহাড়িদের গণহারে হত্যা-ধর্ষণ-লুটের “সাহসিকতার” স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া বীর প্রতীক পদকটিই তার কাছে পরিণত হয়েছিল খুনের বৈধ ছাড়পত্রে।

যে চট্টগ্রাম শহরের অলিগলি আজও সেসব রক্তমাখা রাতের স্মৃতি বহন করে, সেখানে হাসিনুর রহমান নামটা শুনলেই আঁতকে ওঠে অসংখ্য পরিবার। মানুষের ঘরে ঘরে তার নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণায়, বুকের ভেতর চাপা কান্নায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নথি খুললেই দেখা যায়, শুধুমাত্র র‍্যাব ৭ এর অধীনে সেই সময়ে সাতান্নটি ক্রসফায়ার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। দেশের মোট র‍্যাব হত্যাকাণ্ডের সাড়ে পনেরো শতাংশ ঘটেছিল এক চট্টগ্রামেই। একজন সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে এতগুলো মানুষ বিচার ছাড়াই প্রাণ হারিয়েছেন, অথচ আজও তিনি রাস্তায় হাঁটেন, বক্তৃতা দেন, নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করেন। এটাই এই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

সেপ্টেম্বর ২০০৪ এর সেই রাতের কথা কেউ ভুলতে পারেনি। থানা সংলগ্ন এলাকায় দশজনকে একসাথে মেরে ফেলা হয়েছিল। তার দুদিন পর আহমদুল হক চৌধুরী আর তার দেহরক্ষী মিনহাজকে গ্রেপ্তারের পরদিন ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়। পরিবারের মানুষের কাছে আজও এটা পরিষ্কার যে এগুলো কখনোই বন্দুকযুদ্ধ ছিল না। এগুলো ছিল ঠান্ডা মাথার খুন। ২৮ নভেম্বর ছাত্রলীগ নেতা মহিমুদ্দিন মহিম দুবাই থেকে দেশে ফিরে বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ওই রাতেই নিহত হন। মাত্র দুই দিন পর ছাত্রদল নেতা ইকবাল বাহার চৌধুরীকেও একই কায়দায় শেষ করে দেওয়া হয়। এই ধারাবাহিকতাটা দেখলেই বোঝা যায়, হাসিনুর রহমানের নেতৃত্বে র‍্যাব ৭ যেন মৃত্যুর একটা ফ্যাক্টরিতে পরিণত হয়েছিল যেখানে কোনো বিচার প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতো না, শুধু ট্রিগার টানলেই হতো।

সবচেয়ে ভয়ংকর যে বিষয়টি উঠে এসেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে, তা হলো এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে ছিল সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব। বিএনপি আর আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকদের টার্গেট করা হলেও জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যত ছাড় দেওয়া হতো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে সরাসরি উল্লেখ করেছে যে চট্টগ্রামের স্থানীয় সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা তাদের জানিয়েছেন র‍্যাব ৭ এর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আহমদুল হক চৌধুরীর পরিবারও নিশ্চিত করেছিলো যে জামায়াতের লোকেরাই র‍্যাবের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একটা অংশ তখন কার্যত একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল আর সেই হাতিয়ারের হাতলটা ছিল হাসিনুর রহমানের মুঠোয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি উপজাতিদের উপর দেখানো “সাহসিকতার” জন্য বীর প্রতীক পাওয়া সেই জলপাই যোদ্ধা যখন শহরের বুকে মানুষের ঘরে ঘরে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন তার পেছনে ছিল রাজনৈতিক অভিভাবকত্বের ছায়া। দেশবিরোধী তৎপরতা আর বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়ার পরও তার মুখের ভাষা বদলায়নি, বদলেছে শুধু পক্ষ। যে মানুষটা একসময় জামায়াতের ইশারায় র‍্যাবের ট্রিগার চালাতেন, সেই মানুষটাই এখন বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অভিনয় করেন। পাঁচাশি বছর পরেও এই কপটতার কোনো অন্ত নেই।

আসল সমস্যা হলো জবাবদিহিতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা যখন সাতান্নটা হত্যার তথ্য প্রমাণসহ তুলে ধরেছে, তখনো হাসিনুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক বিচার হয়নি। যে পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তারা আজও ন্যায়বিচারের জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। আদালতের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অথচ ঘাতক নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সমাজে মাথা উঁচু করে বেড়ায়। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই এদেশের সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের মূল উৎস। যতদিন না এই সংস্কৃতির মূলোৎপাটন হয়, ততদিন হাসিনুর রহমানের মতো মানুষ বারবার জন্ম নেবে, আবার কোনো না কোনো ছদ্মবেশে ফিরে আসবে।

চট্টগ্রামের মাটি আজও সেই সাতান্নটি পরিবারের আর্তনাদ বহন করে। প্রতিটা ক্রসফায়ারের পেছনে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো কেউ শোনে না, কেউ দেখে না। অথচ সেই গল্পগুলোর প্রতিটাতেই আছে একজন মানুষের শেষ নিঃশ্বাসের হাহাকার। আছে পরিবারের ভেঙে পড়ার শব্দ। হাসিনুর রহমান সেই সব শব্দ কানে তোলেন না। তিনি আজও নিজের কীর্তিকে গৌরবের সঙ্গে সাজিয়ে বেড়ান, আর সুযোগ পেলেই অন্যকে নৈতিকতার দাওয়াত দেন। এমন নির্মম বিদ্রূপ বোধহয় আর কোনো দেশে দেখা যায় না।

যে র‍্যাব ৭ এর হাতে চট্টগ্রামের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল, সেই র‍্যাব ৭ এর কমান্ডার যখন বরখাস্ত হন, তখনো তার মুখ থেকে কোনো অনুতাপের বাণী শোনা যায়নি। শোনা যায়নি কোনো পরিবারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা। বরং উল্টো পথে হেঁটে নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার খেলা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে হয়তো ভুলে যাবে, কিন্তু ইতিহাস কখনো এই সাতান্নটা হত্যাকে ভুলবে না। যে মানুষটা একই সাথে বীরত্বের পদক আর গণহত্যার কলঙ্ক বহন করে চলেছেন, তার জীবনের এই দুই বিপরীত মেরুর ভারসাম্য কোনোদিন সমান হওয়ার নয়।

হাসিনুর রহমানের গল্পটা আসলে একটা রাষ্ট্রযন্ত্রের গল্প, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার কোনো ব্যতিক্রম ছিল না, বরং ছিল নিয়ম। যে যন্ত্র মানুষের জানমাল রক্ষার কথা বলে, সেই যন্ত্রই যখন মানুষের ঘাড়ে বন্দুক ঠেকায়, তখন সমাজের পক্ষে ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের সেই রাতগুলোতে হাজারো মানুষ ঘুমাতে পারেনি। আজও অনেকে ঘুমাতে পারে না। কারণ স্বজন হারানোর ক্ষত কোনোদিন শুকায় না। সেই ক্ষতে লবন ছিটিয়ে দেওয়ার কাজটাই করেছেন হাসিনুর রহমান তার সারাজীবনের কর্মকাণ্ড দিয়ে। তার এই কুকীর্তির হিসাব কোনোদিন কোনো আদালতে হলেও হয়তো হবে, কিন্তু যে ক্ষতি তিনি করে গেছেন তা আর কোনো ক্ষতিপূরণে পূরণ হওয়ার নয়।

২০২৬ সালে এসে আমরা এমন এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি যেখানে গুম, খুন আর ক্রসফায়ারের কারিগর নিজেই এখন মানবাধিকারের মশাল হাতে মিছিলের সামনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল বরখাস্ত হাসিনুর রহমানের মুখোশটা আজ আর কারো কাছেই অজানা নয়। অথচ এই মানুষটিই একসময় চট্টগ্রামের র‍্যাব ৭ এর নেতৃত্বে বসে পুরো একটি অঞ্চলকে মৃত্যুভয়ে কাঁপিয়ে তুলেছিলেন। ২০০৪ থেকে ২০০৬ এই তিন বছর ছিল তার হাতে ক্ষমতার অপব্যবহারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। পাহাড়ে নিরস্ত্র বেসামরিক পাহাড়িদের গণহারে হত্যা-ধর্ষণ-লুটের “সাহসিকতার” স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া বীর প্রতীক পদকটিই তার কাছে পরিণত হয়েছিল খুনের বৈধ ছাড়পত্রে।

যে চট্টগ্রাম শহরের অলিগলি আজও সেসব রক্তমাখা রাতের স্মৃতি বহন করে, সেখানে হাসিনুর রহমান নামটা শুনলেই আঁতকে ওঠে অসংখ্য পরিবার। মানুষের ঘরে ঘরে তার নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণায়, বুকের ভেতর চাপা কান্নায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নথি খুললেই দেখা যায়, শুধুমাত্র র‍্যাব ৭ এর অধীনে সেই সময়ে সাতান্নটি ক্রসফায়ার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। দেশের মোট র‍্যাব হত্যাকাণ্ডের সাড়ে পনেরো শতাংশ ঘটেছিল এক চট্টগ্রামেই। একজন সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে এতগুলো মানুষ বিচার ছাড়াই প্রাণ হারিয়েছেন, অথচ আজও তিনি রাস্তায় হাঁটেন, বক্তৃতা দেন, নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করেন। এটাই এই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

সেপ্টেম্বর ২০০৪ এর সেই রাতের কথা কেউ ভুলতে পারেনি। থানা সংলগ্ন এলাকায় দশজনকে একসাথে মেরে ফেলা হয়েছিল। তার দুদিন পর আহমদুল হক চৌধুরী আর তার দেহরক্ষী মিনহাজকে গ্রেপ্তারের পরদিন ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়। পরিবারের মানুষের কাছে আজও এটা পরিষ্কার যে এগুলো কখনোই বন্দুকযুদ্ধ ছিল না। এগুলো ছিল ঠান্ডা মাথার খুন। ২৮ নভেম্বর ছাত্রলীগ নেতা মহিমুদ্দিন মহিম দুবাই থেকে দেশে ফিরে বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ওই রাতেই নিহত হন। মাত্র দুই দিন পর ছাত্রদল নেতা ইকবাল বাহার চৌধুরীকেও একই কায়দায় শেষ করে দেওয়া হয়। এই ধারাবাহিকতাটা দেখলেই বোঝা যায়, হাসিনুর রহমানের নেতৃত্বে র‍্যাব ৭ যেন মৃত্যুর একটা ফ্যাক্টরিতে পরিণত হয়েছিল যেখানে কোনো বিচার প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতো না, শুধু ট্রিগার টানলেই হতো।

সবচেয়ে ভয়ংকর যে বিষয়টি উঠে এসেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে, তা হলো এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে ছিল সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব। বিএনপি আর আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকদের টার্গেট করা হলেও জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যত ছাড় দেওয়া হতো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে সরাসরি উল্লেখ করেছে যে চট্টগ্রামের স্থানীয় সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা তাদের জানিয়েছেন র‍্যাব ৭ এর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আহমদুল হক চৌধুরীর পরিবারও নিশ্চিত করেছিলো যে জামায়াতের লোকেরাই র‍্যাবের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একটা অংশ তখন কার্যত একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল আর সেই হাতিয়ারের হাতলটা ছিল হাসিনুর রহমানের মুঠোয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি উপজাতিদের উপর দেখানো “সাহসিকতার” জন্য বীর প্রতীক পাওয়া সেই জলপাই যোদ্ধা যখন শহরের বুকে মানুষের ঘরে ঘরে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন তার পেছনে ছিল রাজনৈতিক অভিভাবকত্বের ছায়া। দেশবিরোধী তৎপরতা আর বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়ার পরও তার মুখের ভাষা বদলায়নি, বদলেছে শুধু পক্ষ। যে মানুষটা একসময় জামায়াতের ইশারায় র‍্যাবের ট্রিগার চালাতেন, সেই মানুষটাই এখন বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অভিনয় করেন। পাঁচাশি বছর পরেও এই কপটতার কোনো অন্ত নেই।

আসল সমস্যা হলো জবাবদিহিতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা যখন সাতান্নটা হত্যার তথ্য প্রমাণসহ তুলে ধরেছে, তখনো হাসিনুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক বিচার হয়নি। যে পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তারা আজও ন্যায়বিচারের জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। আদালতের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অথচ ঘাতক নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সমাজে মাথা উঁচু করে বেড়ায়। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই এদেশের সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের মূল উৎস। যতদিন না এই সংস্কৃতির মূলোৎপাটন হয়, ততদিন হাসিনুর রহমানের মতো মানুষ বারবার জন্ম নেবে, আবার কোনো না কোনো ছদ্মবেশে ফিরে আসবে।

চট্টগ্রামের মাটি আজও সেই সাতান্নটি পরিবারের আর্তনাদ বহন করে। প্রতিটা ক্রসফায়ারের পেছনে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো কেউ শোনে না, কেউ দেখে না। অথচ সেই গল্পগুলোর প্রতিটাতেই আছে একজন মানুষের শেষ নিঃশ্বাসের হাহাকার। আছে পরিবারের ভেঙে পড়ার শব্দ। হাসিনুর রহমান সেই সব শব্দ কানে তোলেন না। তিনি আজও নিজের কীর্তিকে গৌরবের সঙ্গে সাজিয়ে বেড়ান, আর সুযোগ পেলেই অন্যকে নৈতিকতার দাওয়াত দেন। এমন নির্মম বিদ্রূপ বোধহয় আর কোনো দেশে দেখা যায় না।

যে র‍্যাব ৭ এর হাতে চট্টগ্রামের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল, সেই র‍্যাব ৭ এর কমান্ডার যখন বরখাস্ত হন, তখনো তার মুখ থেকে কোনো অনুতাপের বাণী শোনা যায়নি। শোনা যায়নি কোনো পরিবারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা। বরং উল্টো পথে হেঁটে নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার খেলা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে হয়তো ভুলে যাবে, কিন্তু ইতিহাস কখনো এই সাতান্নটা হত্যাকে ভুলবে না। যে মানুষটা একই সাথে বীরত্বের পদক আর গণহত্যার কলঙ্ক বহন করে চলেছেন, তার জীবনের এই দুই বিপরীত মেরুর ভারসাম্য কোনোদিন সমান হওয়ার নয়।

হাসিনুর রহমানের গল্পটা আসলে একটা রাষ্ট্রযন্ত্রের গল্প, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার কোনো ব্যতিক্রম ছিল না, বরং ছিল নিয়ম। যে যন্ত্র মানুষের জানমাল রক্ষার কথা বলে, সেই যন্ত্রই যখন মানুষের ঘাড়ে বন্দুক ঠেকায়, তখন সমাজের পক্ষে ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের সেই রাতগুলোতে হাজারো মানুষ ঘুমাতে পারেনি। আজও অনেকে ঘুমাতে পারে না। কারণ স্বজন হারানোর ক্ষত কোনোদিন শুকায় না। সেই ক্ষতে লবন ছিটিয়ে দেওয়ার কাজটাই করেছেন হাসিনুর রহমান তার সারাজীবনের কর্মকাণ্ড দিয়ে। তার এই কুকীর্তির হিসাব কোনোদিন কোনো আদালতে হলেও হয়তো হবে, কিন্তু যে ক্ষতি তিনি করে গেছেন তা আর কোনো ক্ষতিপূরণে পূরণ হওয়ার নয়।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ