আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ঠিক আগের দিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৬টি গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার (২২ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত এই প্রজ্ঞাপনকে দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সাথে ‘জরুরি অবস্থার এক ঝলক’ এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সামরিক মহড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেছেন, একটি স্বাধীন দেশের জাতীয় বাহিনীকে আজ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে ১৯৭১-পূর্ববর্তী বর্বর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মতো দমন-পীড়নের নগ্ন প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-২ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক দেশের বিভিন্ন স্থানে বেআইনি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।’ এই অজুহাতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে ২২ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সেনাসদস্য মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগামীকাল ২৩ জুন আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দলটির বড় নেতারা বর্তমানে কারাগারে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করছেন কিংবা দেশের বাইরে আছেন। সাধারণ কর্মীরা গত দুই বছর ধরে ঘরছাড়া ও পরিবার ছাড়া ফেরারি জীবন কাটাচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন রুখতে যেভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে, তাকে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পাকিস্তানি জান্তার স্বৈরাচারী মানসিকতার সাথে তুলনা করছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক অধিকার সম্পূর্ণ হরণ করে দেশে যে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে, তা ঔপনিবেশিক বা পাকিস্তানি শোষকদের আচরণেরই পুনরাবৃত্তি।
মব-সন্ত্রাস, মিথ্যা মামলা ও সামরিক কায়দায় রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম স্তব্ধ করার এই চেষ্টা স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের কালো অধ্যায়। চরম প্রতিকূলতা, গ্রেফতারের ভয় এবং সরকারের এই কঠোর সামরিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা একযোগে ব্যানারসহ আকস্মিক মিছিল ও শোডাউন করেছে।
ঘরছাড়া ও পরিবারছাড়া সাধারণ কর্মীরা রাজপথে সমবেত হয়ে স্লোগানে স্লোগানে চারদিক মুখরিত করে তোলেন। দলটির সমর্থকেরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের এই ভাইবোনেরাই আজ স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দলকে উজ্জীবিত রাখছেন এবং আবারও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
একদিকে নাশকতার অজুহাতে দেশজুড়ে সরকারের কঠোর সেনা মোতায়েন ও ১৮ হাজারেরও বেশি পুলিশ নামানোর ‘নিশ্ছিদ্র’ নিরাপত্তা বলয়, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই আওয়ামী লীগের তৃণমূলের শোডাউন— সব মিলিয়ে দলের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগের দিন পুরো দেশে এক চরম রাজনৈতিক সংঘাতময় ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

