জামালপুরের কাকলী আক্তার অনলাইনে পোশাক বেচে সংসার চালান। লোডশেডিং ইতিমধ্যেই তার ব্যবসার কোমর ভেঙে দিচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, অর্ডারের রিপ্লাই দিতে দেরি হচ্ছে, কাস্টমার বিরক্ত হয়ে চলে যাচ্ছে। আর এর মধ্যেই খবর এলো, মোবাইল নেটওয়ার্কও হয়তো একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। কাকলীর কথায়, “তাইলে তো চলা টাফ হয়ে যাবে।” এই “টাফ” শব্দটার মধ্যে লুকিয়ে আছে কোটি মানুষের আতঙ্ক।
মিরপুরে বাইক চালান শাহ আলম। সাড়ে দশ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে এক ট্যাংক অকটেন পেয়েছেন। সেই ক্লান্তি আর রাগ মিলিয়ে বলছেন, মোবাইলে নেটওয়ার্ক না থাকলে রাইড শেয়ারিং বন্ধ, আয় বন্ধ, সংসার বন্ধ। এই মানুষটার পরিচয় একজন ভোটার, একজন নাগরিক, যে কিনা দিনরাত খেটে দেশের চাকা ঘুরিয়ে রাখে। রাষ্ট্র তার প্রতি কী দায়িত্ব পালন করছে?
মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব ইতিমধ্যে বিটিআরসিকে চিঠি দিয়ে বলেছে, জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুতের মারাত্মক বিঘ্নের কারণে নেটওয়ার্ক সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। জরুরি সেবা, দুর্যোগ মোকাবেলা, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন সরকারি কাজ সব কিছু বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান বলেছেন সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। “বিবেচনা করছে” এই কথাটা শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু কাকলীর ফোনে নেট নেই, শাহ আলমের ট্যাংকে তেল নেই, আর “বিবেচনা” শুধু কাগজেই আছে।
এখন একটু পেছনে তাকানো দরকার। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন হলো, সেটা নিয়ে দেশের মানুষের মনে যে প্রশ্ন জমে আছে সেটা মুছে যায়নি। বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো ছিল না, মানুষ ভোট দিতে যায়নি, রাস্তাঘাট ছিল ফাঁকা। এই পরিস্থিতিতে বিএনপি যে সরকার গঠন করলো, সেটার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তো ছিলই, কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল এরা কি আদৌ দেশ চালাতে পারবে?
সেই প্রশ্নের উত্তর এখন পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি এমন একটি দল, যার জন্মটাই হয়েছিল সামরিক ছাউনিতে। জিয়াউর রহমান গণতন্ত্রের পথ ধরে রাজনীতিতে আসেননি, এসেছিলেন বন্দুকের জোরে। সেই দলের হাত ধরে যে সরকার এখন ক্ষমতায় বসে আছে, তারা জনগণের রায় ছাড়াই এসেছে। আর এই অবৈধ পথে আসা সরকারের মন্ত্রীরা এখন চেয়ারে বসে বড় বড় কথা বলছেন, কিন্তু মাঠের মানুষের খবর রাখছেন না।
সংসদের ভেতরে তেল-গ্যাসের অভাব নেই। এসি চলছে, গাড়ি চলছে, আলো জ্বলছে। কিন্তু সংসদের বাইরে লাখো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে। বিদ্যুতের খাম্বা আছে, বিদ্যুৎ নেই। মোবাইলের টাওয়ার আছে, নেটওয়ার্ক থাকবে কিনা সেটা নিশ্চিত না। দেশটা আস্তে আস্তে থেমে যাচ্ছে, আর সরকার খাল খনন নিয়ে ব্যস্ত।
এই যে অগ্রাধিকারের বিভ্রান্তি, এটাই বিএনপির পুরনো রোগ। ক্ষমতায় থাকার মজা নেওয়া হয়, কিন্তু ক্ষমতার দায়িত্ব নেওয়া হয় না। হাওয়া ভবনের স্মৃতি বাংলাদেশের মানুষ ভোলেনি। দলের মধ্যে দল, দুর্নীতির চেইন অফ কমান্ড, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি। এসব তো বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে বহু আগে থেকেই।
এখন সেই একই দল, একই মানসিকতা নিয়ে আবার ক্ষমতায়। মানুষ ভোট না দিলেও ক্ষমতা পাওয়া যায়, এটা তারা আবার প্রমাণ করলো। কিন্তু ক্ষমতায় বসে শুধু মন্ত্রীর পদ আর গাড়ির পতাকা পাওয়া যায়, দেশের সমস্যা সমাধান করতে হলে জনগণের আস্থা লাগে। সেই আস্থা এই সরকারের নেই, কখনো ছিলও না।
কাকলী আক্তারের অনলাইন ব্যবসাটা টিকবে কিনা, শাহ আলম সংসার চালাতে পারবেন কিনা, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার কথা ছিল সরকারের। সরকার সেটা দিচ্ছে না। চিঠি লেখা হচ্ছে, বিবেচনা করা হচ্ছে, বৈঠক হচ্ছে। কিন্তু মানুষের ঘরে আলো আসছে না। এটাই এই সরকারের আসল পরিচয়।

