মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন দারিদ্র্যবিমোচনের নামে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর আসল অবদান কী হয়ে থাকবে? তিন হাজার শিক্ষকের বেতন বন্ধ করে তাঁদের না খাইয়ে রাখা, ক্লাসরুম থেকে টেনে বের করে দেওয়া, আর রাত তিনটায় ঘরের জানালায় গলা কাটার হুমকি দেওয়ার সরকারের অভিভাবক হিসেবে।
ঘটনাগুলো কোনো গুজব না। ভিডিও আছে। সাক্ষী আছে। বরিশালের গৌরনদীতে প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীর বাসায় শতাধিক লোক ঢুকে দরজা কুপিয়ে ফাটিয়েছে, পরিবারকে ঘরে আটকে রেখেছে। সেনাবাহিনী না গেলে কী হতো সেটা অনুমান করা কঠিন না। ভিকারুননিসার অধ্যক্ষকে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছে। শাম্মী আক্তারের ওড়না ধরে টানা হয়েছে। কণিকা মুখার্জীকে জবাই করার হুমকি দেওয়া হয়েছে রাতের অন্ধকারে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। একটার পর একটা, জেলায় জেলায়, আগস্ট থেকে অক্টোবর, একই ছকে।
এইখানেই ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটা দাঁড়ায়। এই মবগুলো যখন ঘটছিল, তখন দেশে একটা সরকার ছিল। সেই সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ নিজেই স্বীকার করেছেন “চর দখলের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল হয়ে যাচ্ছে।” স্বীকার করেছেন মানে পরিষ্কার জানতেন। জানার পরেও একটা মামলা হয়নি, একটা গ্রেফতার হয়নি, একটা প্রতিষ্ঠানে পুলিশি প্রহরা বসেনি। যে দেশে মব নেতারা প্রকাশ্যে ঘুরছে, ভিডিওতে মুখ দেখা যাচ্ছে, নাম জানা যাচ্ছে, সেখানে রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া অক্ষমতা না, এটা সিদ্ধান্ত।
কাকে সরানো হয়েছে সেটা দেখলে আরো স্পষ্ট হয়। ধামরাইয়ে উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, যিনি কোচিং বন্ধ করেছিলেন আর অনিয়ম ঠেকিয়েছিলেন, তাঁকেই মব দিয়ে সরানো হয়েছে। ভিকারুননিসায় যিনি লিগ্যাল অ্যাডভাইজরের পদ পেতেন না, তিনিই মবের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সীতাকুণ্ডে যাঁকে সরানো হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ হয়নি, তবু তিনি আর ঢুকতে পারেননি। এই মবগুলোর প্রতিটার পেছনে স্থানীয় স্বার্থ আছে, পদ দখলের হিসাব আছে, ব্যবসায়িক ফন্দি আছে। আর সেই ফন্দিবাজরা সুযোগ পেয়েছে কারণ ওপর থেকে ইশারা ছিল না যে এসব সহ্য করা হবে না।
ইউনূস সরকার ক্ষমতায় এসেছিল একটা বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, যেখানে রাস্তায় নামা মানুষদের শক্তিকে ব্যবহার করা হয়েছিল পুরনো সরকার সরাতে। সেই শক্তিটা পরে নিয়ন্ত্রণে আনার কোনো চেষ্টা হয়নি, বরং সেটাকে একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে। যাঁরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন বা যাঁরা সরকারি স্কুলে কর্মরত ছিলেন, তাঁদের গায়ে “স্বৈরাচারের দোসর” তকমা সেঁটে দিয়ে মবের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এটা বিচার না, এটা প্রতিহিংসার রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিকটা হলো অর্থনৈতিক। মব দিয়ে বের করে দিয়েই শেষ না, বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আদালত পুনর্বহালের আদেশ দিয়েছে, মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে, তবু স্কুলের গেট খোলেনি। কারণ স্থানীয়ভাবে মবের লোকজন রয়ে গেছে এবং প্রশাসন তাদের সামনে নতজানু। ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ দেড় বছর বেতন পাননি। তাঁর অবসর আসছে ৩০ জুলাই, মবকারীরা চাইছে এই সময়টুকু পার হয়ে যাক। এটা শুধু চাকরি নষ্ট না, এটা একজন মানুষের পুরো কর্মজীবনের সমাপ্তিকে অপমানে ডুবিয়ে দেওয়া।
যে সরকার শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা থেকে নিজের নাগরিকদের রক্ষা করতে পারে না বা করে না, সে সরকার যত বড় আন্তর্জাতিক পুরস্কারধারীর নেতৃত্বেই থাকুক, তার নৈতিক অবস্থান শূন্য। ইউনূস বিদেশে গিয়ে গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের বক্তৃতা দিয়েছেন। দেশের ভেতরে তখন তাঁর সরকারের ছায়ায় একজন শিক্ষক রাতের বেলা বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন।

